নূর হোসেন: বুক যেন তার বাংলাদেশের হৃদয়

১০ নভেম্বর ২০২০, ০১:১০ AM
শহীদ নূর হোসেন

শহীদ নূর হোসেন © সংগৃহীত

“অন্তরে ক্লেশ তার, বুকে-পিঠে ভরা স্লোগান
রাজপথে নামে নূর, জাগে সংগ্রামী কলতান!

বীরের ছন্দে চলে সে মিছিলের পুরোভাগে
স্বৈরাচারের বুলেট যে আঘাত হানে নূরের বুকে!
সে তো নূরের বুক নয়, বাংলাদেশের হৃদয়!”

‘৯০ এর দশক। স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে উত্তাল রাজপথ। সংগ্রাম আর বিদ্রোহের বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে দেশের তন্ত্রে-মন্ত্রে। স্বৈরাচার মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে রাজপথে চলে আন্দোলন, মিছিল, মিটিং। দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সকলে আজ ঐক্যবদ্ধ। সকলের আজ একটাই দাবি-‘স্বৈরাচার হঠাও, দেশ বাঁচাও’।

সেই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামী আওয়াজ তোলা বিদ্রোহী বীর পুরুষদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব নূর হোসেন। নূর হোসেন শুধু একটি নাম নয়, একটি সংগ্রাম। একটি চেতনা। মেহনতি মানুষের বিপ্লবের মূর্ত প্রতীক। বাঙালির ইতিহাসে অন্যতম নির্ভীক বীর ও প্রেরণার নাম শহীদ নূর হোসেন।

১০ নভেম্বর ১৯৮৭ সাল। স্বৈরশাসক জেনারেল হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী দূর্গ ধ্বংস করতে রাজপথে নেমেছিল নূর হোসেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংগ্রামে ফেটে পড়েছিল এই বিপ্লবী বীর।

“স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক”- বুকে-পিঠে এই ঐতিহাসিক স্লোগান ধারন করে রাজপথ কাপিয়ে তুলেছিল অদম্য বিপ্লবে। অন্তরে চাপা ক্ষোভ, মুখে অদম্য স্লোগান আর চোখে হার না মানা বিদ্রোহী চেতনা নিয়ে ছুটে চলেছিল সম্মুখ পানে স্বৈরাচারীর গদিতে গণতন্ত্রের পতাকা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

কিন্তু সেদিন রাজপথে স্বৈরাচারের নির্মম বুলেট তার সংগ্রামী স্লোগান ভেদ করেছিল! বুলেটের আঘাতে লুটিয়ে পড়ছিল তার নিথর দেহখানি। খুনের ধারায় ভিজে গিয়েছিল রাজপথ। বন্দুকধারী পুলিশবাহিনী ছিনিয়ে নিয়েছিল তাঁর লাশ। নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল তাঁর শেষ চিহ্ন। স্বৈরাচারীরা ভুলে গিয়েছিল সেদিন যে বিপ্লবের ধারা কখন থেমে রাখা যায় না।

মুনীর চৌধুরীর কবর নাটকে যেমন একুশের লাশ জীবন্ত মানুষের মতো কথা বলে তেমনি মৃত্যুর পরও নূর হোসেনরা আমাদের সর্বদা সাহস জোগায়, অনুপ্রেরণা দেয়, স্বপ্ন দেখায় আন্দোলন সংগ্রামে অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে বীর দর্পে ছুটে চলার! কেননা তারা অমর।

সেদিন স্বৈরাচারের পতন দেখে যেতে পারেনি নূর হোসেন। কিন্তু তাঁর সংগ্রামী চেতনা, বিপ্লবী স্লোগান আর বিদ্রোহী রক্ত স্বৈরাচারের পতন ত্বরান্বিত করেছিল। সেদিন তার ভূলুণ্ঠিত রক্ত আন্দোলনের দীর্ঘ কাফেলায় সবচেয়ে দৃশ্যমান ফলকটি স্থাপন করেছিল। সে মিছিল মৃত্যুতে থেমে যায় নি। যুগে যুগে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে চলেছে নতুন মিছিল রচনায়।

আরও পড়ুন: শহীদ নূর হোসেন তুমি কার?

