বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ যাত্রাপথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের অস্থিরতা, শেখ মুজিবের একদলীয় authoritarian rule এবং নাগরিক স্বাধীনতার সংকটের মধ্য দিয়ে যখন জাতি দিশেহারা, তখন ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর-উত্তমের নেতৃত্বে বিএনপির আবির্ভাব ঘটে। এই আবির্ভাব ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম নয়; এটি ছিল জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন—democracy পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও national sovereignty রক্ষার প্রত্যয়। একাত্তরে যুদ্ধের ময়দানে We revolted বলে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতি আনুগত্য ভেঙে ফেলেছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে এটা কোনো বিচ্ছিন্ন আন্দোলন নয়, বরং একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ, যার লক্ষ্য স্বাধীনতা। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এটি ছিল একটি সাহস জোগানো ঘোষণা—একজন মেজর প্রকাশ্যে জানালেন, তারা পাকিস্তানি সেনাদের ছেড়ে বিদ্রোহ করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের আরেকটি বিখ্যাত ঘোষণা ছিল—‘‘এতদিন আমরা কেবল স্বাধীনতার কথা শুনেছি, এবার স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে।’’ এ উক্তি কেবল স্লোগান ছিল না; এটি ছিল political mobilization rhetoric—যার মাধ্যমে তিনি জনগণকে সক্রিয় সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে স্বাধীনতা মানে কেবল ভৌগোলিক মুক্তি নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব। তাই স্বাধীনতার পর তিনি বলেছিলেন—‘‘স্বাধীনতা এসেছে, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে এখনও অনেক কাজ বাকি।’’ এটি নিছক অভিব্যক্তি নয়; বরং এক ধরনের post-colonial nation-building discourse, যেখানে রাষ্ট্র শুধু স্বাধীন থাকে না, বরং উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও জনগণের কল্যাণের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।
যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর শাসনের অধীনে দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণ করতে হলে প্রয়োজন একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যার মূল দর্শন হবে জনগণকেন্দ্রিক। তাই বিএনপি গঠিত হয় party ideology-এর ওপর—জাতীয় স্বাধীনতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও গ্রামীণ উন্নয়ন। এই দর্শন ছিল পূর্ববর্তী শাসনের এককেন্দ্রিক সমাজতান্ত্রিক নীতির বিকল্প, যেখানে কৃষক-শ্রমিক থেকে শুরু করে ছাত্র-যুবক পর্যন্ত সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা ছিল। জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন, রাজনীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে জনগণকে। জিয়ার একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল—‘‘রাজনীতি মানে জনসেবা।’’ এই দর্শনের ভিত্তিতে বিএনপি গড়ে তোলে শক্তিশালী grassroots mobilization, ইউনিয়ন থেকে শহর পর্যন্ত সংগঠন বিস্তার করে বিএনপি দ্রুতই জনগণের আস্থা অর্জন করে। কৃষি সংস্কার, গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন, শিক্ষা সম্প্রসারণের মতো কর্মসূচি তাদের জনপ্রিয়তাকে আরও সুসংহত করে। এর ফলে বিএনপি শুধু শহুরে রাজনৈতিক শক্তিই নয়, বরং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীরও আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে।
বিএনপির দর্শনকে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন জনগণকেন্দ্রিক ভাষায়—‘‘বাংলাদেশের রাজনীতি মানে জনগণের রাজনীতি, এবং জনগণের জন্যই আমরা কাজ করি।’’ রাজনৈতিক বিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি people-centric populism ও participatory democracy-র প্রকাশ, যেখানে জনগণই রাজনীতির মূল মালিক। এভাবে জিয়াউর রহমান একদলীয় কেন্দ্রভিত্তিক শাসনের বিকল্প হিসেবে bottom-up legitimacy প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা মনে রেখে জিয়া উচ্চারণ করেছিলেন—‘‘সামরিক শাসন নয়, গণতন্ত্রের মাধ্যমে দেশের উন্নতি সম্ভব।’’ এটি ছিল স্পষ্ট anti-authoritarian discourse, যা গণতান্ত্রিক উন্নয়ন মডেলের (developmental democracy model) প্রতি তাঁর অঙ্গীকারকে তুলে ধরে। রাষ্ট্রক্ষমতা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হতে হবে—এই ধারণাই তাঁকে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনার দিকনির্দেশক করে তোলে। জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে তাঁর দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ পায় এই উক্তিতে—‘‘আমরা সকলকে একত্রিত হতে হবে, একমাত্র ঐক্যেই রয়েছে শক্তি।’’ এখানে তিনি যে political unification strategy-র কথা বলেছেন, তা কেবল দলীয় সংহতির নয়; বরং একটি collective national identity formation-এর অংশ, যেখানে ঐক্যকে রাজনৈতিক শক্তির উৎস ধরা হয়।
আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল অনমনীয়—‘‘বাংলাদেশের জনগণ কখনো অন্যায়ের সামনে মাথা নত করবে না।’’ এটি এক ধরনের political resistance ideology, যা জনগণকে স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করেছে। ন্যায়বিচার ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে জিয়ার অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন—‘‘তথ্য প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করা যাবে না, রাজনীতি ও প্রশাসনে ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য।’’ এই বক্তব্য রাজনৈতিক বিজ্ঞানে rule of law discourse-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতা কেবল জনগণের সমর্থন নয়, বরং আইন ও ন্যায়বিচারের ওপরও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে—এটি ছিল তাঁর মূল বার্তা। একইসাথে তিনি ঘোষণা করেছিলেন—‘‘আমরা সকলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই।’’ এটি তাঁর egalitarian vision এবং social justice paradigm-এর প্রতিফলন, যেখানে রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে পরিচালিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনি একটি দৃঢ় জাতীয় চরিত্র গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তার দৃষ্টিতে national sovereignty মানে কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতা নয়; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে democracy প্রয়োজন, জনগণকে সাথে নিতে হলে grassroots mobilization অপরিহার্য, এবং রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে national sovereignty-এর প্রশ্নে আপসহীন থাকতে হবে।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড বিএনপি’র জন্য ছিল এক existential crisis, নেতৃত্বহীনতা, দমননীতি ও বিভেদের মধ্যে দলটি টিকে থাকার চ্যালেঞ্জে পড়ে। কিন্তু আপসহীন নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি পুনর্গঠিত হয় এবং ১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান বিএনপির নেতৃত্বেই democracy পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয় ছিল গণতান্ত্রিক যাত্রার এক মাইলফলক। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস রচনা করেন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, অর্থনৈতিক উদারীকরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দৃঢ় পররাষ্ট্রনীতি ছিল বিএনপির উল্লেখযোগ্য অর্জন।
একবিংশ শতকে প্রবেশ করে বিএনপি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। বৈশ্বিক পরিবর্তন, প্রযুক্তি-নির্ভর অর্থনীতি ও তরুণ প্রজন্মের চাহিদা মোকাবেলায় বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে organizational reform শুরু হয়। 31-point reform agenda-তে দলীয় শৃঙ্খলা, আধুনিকায়ন ও যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে এই সময় বিএনপি সবচেয়ে বেশি ভুগেছে state repression-এর কারণে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক মামলা, গ্রেফতার, আন্দোলনের উপর বিধিনিষেধ—সব মিলিয়ে দলকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। তবুও বিএনপি একটি কার্যকর ও জনপ্রিয় দল হিসেবে টিকে আছে, যা দলের স্থিতিস্থাপকতা ও আদর্শের প্রতি অঙ্গীকারেরই প্রমাণ।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন চরম উত্তেজনা ও প্রত্যাশার জায়গায় পৌঁছেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বলে ঘোষিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন ও গণআন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার যে লড়াই বিএনপি চালিয়ে এসেছে, এই নির্বাচন তারই পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশের সাধারণ জনগণ বিশ্বাস করে, এই নির্বাচন হবে পরিবর্তনের নির্বাচন। বিগত সময়ে জনগণ যে বঞ্চনা, দুর্নীতি, স্বৈরতান্ত্রিক শাসন এবং অর্থনৈতিক সংকটে ভুগেছে, তা থেকে মুক্তি পেতে তারা বিএনপির প্রতি আস্থা রাখছে। তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনগণ—সব শ্রেণির ভোটারদের আশা, বিএনপি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে এবং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে একটি গণতান্ত্রিক ও জনগণের সরকার গঠনের অঙ্গীকার করছে। তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন—গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে ব্যাপক সংস্কার, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নই হবে আগামী সরকারের অন্যতম কাজ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন বিএনপির জন্য কেবল স্মৃতিচারণ নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও নতুন অঙ্গীকারের দিন। এ দিনে পুনর্নবায়িত হয়—জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রতিজ্ঞা, জিয়াউর রহমানের গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণের অঙ্গীকার, national sovereignty রক্ষার দৃঢ় সংকল্প, grassroots mobilization আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার, আধুনিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন।
বস্তুত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির ভূমিকা এক মহাকাব্যের মতো। এটি একদিকে struggle against authoritarian rule, অন্যদিকে জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। দমন-পীড়ন, কারাবরণ ও রাজনৈতিক সংকট সত্ত্বেও BNP প্রমাণ করেছে—political legitimacy অর্জন কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যমে নয়, বরং জনগণের আস্থা ধরে রাখার মধ্য দিয়েই সম্ভব। দলের মূল নীতি—Democracy, National Sovereignty, and People’s Welfare—আজও রাজনৈতিক অঙ্গনে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই শুধু অতীতের স্মরণ নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন যাত্রার আহ্বান।
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়