সাইদুর রহমান © ফাইল ছবি
গণমাধ্যমকে প্রায়শই রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। যেকোনো রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ গণমাধ্যম। বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা-এই তিনটি স্তম্ভের পাশাপাশি গণমাধ্যম সমাজে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অথচ আওয়ামী লীগ আমলের গত সাড়ে ১৫টি বছর এ দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এ সময়ে গণমাধ্যম তার মূল কাজ তো করেইনি, বরং স্বৈরশাসক আওয়ামী লীগের অপকর্মকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত ছিল। কাউকে কাউকে অবশ্য বলতে শোনা যায়, গণমাধ্যম নয়; এগুলো ছিল প্রচারমাধ্যম।
আওয়ামী সরকারের আমলে স্বাধীন বা মুক্ত সাংবাদিকতা করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা ভোট, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি নিজেদের মধ্যে আয়োজিত ডামি নির্বাচন আয়োজনে সহযোগীর ভূমিকায় ছিল দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম। গণমাধ্যম হাউজগুলোর শীর্ষপদে আসীনরা সরকারের সুবিধাভোগী হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে সরকারকে নানাভাবে সমর্থন করে ফ্যাসিবাদ শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে সহযোগিতা করেছিলেন তারা। সর্বশেষ জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় কিছু কিছু গণমাধ্যমের ভিতরে ওই অবস্থার পরিবর্তন দেখেছিলাম। ওই সময়ে হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদপত্র কিছুটা সাংবাদিকতা করার সাহস দেখিয়েছিলো। কিন্তু সেটি সরকারের ভয়ভীতি পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারেনি। বেশিরভাগ সংবাদপত্র ও টেলিভিশন সরকারের প্রেসক্রিপশনের বাইরে যেতে পারেনি। জুলাই-আগস্ট বিপ্লব নিয়ে সংবাদপত্রের কনটেন্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, আন্দোলনের পক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের বক্তব্য কম করে প্রচার করা হতো। আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে দুই একটি সংবাদপত্র, টেলিভিশন ছাড়া বেশিরভাগ গণমাধ্যম উঠেপড়ে লেগেছিলো।
১৯ জুলাই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয় হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম ও হাসিব বিগত সরকারের আইনমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও তথ্য প্রতিমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের পর আন্দোলনের স্থগিত ঘোষণা ব্যাপক আকারে প্রচার শুরু করে গণমাধ্যমগুলো। সারজিস আলমের বক্তব্য ব্রেকিং নিউজ আকারে প্রচার করতে থাকে টেলিভিশনগুলো। পক্ষান্তরে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবদুল কাদের ওই বৈঠকে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়নি বলে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিলেও সেটি ব্যাপকভাবে সেইভাবে প্রচার করা হয়নি। এমনকি সমন্বয়ক আবদুল কাদের স্বাক্ষরিত শেখ হাসিনার পদত্যাগ সম্বলিত ঐতিহাসিক ৯ দফা মাত্র তিন থেকে চারটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো। বাকি কোন গণমাধ্যম প্রচার বা প্রকাশ করেনি। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূলধারার সমন্বয়করা গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার বা বক্তব্য দিতে চাইলে কোন পত্রিকা বা টেলিভিশন সেই সময়ে রাজি হয়নি। আমি নিজে বেশকয়েকটি টেলিভিশনে তখন তাদের বক্তব্য প্রচারের জন্য যোগাযোগ করলে সরাসরি অপারগতা প্রকাশ করা হয়। এমনকি বাংলাদেশ ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ৯ দফা প্রকাশ করা হলে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গোয়েন্দা সংস্থা ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা থেকেও ইত্তেফাক অফিসে ফোন দেয়া হয়। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল পতিত স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের।
সরকারের চাপে এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ আমলে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সম্পাদক, মালিক ও সংবাদকর্মীরা, সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে নিজেরাই ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ আরোপ করতেন। কারণ, আওয়ামী অপশাসন সর্বক্ষেত্রে ভয়ের সংস্কৃতি চালু করেছিল। সেই ভয়ে তটস্থ থাকতেন সবাই। আর এ সুযোগে সাংবাদিকদের বড় অংশ সরকারের তাঁবেদারির পথ বেছে নিয়েছিল।
রাজনীতিবিদদের মতো পাহাড় সমান সম্পদ গড়ে তোলেন কিছু কিছু দলীয় প্রভাবশালী সাংবাদিক। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণবিপ্লবের পর অনেক সাংবাদিককে পলায়ন করতে হয় যা অত্যন্ত দুঃখজনক। স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে পরিচিত জাতীয় বেশকয়েকজন সাংবাদিক আজ কারাগারে। সংকটাপন্ন অবস্থার মধ্যেও গণমাধ্যমে একটি অংশ ছিলেন, যাঁরা স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী। সংখ্যায় কম, উঁচু পদে আসীন না হলেও এই অংশটা অধিকাংশ গণমাধ্যমের আসল ওয়ার্কফোর্স। তাঁরাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে বসেন। ছাত্রলীগ-যুবলীগ-পুলিশ ও আওয়ামী লীগের চালানো বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড, নিপীড়ন ও পাশবিকতা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে সমাজে মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রতিরোধের শক্তি জাগ্রত করতে ভূমিকা পালন করেন স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী ওই অংশ।
