এইচএসসির পরীক্ষার ফল বিপর্যয় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের কী ইঙ্গিত দেয়?

২১ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:০৬ PM
এম এ মতিন

এম এ মতিন © টিডিসি সম্পাদিত

২০২৫ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৫৮.৮৩ শতাংশ। বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষায় গত ২০ বছর ধরে গড় পাসের হার ৬০ শতাংশের ওপরে ছিল। বিশেষ করে করোনা মহামারির পর গত চার-পাঁচ বছরে গড় পাসের হার ছিল ৮০ শতাংশের আশপাশে। সেই বিচারে এবারের ফলকে 'বিপর্যয়' মনে করছেন অনেকে। এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪১.১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে, সংখ্যার হিসেবে যা পাঁচ লাখের বেশি। ২০২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাসের হার শূন্য। বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।

২০০৩ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার পাসের হার ছিল ৩৮.৪৩, ২০০৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭.৭৪ শতাংশে। এরপর থেকে পাসের হার ক্রমেই বাড়তে থাকে। ২০০৫ সালে ৫৯.১৬, ২০০৬ সালে ৬৫.৬৫, ২০০৭ সালে ৬৫.৬০, ২০০৮ সালে ৭৬.১৯, ২০০৯ সালে ৭২.৭৮, ২০১০ সালে ৭৪.২৮, ২০১১ সালে ৭৫.০৮, ২০১২ সালে ৭৮.৬৭, ২০১৩ সালে ৭৪.৮৪, ২০১৪ সালে ৭৪.৩০, ২০১৫ সালে ৬৯.৬০, ২০১৬ সালে ৭৪.৭০, ২০১৭ সালে ৬৮.৯২, ২০১৮ সালে ৬৬.৬৪ এবং  ২০১৯ সালে ছিল ৭৩.৯৩ শতাংশ। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে সে বছর ফরম পূরণ করা সব শিক্ষার্থীকে পাস করিয়ে দেওয়া হয়, যেটিকে অটোপাস বলা হয়। অর্থাৎ, ২০২০ সালে পাসের হার হয় ১০০ শতাংশ। করোনার কারণে এরপর কয়েক বছর কখনো সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে, কখনো চার বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষা হয়। সে বছর পাসের হার ছিল ৯৫.২৬ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৫.৯৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮১.০৪ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৭৮.৬৪  এবং এ বছর ২০২৫ সালে ৫৮.৮৩  শতাংশ। 

২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষক আন্দোলন, শেখার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা মিলে ফলাফলে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পতন। মেয়েরা তুলনামূলক ভালো করলেও সামগ্রিক শিক্ষার মান স্পষ্টভাবে নিম্নমুখী। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই যদি শিক্ষাখাতে কাঠামোগত সংস্কার শুরু করা না হয়, ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হবে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এ ফলাফল কেবল সংখ্যাগত পতন নয় — এটি এক জাগরণের ঘণ্টাধ্বনি, যা মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা শুধু পরীক্ষার ফল নয়, বরং শেখার সংস্কৃতি ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ।

এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের কারণ নির্ধারণ ও তা প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড ২০১৭ সালে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। সে বছর ঐ বোর্ডের পাশের হার ছিল ৪৯.৫২। 

তদন্ত কমিটি ফল বিপর্যয়ের ৯টি কারণ চিহ্নিত করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ  উত্তরপত্র মূল্যায়নের নির্দেশনায় দুর্বলতা, প্রশিক্ষণবিহীন পরীক্ষক দ্বারা উত্তরপত্র মূল্যায়ন, নমুনা উত্তরমালা সরাসরি অনুসরণ, প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বোর্ডের দেওয়া নির্দেশনায় দুর্বলতা থাকা এবং প্রশিক্ষণবিহীন পরীক্ষক দ্বারা উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা। পর্যালোচনায় আরও বেরিয়ে আসে যে,  ফল বিপর্যয়ের পেছনে পাঠ্যক্রম, পাঠদানের পদ্ধতি, প্রশ্নপদ্ধতি, পরীক্ষাপদ্ধতি, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্যসহ নানা কারণ দায়ী। প্রশিক্ষণবিহীন পরীক্ষক দ্বারা উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ইংরেজি বিষয়ে দুর্বলতা, শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেটে আসক্তি, অতিমাত্রায় প্রাইভেট ও কোচিং–নির্ভরতা এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির হার নিম্নগামী বলেও প্রতিবেদনে  উল্লেখ করা হয়। ফল উন্নয়নে তদন্ত কমিটি ৯ দফা সুপারিশ করেছিল। এগুলো হলোঃ ভেন্যু/কেন্দ্র (নিজ কলেজের পাশের কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা নেওয়া) বাদ দেওয়া, ইংরেজি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, অভিন্ন প্রশ্নপদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণ, প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ, গুণগত শিক্ষার মানোন্নয়নে সেমিনার ও কর্মশালা করা, পরীক্ষাকেন্দ্রে অহেতুক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না করা, অধিকসংখ্যক পরীক্ষক নিয়োগ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে শিক্ষকের পদ সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষমুখী করা। সূত্রঃ প্রথম আলোঃ ২১ আগস্ট ২০১৭। 

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের এ সকল সুপারিশ কর্তৃপক্ষ কতটা আমলে নিয়েছেন তা জানা যায় নি। তবে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার যে খুব একটা উন্নতি হয়নি তা ২০২৫ সালের ফলাফল চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে। ফেল করা এই বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আমরা কী করবো? ব্যাঙ এর ছাতার মতো গজিয়ে উঠা আমাদের সরকারি/বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই বা কী করবে? আর যাদের ছেলেমেয়েরা ফেল করলো তারাই বা কী করবেন? সব মিলিয়ে এই ফল বিপর্যয় এক জাতীয় সমস্যার সৃষ্টি করেছে–এতে কোনোই সন্দেহ নাই। আর যারা পাস করেছে তারাই বা কতটা যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছে? গত বছর এইচএসসি পাস করা ছাত্রছাত্রীদের শতকরা ৯০ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছিল। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল। এবার তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না। তাহলে আমাদের করণীয় কী? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এর তথ্যানুসারে বেসরকারি কলেজে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের হার ৪৫:০১ থেকে ৬০:০১ এবং সরকারি কলেজে ৪০:০১ থেকে ৫০:০১ এর মধ্যে রয়েছে। শিক্ষাদানের যে কোন মানদণ্ডে এই অনুপাত অস্বাভাবিক। আদর্শ শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি সর্বোপরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের অভাব তো আছেই। বলাই বাহুল্য এ অবস্থা থেকে উত্তরণ রাতারাতি সম্ভব নয়। তাই আমাদের বিকল্প চিন্তা করতে হবে। এই চিন্তার জন্যে যোগ্য এবং উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে একটি স্থায়ী, উচ্চক্ষমতাশালী এবং যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি শিক্ষা কমিশন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে,  অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন বিষয়ে ১০ টির মত কমিশন গঠন করলেও অজ্ঞাত কারণে কোন শিক্ষা কমিশন গঠন করেন নাই। তাই আমাদের মত অর্বাচীনদের এ বিষয়ে কথা বলতে হচ্ছে। বিশেষ করে এবারকার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার মান আশানুরূপ নয়। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ এবং এডিবি বলছে, বাংলাদেশের পঞ্চম পাস ছাত্রছাত্রীর জ্ঞান শ্রীলঙ্কা এবং ভারতের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি পাস ছাত্রছাত্রীর সমান। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকের উপর এমন কোন প্রতিবেদন না থাকলেও বিশেষজ্ঞদেরে লিখিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে আমাদের উচ্চমাধ্যমিক পাশ ছাত্রছাত্রীদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা  শ্রীলঙ্কা এবং ভারতের অনুরূপ ছাত্রছাত্রীর চেয়ে নিন্মমানের। উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফলাফল অর্জনকারী ছাত্রছাত্রীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শতকরা ৪০ নম্বর (পাস নম্বর) অর্জন করতে পারে না সেখানে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার গুণগত মান সম্বন্ধে প্রশ্ন উঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আর বিশ্ববিদ্যালয়? দি টাইম হাইয়ার এডুকেশন নামীয় প্রতিষ্ঠানের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। ঐ প্রতিবেদনে দেখা যায় বৈশ্বিক র‍্যাংকিং এ বিশ্বে শীর্ষর্স্থানীয় ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের একটিও বিশ্ববিদ্যালয় নেই। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতের ১৭ টি এবং পাকিস্তানের ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় এই তালিকায় স্থান করে নিতে পেয়েছে। অতএব দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় কোন পর্যায়েই আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ভালো অবস্থানে নেই। এ অবস্থায় শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে বলে মনে হয়। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এ যাবত নয় নয়টি শিক্ষা কমিশন হয়েছে। এগুলোর প্রায় সবক’টিতেই অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা প্রচলনের কথা বলা হয়েছে। তাতে বিনামূল্যে বই বিতরণসহ গরীব ছাত্রছাত্রীদের খাদ্য প্রদানের কথাও বলা হয়েছে। চুয়ান্ন বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও আজ অব্দি কোন সরকার অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নাই। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও সর্বজনীন করার পক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে। প্রথমতঃ অষ্টম শ্রেণি পাস ছেলেমেয়েরা চতুর্থ শ্রেণির চাকরির যোগ্য বিবেচিত হবেন। দ্বিতীয়ত আউট সোর্সিং এ  সহায়ক চাকরি পাবেন। তৃতীয়ত যে কোন ভোকেশনাল কোর্সে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন  হবেন। এই বয়সে শারীরিক সক্ষমতা সৃষ্টি হয় বলে ড্রাইভিং, দক্ষ নির্মাণ শ্রমিক বা এই জাতীয় শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করতে পারবেন। সর্বোপরি এ সময়ে ঝরে পড়া কমাতে পারলে আমাদের শিক্ষার হার দ্রুত বাড়ানো সম্ভব। এস ডি জি’র লক্ষ্য ৪ (গুণগত শিক্ষা) বাস্তবায়নে  শিক্ষার হার বৃদ্ধি অপরিহার্য । অতঃপর যারা অষ্টম শ্রেণিতে ভালো ফলাফল করতে পারবে কেবল তাদেরকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ দেয়া হবে। এজন্যে বস্তুনিষ্ঠভাবে অষ্টম শ্রেণিতে অর্জিত ফলাফলের উপর ভিত্তি করে  একটি নম্বর (যেমন – ৬০)  নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। বাদবাকিরা চাকরিতে যাবেন কিংবা কারিগরি বিষয়ে  ভোকেশনাল কোর্সে ভর্তি হতে পারবেন। এর উদ্দেশ্য, উৎপাদনশীল মানবসম্পদ সৃষ্টি ও বেকারত্ব বন্ধ করা। এতে নবম শ্রেণিতে ছাত্রসংখ্যা সীমিত হবে এবং এসএসসি পরীক্ষায় ফেল এর হার কমবে। অনুরূপভাবে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের উপরও একটি গড় নম্বর ( সেটি  ৬০/৬৫ হতে পারে) নির্ধারণ করে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির উপর লাগাম টানা যেতে পারে। এসএসসি-তে ৬০/৬৫ এর নিচে নম্বরপ্রাপ্তরা উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হতে পারবেন না – তারা কারিগরি ইন্সটিউটে যোগ্যতার ভিত্তিতে যে কোন কোর্সে ভর্তি হবেন। এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ছাত্রছাত্রী পাওয়া যাবে এবং ফেল এর সংখ্যা কমে আসবে। একইভাবে উচ্চমাধ্যমিক পাস সকল ছাত্রছাত্রীকে বিস্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সীমিত করতে হবে। সরকার এ বিষয়য় বিবেচনা করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা (এসএসসি ও এইচএসসি তে ২.৫) বেধে দিয়েছেন। আমরা এই যোগ্যতা ৩.০০ বা ৭৫ নম্বর করার প্রস্তাব করছি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন সংস্কার আনতে পারলে দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানব সম্পদ সৃষ্টি যেমন সম্ভব হবে ঠিক তেমনিভাবে শিক্ষিত বেকারত্বের হারও কমবে। তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরি না করে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত কর্মী তৈরি করে বিদেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে মজবুত করা অধিক যুক্তিযুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়। নিম্নের উদাহরণ থেকে এই কথা সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয়ঃ 

২০২২-২৩ সালের আন্তর্জাতিক অভিভাষণ সংস্থা (International Organization for Migration, IOM) এর বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় যে, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের ১.৩ কোটি মানুষ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে ২১.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, শ্রীলংকার ২০ লাখ কর্মী পাঠিয়েছে ৬.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ভিয়েতনামের মাত্র ৬ লাখ কর্মী একই সময়ে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে ১৬ বিলিয়ন ডলার। এর কারণ হিসেবে শ্রীলংকা ও ভিয়েতনামের শ্রমিকরা অধিক দক্ষ আর সেজন্যে তাদের বেতনও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। সে জন্যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন সংস্কার আনা প্রয়োজন যাতে দক্ষ উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরি হয় উচ্চশিক্ষিওত বেকার তৈরি না হয়।   

সম্প্রতি শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৩-এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিএস। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ১৭ লাখ ১০ হাজার। এর মধ্যে ১৫ বছর এবং তদূর্ধ্ব বয়সী বেকার জনসংখ্যা ২৪ লাখ ৬০ হাজার। অর্থাৎ ৩.৩৫ শতাংশ মানুষ বেকার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা’র (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, যারা কর্মক্ষম এবং কোনো কাজে নিয়োজিত নয়, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ খুঁজে বেড়ায় এবং ওই সময়ে কাজের সুযোগ পেলে সে কাজ করতে বা যোগদানে প্রস্তুত থাকে, মূলত সেসব ব্যক্তিকে বেকার হিসেবে ধরা হয়। বিবিএসও এই সংজ্ঞা ব্যবহার করে বেকারের তথ্য নির্ণয় করেছে। বিবিএস’র প্রতিবেদনে আরও  বলা হয়েছে, দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৯ লাখ ৪০ হাজার যুবক বেকার। যার মধ্যে প্রায় ৯ লাখ উচ্চশিক্ষিত। অর্থাৎ মোট বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই উচ্চশিক্ষিত, যারা স্নাতক থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।

প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের মোট বেকার মানুষের ৩১.৫০ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। অথচ যাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই বা পড়াশোনা করেনি, তাদের বেকারত্বের হার মাত্র ১.০৭ শতাংশ। অর্থাৎ মানসম্মত শিক্ষার অভাবে দেশে বেকারত্বের হার বাড়ছে, বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা অধিক হারে বাড়ছে। বিবিএস’র তথ্যে আরও দেখা যায়, উচ্চমাধ্যমিক পাস করা বেকারের হার ১৪.৮৭ শতাংশ, মাধ্যমিক শেষ করা বেকার ২১.২৯ শতাংশ। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনো বেকারের হার ৮.৭ শতাংশ। অন্য কোনো মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করা ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার ০.৮১ শতাংশ। প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। শ্রমশক্তি জরিপ-২০২২ এর হিসাবে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকার ছিল মোট বেকার জনগোষ্ঠীর ২৭.৮ শতাংশ, যা বছরের ব্যবধানে বেড়ে হয়েছে ৩১.৫০ শতাংশ। বছরের ব্যবধানে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবেই বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকার মানুষের সংখ্যা। গ্রামের চেয়ে শহরে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার বেশি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরের উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার ৩৪.৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামের বেকার ৩০.২৫ শতাংশ। একইভাবে পুরুষের চেয়ে উচ্চশিক্ষিত নারী বেকারের হার বেশি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে ৩৮.৩৪ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত নারী এবং ২৮.৮ শতাংশ পুরুষ বেকার ছিল। শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, একদিকে দেশে পুরুষ বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে নারী বেকারের সংখ্যা। মোট বেকার জনসংখ্যার মধ্যে পুরুষ রয়েছে ১৬ লাখ ৪০ হাজার, যেখানে বেকার নারী ৮ লাখ ২০ হাজার। দেশে বেকারত্বের হার ৩.৩৫ শতাংশ। 