কি হয়েছিল সে দিন?
১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরশাসক জেনারেল হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের পতনের লক্ষ্যে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা করে। কেননা জেনারেল এরশাদ ১৯৮২ সালে একটি সেনা অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে ক্ষমতা দখল করে এবং ১৯৮৭ সালে প্রহসনের নির্বাচনে জয়লাভ করে।

ফলে বিরোধী দলগুলো তাঁর এই নির্বাচনকে জালিয়াতি বলে অভিযুক্ত করে। বিরোধী দলগুলো জালিয়াতিপূর্ণ সেই নির্বাচন অবিলম্বে বাতিল করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু স্বৈরশাসক সেটা কোন ভাবেই মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। ফলে বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে ছাত্রসংগঠনগুলো এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের রাজপথে ফেটে পড়েন। পরবর্তীতে সকল পেশার মানুষের অংশগ্রহণে হরতাল, অবরোধ, মিছিল মিটিং আন্দোলন সংগ্রামে ফুলে ফেঁপে উঠে বাংলার সকল রাজপথ। স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে গর্জে উঠে ৫৬ হাজার বর্গমাইল।

অবরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকায় একটি মিছিলে অংশ নেন নূর হোসেন এবং প্রতিবাদ হিসেবে বুকে পিঠে সাদা রঙে লিখিয়ে লেখেন: “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক”।

মিছিলটি সেদিন ঢাকা জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি আসলে স্বৈরশাসকের মদদপুষ্ট পুলিশবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করেন। স্বৈরাচারের নৃশংস বুলেটে রাজপথে মুখ থুবড়ে পড়ে আন্দোলনকারীরা। নিহত হয় নূর হোসেনসহ মোট তিনজন। আহত হয় বহু আন্দোলনকারী। নিহত অপর দুই ব্যক্তি হলেন নুরুল হূদা বাবুল এবং আমিনুল হূদা টিটু।

এই নৃসংশ হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বিরোধী দলগুলো ১১ ও ১২ নভেম্বর সারা দেশে সকাল সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা করে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে রাজপথে। ফলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন আরো ত্বরান্বিত হয়। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। যার মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে। আর যাত্রা শুরু হয় গণতন্ত্রের। ফলে ঢাকার জিরো পয়েন্ট রূপান্তরিত হয় নূর হোসেন চত্বরে।

তাঁর এই মহান ত্যাগ এবং তার সংগ্রামী চেতনাকে প্রেরণা হিসেবে স্মরণীয় রাখতে ১০ নভেম্বরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় দিবস ঘোষণ করা হয়।

নূর হোসেনের এই সংগ্রামী চেতনা থেকে কি পেয়েছে জাতি?
নূর হোসেনের সংগ্রামী চেতনা থেকে জাতি পেয়েছে পেয়েছে শুধু প্রেরণা আর শিখেছে কেবল সংগ্রাম। কিন্তু পরবর্তীতে থেকে গেছে দুর্নীতি! বঞ্চিত হয়েছে মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে। বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নির্বাচন। বাক স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে বিভিন্নভাবে! কিন্তু এগুলো দূর করতেই সেদিন রাজপথে নেমেছিল নূর হোসেন! বুকের তাজা রক্ত ঢেলেছিল রাজপথে। তবুও হার মানেন নি স্বৈরাচারীর কাছে। কেননা গণতন্ত্র আর স্বৈরাচার পাশাপাশি চলতে পারে না!

আজ প্রজন্ম এগিয়ে গেছে বহুদূর। শিখে গেছে অধিকার আদায়ের সংগ্রামী প্রতিবাদের ভাষা। সব অসাম্প্রদায়িক, মানবিক, গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মধ্য দিয়ে তা এগিয়ে যাবে নিরন্তর। গণতন্ত্র এগিয়ে যাবে শোষণ মুক্তির অভীষ্ট লক্ষ্যে।

নূর হোসেন তুমি ঘুমাও শান্তির পতাকাতলে, যে অমিত তেজ নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছ সেই বাংলাদেশ যেন প্রতিমুহূর্তে দৃশ্যমান হয়। অমরত্ব লাভ করুক তোমার ঐ মহিয়ান আত্মত্যাগ।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

‘ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ধরেছি’ পোস্ট দেয়া সেই ঢাবি ছাত্রশক্তির…
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
রোজা রাখতে অক্ষম ব্যক্তি কত টাকা ফিদইয়া দেবেন?
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
অপবিত্র অবস্থায় সেহরি খাওয়া যাবে কিনা?
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
দুই শর্ত মানলে শবে কদরের মর্যাদা পাবে মুমিন
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
ছয় ঘণ্টা পর ইসরায়েলে ফের মিসাইল ছুড়ল ইরান
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
ঈদের আগে-পরে ৬ দিন মহাসড়কে ট্রাক-লরি চলাচল বন্ধ
  • ১৩ মার্চ ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
22 April, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081