এখন পর্যন্ত আমাদের দেশের গণমাধ্যমে কাজ করা ফটো সাংবাদিকদের নিয়ে যতটুকু কথা উচ্চারিত হয়, তাঁরা তারও চেয়ে বেশি দাবি রাখেন। জীবনের মায়া তুচ্ছ করে তাঁরা ঘটনাস্থল পর্যন্ত যান। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ফটো সাংবাদিকরা যদি ঘটনাস্থলে না যেতেন তাহলে অনেক আসল চিত্রই আমরা দেখতে পেতাম না। পাশবিকতার দৃশ্য চাপা পড়ে যেত। যেটা হয়েছিল ৫ মে শাপলা চত্বর হেফাজতের আন্দোলনের সময়। আমি মনে করি, গণমাধ্যমের মানের তুলনায় আরেকধাপ মানসম্পন্ন ফটো সাংবাদিকের একটি দল পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু, মালিক-সম্পাদকদের দালালি ও নীতিহীনতা ও সাংবাদিকতার বেসিক স্ট্যান্ডার্ড না মেনে চলায় এই দেশের তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল একটা অংশকে কাজে লাগানো যায়নি। এমনকি ফটো সাংবাদিক ও মাঠের সাংবাদিকদের নিজেদের কাছে সংরক্ষিত তথ্য-উপাত্ত ভিডিও, ছবি বিভিন্ন মাধ্য্যমে সরবরাহ করে আন্দোলনকে বেগবান করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
আমাদের দেশের গণমাধ্যম মালিকরা কোন না কোনোভাবে সরকারের আস্থাভাজন হতে পছন্দ করতেন। সরকারের বিরাগভাজন হলে বিজ্ঞাপন বাজারে তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা ছিল। এ ছাড়া মালিকপক্ষের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবসার হিসাব তো ছিলই। সেজন্য, বার্তাকক্ষেও সেভাবে নির্দেশনা দিয়ে রাখতেন তারা। সেভাবেই খবর প্রকাশিত হতো। একজন তরুণ সাংবাদিক গত চার আগস্ট রাতে আমার সঙ্গে ঢাকার পরিবেশ দেখতে বের হয়েছিলেন। আমরা গণভবনের চারপাশের নিরাপত্তা বেষ্টনী দেখছিলাম। ভেতরের নানারকম খবর জেনেছিলাম। পাঁচ আগস্ট সকালে ওই সাংবাদিক তাঁর অফিসে গিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ‘গণভবনের রাতের হালচাল’ বিষয়ে সার্বিক অবস্থার কথা জানিয়ে তা লিখতে চান। কিন্তু, প্রতিষ্ঠান প্রধান নিষেধ করে ওই সাংবাদিককে বলেছিলেন, ‘যা যা দেখেছেন বা জেনেছেন, সেভাবে লিখলে প্রতিষ্ঠানটাই বন্ধ করে দিতে পারে হাসিনা।’
আর গণমাধ্যমে সেলফ সেন্সরশিপ তো ছিলই। গত সাড়ে ১৫ বছর গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর চালানো নিপীড়ন দেখে দেখে সবার ভেতরেই ভয় কাজ করতেন। ফলে, সাংবাদিক কোন খবরটা প্রকাশের চিন্তা করবে, কোনটা করবে না সেটা নিয়ে এক ধরনের টানাপোড়নে থাকতেন। আবার যেসব সাংবাদিক সরকারের সুবিধাভোগী ছিলেন, তারা টুকটাক ভালো কাজ করতে চাওয়া সাংবাদিকদের বাধা দিতেন নানাভাবে। ভয় দেখাতেন। সব মিলিয়ে গণমাধ্যম ইতিহাসের এক কালো যুগ পার করল। এবং অবশেষে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর গণমাধ্যমসহ দেশের মানুষ বাক স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। খোলস পরিবর্তন করে এখন সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে তাদের সংবাদ পরিবেশন করছেন। আশা করি, আগামীতেও করবেন। শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের আগেও দেশের গণমাধ্যম অনেক স্বাধীন ছিল। হাসিনার ক্ষমতাকালে মূলত গণমাধ্যমকে অন্ধ থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল।
শেখ হাসিনার আমলে গণমাধ্যম প্রায় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং সাফল্যের প্রচারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। গণমাধ্যম সরকারের নানা মেগা প্রকল্পের, যেমন পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইত্যাদির ওপর ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করে গেছে। কিন্তু, এই সব প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম দুর্নীতি, বারেবারে প্রকল্পের মেয়াদ ও বাজেট বৃদ্ধির নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করেনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনের ভোট রাতে হয়ে গেলেও সেদিকে নজর দেওয়ার চেষ্টা করেনি কোনো গণমাধ্যম। অথচ, বিদেশি অনেক গণমাধ্যমে রাতেই ব্যালট বক্স ভরার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
এই যে গণমাধ্যম তার স্বাধীনতা বা স্বকীয়তা হারিয়েছিল, এর জন্য দলীয় চাটুকারিতা বড় ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া সাংবাদিকরা প্রায়ই তাদের কাজ করার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধের সম্মুখীন হতেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (২০১৮) এর মতো আইনগুলো সাংবাদিকদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা প্রায়ই বাকস্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে। এই আইনের আওতায় বিভিন্ন সাংবাদিক এবং ব্লগারদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। কিছু গণমাধ্যম সরকারপন্থি হিসেবে পরিচিত, আবার কিছু গণমাধ্যমকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে মনে করা হয়। এই বিভাজন গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং পাঠকদের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো, যেমন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু, বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে আরো আগেই ৫ আগস্টের মতো গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হতো। এখন দরকার গণমাধ্যমের সংস্কার। স্বৈরাচারের দোসরদের গণমাধ্যম থেকে বিতাড়িত না করলে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে। এই দোসরদের অনেকেই এখন অতিবিপ্লবী। যারা সাংবাদিকতার নামে বিগত সময়ে হলুদ সাংবাদিকতা করে দেশের রাষ্ট্র কাঠামোকে মিথ্যার উপর দাঁড় করিয়েছিলো। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সংস্কারের পাশাপাশি গণমাধ্যমে অবিলম্বে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
লেখক: রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়ক সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক