ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছিলেন কক্সবাজারে নিহত সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। দেশ কিংবা বিদেশ— সর্বত্রই ঘুরতেন ভালোবাসতেন তিনি। বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলাই ছিল তার নেশা।
জানা গেছে, সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে থাকা অবস্থাতেও ছুটিতে বাংলাদেশে আসেননি। বরং তার পরিবর্তে দুই মাসের ছুটিতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। এই ঘুরে বেড়ানোর মধ্যেও ছিল রোমাঞ্চ। গাড়ি করে হাজার হাজার মাইল একাই ড্রাইভ করে ঘুরতেন তিনি।
সিনহা সমুদ্র ভালোবাসতেন, সময় কাটাতে চাইতেন সৈকতে বই পড়তে পড়তে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অ্যাডভেঞ্চারের ভক্ত। বিশ্ব ভ্রমণের এক প্রগাঢ় সাধ ছিলো তার। সেটা এতটাই যে, এজন্য বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী থেকে ২০১৮ স্বেচ্ছায় অবসর পর্যন্ত নিয়েছেন ৩৬ বছরের সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। ঘুরে বেড়িয়েছেন করোনা মহামারীর লকডাউনকালেও।
জানা যায়, একটা সাইকেল ট্যুরে জাপান যেতে চেয়েছিলেন সিনহা। স্বপ্ন ছিল আরো দেশ ভ্রমণেরও। এসব কারণেই দু’বছর আগে চাকরি থেকে অবসরের নিয়ে স্বপ্নগুলো ছোঁয়ার জন্য প্রস্তত হচ্ছিলেন তিনি। এর মাঝে করোনা মহামারি চলে আসে। যদিও তাতেও তার ভ্রমণ থেমে থাকেনি। দেশব্যাপী লকডাউন শুরু হওয়া পরও তিনি বাইরে রাজশাহী ঘুরে। সবশেষে ইউটিউবের ডকুমেন্টারি বানানোর কাজে গত একমাস ধরে কক্সবাজারে অবস্থান করছিলেন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী সাবেক এই কর্মকর্তা।
সিনহার মা নাসিমা আখতার বলেন, ছেলেটার তীব্র ভ্রমণের নেশা ছিল। যখন সে জাতিসংঘে শান্তিরক্ষা মিশনে ছিল, ছুটিতে বাংলাদেশে আসতো না। তার বদলে দুই মাসের ছুটিতে ইউরোপ গিয়ে গাড়ি করে হাজার হাজার মাইল ড্রাইভ করে নিজে নিজে ঘুরেছিল। এটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। কারণ, ছেলেটা অন্তত নিজের একটা স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছিল। আমার পূর্ণ সমর্থন ছিল এই সিদ্ধান্তের প্রতি।
সে সমুদ্র ভালোবাসত, সে সৈকতে বই পড়তে পড়তে সময় কাটাতে চাইতো। শৈশব থেকেই সে অ্যাডভেঞ্চারের ভক্ত ছিল। সারা বিশ্ব ভ্রমণের এক প্রগাঢ় সাধ ছিলো তার, যে জন্য বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী থেকে সে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছিল। আমি তাকে নিষেধ করি নাই। তার হিমালয়ে যাবার স্বপ্ন ছিল, ছেলেটা হাইকিং পছন্দ করতো।
মেজর সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস জানান, বিশ্ব ভ্রমণের নেশা ভর করেছিল আমার ভাইয়ের। সেখান থেকেই সে অবসরে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আবেদন করার পর দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালে তার অবসরের আবেদন গ্রহণ করা হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমাদের ভাই-বোনের বন্ডিং নিয়ে সবাই অনেক উদাহারণ দিত। আমি আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এ সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে সমালোচনার ঝড়। অনেকে আবার সিনহার সাথে কাটানো কিছু মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করছেন। তেমনি একজন সিনহার ব্যাচমেট কালের কণ্ঠের সাংবাদিক, তৈমুর ফারুক তুষার।
ফেসবুকে সিনহার সাথে স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন, ‘‘১৯৯৪ সালে সিরাজগঞ্জের বিএল স্কুলে সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলাম আদনানকে। বেশির ভাগ দিন আমরা পাশাপাশি বসতাম। আমাদের সখ্যতার বড় কারণ ছিল পাঠ্য বইয়ের বাইরের বিষয়েই আমাদের বেশি আগ্রহ ছিল। আমার ঝোঁক ছিল মুভি দেখা আর আদনানের গল্পের বই পড়া। সাত্তার স্যারের বহু ক্লাসে আদনানকে গল্প বলার সুযোগ দেয়া হতো। আমরা মুগ্ধের মতো তার গল্প শুনতাম। সদা হাস্যজ্বল ও বিনয়ী আদনান ক্লাসে সকলেরই প্রিয় ছিল। পরের ক্লাসে সম্ভবত ও চলে গেল খ সেকশনে। ওর বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। পরের বছর বদলী হয়ে গেলেন। তখন তো মোবাইল বা ফেসবুকের জামানা ছিল না। এরপর আর কোনোদিন দেখা বা কথা হয়নি আদনানের সাথে। কয়েক বছর আগে আমাদেরই আরেক সহপাঠী অমিত বললো, আদনান এসএসএফ-এ আছে। তুই তো পিএম বিট কাভার করিস। দেখা হলে কথা বলিস। আমারও ইচ্ছা ছিল কথা বলার। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি।
আজ যখন কক্সবাজারে সাবেক সেনা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান পুলিশের গুলিতে নিহত এমন রিপোর্ট ও সাথে ছবি দেখলাম, কেমন জানি ধাক্কা খেলাম। দ্রুত পুরো রিপোর্টটা পড়লাম। বিস্তারিত পড়ে জানলাম সিনহা রাশেদ মানে আমাদের সহপাঠী বন্ধু আদনান সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছা অবসরে গিয়েছিল। কিছুদিন আগে সে ট্রাভেল ভিডিও বানাতে কক্সবাজারে যায়। আজ একটি ঘটনায় পুলিশের গুলিতে সে মারা গেল। একজনের কাছে জানলাম, দুনিয়া ঘুরে দেখবে বলে আদনান সেনাবাহিনী থেকে অবসরে গিয়েছিল।
আজ এত বছর পরে আদনানের খবর এভাবে পাব ভাবতেই পারিনি। আমার শুধু বারবার সাত্তার স্যারের ক্লাসে আদনানের গল্প বলার স্মৃতি মনে পড়ছে। আদনান হত্যার ঘটনায় সঠিক তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দাবি করছি।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়ায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর পুলিশ তল্লাশি চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ নিহত হন।