বেকারত্বের হার কমাতে হলে সাধারণ শিক্ষার উপরে কারিগরি বা কর্মমুখী শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ - সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা রয়েছে। আর কর্মমুখী তথা কারিগরি শিক্ষা গুরুত্ব  দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কর্মমুখী শিক্ষা শিক্ষার্থীর কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে এবং তাদেরকে সৃজনশীল ও উৎপাদনমুখী করে গড়ে তোলে। এই শিক্ষার কাজ হলো জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রুপান্তর করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তিকে সুদৃঢ় করা। কর্মমুখী শিক্ষা শিক্ষার্থীকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং তাদের সুপ্ত গুণাবলীকে বিকশিত করে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এর মতে, ‘কর্মমুখী শিক্ষা হলো এমন শিক্ষাব্যবস্থা. যা শিক্ষার্থীদের জীবনকে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে গড়ে তুলতে ও কর্ম পেতে সাহায্য করে’।

কর্মমুখী শিক্ষা এমন এক ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা, যা গ্রহণ করতে পারলে শিক্ষার্থীরা ঘরে-বাইরে, ক্ষেতে-খামারে, কলে-কারখানায় যেকোনো পেশায় অতি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার যোগ্যতা লাভ করে। এই শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান মূলত পেশাগত কর্মের সাথে সম্পৃক্ত। এই শিক্ষা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ শিক্ষার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল ‘কর্মমুখী শিক্ষা নিলে, বিশ্ব জুড়ে কর্ম মিলে’।

উচ্চতর কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে ইচ্ছামতো একটি স্বাধীন পেশায় নিয়োজিত হতে পারে বা ভালো বেতনে উচ্চপদস্থ পেশাজীবী হওয়ার সুযোগ পায়। যেমন- প্রকৌশলী, চিকিৎসক, অধ্যাপক, কৃষিবিদ, ইত্যাদি। সাধারণ কর্মমুখী শিক্ষায় পেশাজীবী হতে চাইলে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না, প্রাথমিক বা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতাই যথেষ্ট। এই শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন শেষে একজন শিক্ষার্থী কৃষি খামারী, মৎস্য চাষি, কামার, কুমার, তাঁতি, দর্জি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, পেইন্টার, কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, টাইলস মিস্ত্রি, প্লাম্বার, পোশাক কারখানা শ্রমিক, ছাপাখানা শ্রমিক, চামড়া শিল্পের শ্রমিক, কুটির শিল্প, নার্সারি মালিক, গ্রাফিক্স ডিজাইনার, নার্স, ধাত্রী, গাড়ি চালক, সাইকেল-রিকশা, ইত্যাদি মেরামতের কাজ, দোকানদার, সেলসম্যান, হেয়ার ড্রেসার, মেকানিক, ওয়েল্ডার, রেডিও-টেলিভিশন-ফ্রিজ-মোটরগাড়ি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও, গ্রাফিক ডিজাইন কিংবা কন্টেন্ট মেকার, ইত্যাদি আর মেরামতের কাজ, যেমন -  বৈদ্যুতিক গৃহসামগ্রী মেরামতের কাজ, হাউস ওয়ারিং, যানবাহন চালক, প্রাথমিক চিকিৎসা, কাপড় ইস্ত্রি, আধুনিক পদ্ধতিতে হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগল ও ভেড়া পালন, সেলুনের কাজ, ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত হতে পারেন। এ শিক্ষা অল্প সময়ে স্বল্প ব্যয়ে সহজেই গ্রহণ করা যায় এবং দেশ ও বিদেশের সর্বত্রই এ ধরনের কাজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার ফলে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেমন - আমেরিকা, জাপান, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, কোরিয়া,  প্রভৃতি দেশ আজ নিজেদের জীবন মানকে সুপ্রসন্ন করে উন্নতির শিখরে আরোহণ করেছে। তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিকল্পিত, কর্মমুখী, আধুনিক প্রযুক্তি ও কলাকৌশল নির্ভর। অন্যদিকে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা প্রদানে পিছিয়ে থাকার কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের সীমিত সম্পদের উপর চাপ এবং বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের সংখ্যা বাড়ছে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্য অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশের সনদ লাভ অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। 

বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোতে দক্ষ জনসংখ্যা ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। যেমন-জার্মানিতে প্রায় ৭৩ শতাংশ, জাপানে ৬৬, সিঙ্গাপুরে ৬৫, অস্ট্রেলিয়ায় ৬০, চীনে ৫৫, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০, মালয়েশিয়ায় প্রায় ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করে। বিপরীতে বাংলাদেশে স্বল্পদক্ষ ও দক্ষ জনশক্তি সরকারিভাবে ১৮ শতাংশ দাবি করা হলেও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী দেশে কারিগরি শিক্ষার হার মাত্র ৯ শতাংশ। বলা বাহুল্য,  কারিগরি শিক্ষাই অর্থনৈতিক অগ্রগতির চাবিকাঠি।

দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইত্যাদি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশেও কর্মমুখী শিক্ষা যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কারিগরি, প্রকৌশলী, চিকিৎসা, ভোকেশনাল, ইত্যাদি কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ও শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে কর্মমুখী তথা কারিগরি  শিক্ষার বিকল্প নেই। প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষায় কর্মমুখী শিক্ষা বা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট প্রোগ্রাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা দরকার। তাই দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে একটি বিশ্বমানের শিক্ষানীতি ও কারিকুলাম প্রণয়ন আবশ্যক। সকলের আশা,  অন্তর্বর্তীকালীন  সরকার সব স্টেকহোল্ডারদের সহযোগিতা নিয়ে কারিগরি তথা কর্মমুখী শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের বেকারত্ব নিরসন, দারিদ্র্য বিমোচন, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করবেন।

বাংলাদেশে কর্মমুখী তথা কারিগরি শিক্ষার বর্তমান অবস্থা 
বর্তমানে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার স্তর ৩ টি। ১. স্নাতক পর্যায়ে বি এসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি। ২. পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি ও ৩। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও কারিগরি ইনস্টিটিউটে স্বল্পমেয়াদী ভোকেশনাল/ট্রেড কোর্সে সার্টিফিকেট। 

আমাদের দেশে ১৯৫৫ সালে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (বর্তমান ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মধ্যম স্তরের প্রকৌশলী তথা ডিপ্লোমা প্রকৌশলী তৈরির স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ ৬৯ বছরে সরকারি ৫০টি এবং বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ৫ শতাধিক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়েছে। ৩৮৭টি বেসরকারি পলিটেকনিকের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি ছাড়া অন্যগুলো নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। মালিকরা সার্টিফিকেট বিক্রির দোকান খুলে বসেছেন। শিক্ষায় অনুন্নত কারিকুলাম ও পুরোনো কোর্স থাকায় পড়ালেখা সম্পন্ন করেও চাকরির বাজারে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে। কারিগরি বিভিন্ন বিষয়ে বিদেশে চাহিদা থাকলেও শিক্ষার মান উন্নয়নে আশাতীত কোনো উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের।

এর পাশাপাশি প্রতি জেলায় স্থাপিত সরকারি বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (টিএসসি) দক্ষ জনবল তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার হার প্রায় ১৫-১৬ শতাংশ দাবি করা হলেও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ো এই হার ৯ শতাংশের কাছাকাছি। বিগত সরকার এ হার ২০২০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছিল। সে টার্গেট অর্জিত হয়নি। বিগত সরকার কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতের হার ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। এটা খুবই আশাব্যঞ্জক হলেও কারিগরি শিক্ষা এখনো অবহেলিত। কারিগরি শিক্ষায় ৫০ শতাংশ ভর্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে যেহেতু কারিগরি শিক্ষা গ্রহণে এখনো আমাদের দেশে আগ্রহ কম। সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের অনুপাত নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন। 

বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়য়ের অধীন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে শের-ই-বাংলা নগরস্থ আগারগাও এ অবস্থিত কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। বাংলাদেশের একমাত্র কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অফিস এখানেই। কারিগিরি শিক্ষা সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অধীনে সরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মোট ৭৯২৫। আগেই বলা হয়েছে, এ গুলোতে শিক্ষার স্তর মোট  ৩ টি। ১. ডিপ্লোমা ডিগ্রীর নিচে ৬ মাস/১ বছর মেয়াদি ভোকেশনাল/ট্রেড কোর্স ২. পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ও ৩। স্নাতক পর্যায়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং। এগুলোর মধ্যে সার্টিফিকেট পর্যায়ে ১৩৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ এবং ১টি ভোকেশনাল টিচার্চ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট রয়েছে। এ ছাড়া ডিপ্লোমা পর্যায়ে ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ডিগ্রি পর্যায়ে ৪ টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রয়েছে। এগুলো ছাড়াও এই অধিদপ্তরের অধীনে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ২০২২-২৩ সালে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে সর্বমোট ১১,১১৮টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দিয়েছে। এ গুলোর মধ্যে সরকারি ৭৭৭টি ও বেসরকারি ১০,৩৪১ টি। এগুলোর মোট আসন সংখ্যা হচ্ছে ১৩,৬৯,১০৫টি। ২০২২-২৩ সালে ভর্তি হয়েছে মোট ৬,৭৩,৫৯১ জন (সরকারি ৯৭,৯২৯ জন ও বেসরকারি ৫,৭৬,৬৬২ জন)। অতএব দেখা যাচ্ছে মোট আসনের শতকরা ৫০ ভাগ আসন খালি পড়ে আছে!

এ ছাড়া এই অধিদপ্তরের অধীনে রয়েছে ‘জাতীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি (নেকটার) । ১৯৮৪ সালে বগুড়া জেলার শাজাহানপুর উপজেলার জাহাঙ্গীরাবাদ সেনানিবাস সংলগ্ন নেকটার –এর কার্যক্রম শুরু হয়। এর মূল কাজ হচ্ছে – শিক্ষিত বেকার যুবক ও মহিলাদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ও আত্নকর্মসংস্থান এবং অনলাইন মার্কেট প্লেসে কাজ করার উপযোগী করে গড়ে তোলা। এ ছাড়াও সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্যে তথ্য প্রযুক্তি (আই সি টি) বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। 

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ দেশে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণে প্রতি জেলায় একটি করে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও প্রতিটি উপজেলায় একটি করে বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, টেক্সটাইল ও লেদার ইনস্টিটিউটসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ শিক্ষানীতিতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডকে অধিকতর শক্তিশালী করা ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান ও জনবল বৃদ্ধি, যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক-প্রশিক্ষক নিয়োগের অঙ্গীকার করা হলেও বাস্তব অগ্রগতি সামান্যই। প্রতিটি বিভাগে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড হওয়া দরকার। 

তাই আমরা মনে করি ১. স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষাকে সীমিত করে সনদনির্ভর দক্ষতাহীন শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা হ্রাস করা; ২. প্রাথমিক (৮ম শ্রেণি পাশ) ও এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে ৫০ শতাংশকে কারিগরি শিক্ষাগ্রহণ বাধ্যতামূলক কর;  ৩. সাধারণ শিক্ষায় একাদশ শ্রেণির আসন সংখ্যা যৌক্তিক হারে সংকুচিত করে কারিগরি শিক্ষার আসন বৃদ্ধি করা এবং কোনো আসন যাতে খালি না থাকে তা নিশ্চিত করা; ৪. শুধু পরিমাণগত নয়, এগুলোতে পড়াশুনা করা ছাত্রছাত্রীদের গুণগত মানও নিশ্চিত করতে হব; ৫. বেসরকারি পর্যায়ে নতুন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট অনুমোদনের ক্ষেত্রে মান ও ইতোমধ্যে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া; ৬. প্রতিটি বিভাগে ১টি করে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড স্থাপন করা; এবং ৭. শ্রম বাজারের চাহিদা নিরূপণ করে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। 

জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ। এ অঞ্চলের ৪৫টি দেশের জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আমরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থানে রয়েছি। শুধু তাই নয়, এ মুহূর্তে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা (১৫-৫৯ বছর) মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি। তাই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট (জনমিতি মুনাফা) বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন অতিক্রম করছে একটি সুবর্ণ সময়। আমরা এ সুযোগ ও সম্ভাবনাকে সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রত্যাশিত উন্নত দেশে পরিণত হতে পারি। কিন্তু তরুণ-তরুণীদের প্রকৃত শিক্ষা ও কাজ দিতে না পারলে সে সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা সর্বাধিক। তাই শ্রম বাজারে কর্মসংস্থানের হার বাড়াতে হলে কারিগরি শিক্ষাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। সেই লক্ষ্যে নিম্নে উল্লেখিত বিষয়গুলোর প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিঃ 

১. কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শতকরা ১০০ ভাগ ছাত্র ভর্তি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষক/প্রশিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী ২০৪০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার হার শতকরা ৫০ ভাগে উন্নীত করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে; 

২. অষ্টম শ্রেণি পাশ ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকে বিশেষ পরীক্ষা (স্ক্রিনিং) এর মাধ্যমে শুধুমাত্র অতি মেধাবীদের নবম শ্রেণিতে ভর্তির অনুমতি প্রদান এবং বাদবাকীদের ঢালাওভাবে কারিগরি শিক্ষায় অনুপ্রবেশের একটি সর্বসম্মত জাতীয় নীতি গ্রহণ করা। মনে রাখা প্রয়োজন, কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দান জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী; 

৩. শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষ আধা–দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আফ্রিকার শ্রম বাজারে চাহিদা অনুযায়ী কম খরচে জনশক্তি রপ্তানির ব্যবস্থা করা;

৪.  দেশে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পদক্ষেপ গ্রহণ করা। শিক্ষিত বেকার যুবকদের প্রয়োজনীয় ট্রেনিং ও পুঁজি সহায়তা দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ করে দেওয়া;

৫.  সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদের সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান তৈরি করে পর্যায়ক্রমে দুর্নীতিমুক্তভাবে শিক্ষিত বেকারদের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা;

৬.  শ্রমিক অসন্তোষ দূর করে নতুন নতুন রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানা গড়ে তোলা। বন্ধ শিল্প কারখানা দ্রুত চালু করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা; এবং বিশ্বের উন্নত দেশে বাংলাদেশের শ্রম বাজার সম্পর্কে প্রচার করার পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। যত বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যাবে তত বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। 

৭. সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে বাংলাদেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার প্রতি যে নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক ভাবমূর্তি বিদ্যমান তা দূরীভূত করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে তরুণরা সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণে ব্রতী হয়।

লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
ই-মেইল: [email protected] 

রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটির নবীন বরণ অনুষ্ঠিত
  • ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইন্টার্নশিপের সুযোগ জাপানে, আবেদন করতে পারবেন স্নাতক-স্নাতক…
  • ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি: বিশ্ববিদ্যালয়ের অলংকার নাকি দায়? 
  • ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এডাস্টের নতুন উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেছেন অধ্যাপক ড. মো. …
  • ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এমপির বাসায় বৈঠকের পর বাতিল হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে…
  • ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডাকসুর অনার বোর্ড থেকে বাদ গোলাম রাব্বানী, নেই রাশেদও
  • ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9