পাশেই ফুটওভার ব্রিজ রেখে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন পথচারীরা। © টিডিসি ফটো
রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম সড়কে পথচারীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুটওভার ব্রিজ আছে। তবে এসব ব্রিজ যেন নজরেই পড়ে না কিছু উদাসীন নাগরিকের। তারা অনেক সময় জেনেশুনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিচ দিয়েই রাস্তা পার হচ্ছেন। এতে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা ও সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। তবে কেন ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে অনীহা পথচারীদের? ডেইলি ক্যাম্পাসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বেশকিছু তথ্য।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং বিআরটিএ’র ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, দুই সিটি কর্পোরেশনের অধীনে প্রায় ৯৩ থেকে ১০০টি ফুটওভার ব্রিজ সচল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে পথচারীদের পারাপারে উৎসাহিত করতে বনানী, বিমানবন্দর সড়ক এবং ফার্মগেটসহ কয়েকটি এলাকার ফুটওভার ব্রিজে চলন্ত সিঁড়ি যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়াও কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, বনানী এলাকার জিয়া কলোনী এবং গাবতলীতে পারাপারের জন্য আন্ডারপাস রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি সড়কে ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও অনেকেই তা ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে নিচ দিয়ে সড়ক পার হচ্ছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে ফুটওভার ব্রিজ এড়িয়ে গাড়ির সামনে দিয়েই রাস্তা পার হতে দেখা যায়।
বাংলামোটর এলাকায় রাস্তা পারাপারে কেন ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করছেন না, জানতে চাইলে রসমত আলী নামের এক পথচারী বলেন, ‘একটু ব্যস্ততার মধ্যে আছি। তাড়াতাড়ি যেতে হবে। তাই ওভার ব্রিজে উঠার সময় পাইনি।’
মাদকসেবী এবং ছিনতাইকারীর ভয়
ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাসে প্রায়ই মাদকসেবী এবং ভবঘুরেদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বেশিরভাগ সময়েই সংঘবদ্ধ মাদকসেবীরা এসব স্থানে মাদক সেবন করেন। রাতের বেলায় এই সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে আরও বেড়ে যায়। এছাড়া অনেক ভবঘুরেকে এসব ব্রিজগুলোতে অস্থায়ীভাবে বসবাসও করতে দেখা যায়। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, এসব ফুটওভার ব্রিজগুলো সন্ধ্যার পর থেকেই মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের হটস্পটে পরিণত হয়।
ফার্মগেট এলাকার আরেফিন সজিব নামের একজন বলেন, সন্ধ্যার পর থেকে ফুটওভার ব্রিজে মাদকসেবীদের আনাগোনা অত্যধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। এদের মধ্যে অনেকে আবার ছিনতাইয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে। ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার চেয়ে গাড়ির মধ্য দিয়ে পার হওয়া ভালো।
ব্যবহারের অনুপযোগী: বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষের জন্য নেই ব্যবস্থা
ঢাকা মহানগরীর মহাখালী, শাহবাগ, মালিবাগ, ধানমন্ডি ও ওয়ারী এলাকার বেশকিছু ফুটওভার ব্রিজ পরিদর্শন করে দেখা গেছে এগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে আছে। বেশিরভাগ ব্রিজের সিঁড়িগুলোই শিশু ও বয়স্ক মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী। এগুলো অতিরিক্ত পরিমাণে খাড়া হওয়ায় অসুস্থ ও বৃদ্ধরা ব্যবহার করতে পারেন না। এছাড়া কোনো ব্রিজেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের ওঠার জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই।
এছাড়া অনেক ফুটওভার ব্রিজেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। কোনোটি একেবারে নির্জন, সিঁড়িগুলো নড়বড়ে ও মরিচা পড়ে গেছে। ফলে পথচারীরা এসব ব্রিজ ব্যবহার না করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পারাপার হচ্ছেন।
এ বিষয়ে ধানমন্ডির এক নারী পথচারী বলেন, ‘আমার পায়ে ব্যথা। ফুটওভার ব্রিজের খাড়া সিঁড়ি দিয়ে উঠতে কষ্ট হয়। সাথে আবার বাচ্চা আছে। বাচ্চা কোলে নিয়ে তো আর এত উপরে উঠতে পারবো না। তাই নিচ দিয়ে পার হচ্ছি।’
অপরিচ্ছন্ন ও মলমূত্র ত্যাগ
সরেজমিন দেখা যায়, তুলনামূলক কম ব্যবহৃত ফুটওভার ব্রিজগুলোতে ছিন্নমূল মানুষের অস্থায়ী বাসস্থান গড়ে উঠেছে। ফলে নিত্যদিনের প্রাকৃতিক কার্যও ব্রিজ বা তার আশেপাশে সারছেন তারা। অনেক ফুটওভার ব্রিজ এবং তার আশেপাশে মানুষের মলমূত্র ও বিভিন্ন বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এসব কারণেও অনেকে এসব ব্রিজ এড়িয়ে চলছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজধানীর পরীবাগ এলাকার একটি ফুটওভার ব্রিজের নিচে মানুষের মলমূত্র ও বিভিন্ন বর্জ্যের স্তূপ দেখা গেছে। এসময় রাস্তা পার হওয়া পথচারী জনি আহমেদ বলেন, ‘এই ব্রিজ এবং এর আশেপাশে কী অবস্থা হয়ে আছে আপনিই দেখেন। এখান দিয়ে কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ পারাপার হতে পারে?’
হকারদের দৌরাত্ম্য
আবার অনেক ব্যস্ততম ফুটওভার ব্রিজে রীতিমতো দোকান সাজিয়ে বসেছেন হকাররা। কেউ কেউ টেবিল রেখেই তার ওপর সাজিয়েছেন বিক্রির জন্য পণ্য। কেউবা ফুটওভার ব্রিজের ওপরই কাপড় বিছিয়ে দোকান সাজিয়ে বসেছেন। চলার পথে প্রয়োজনীয় পণ্য দেখে দাঁড়িয়ে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। ক্রেতাদের ভিড়ে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে চলাচলের পথ। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষের চলাচল।
এ বিষয়ে রাজউকের সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ তৌকির আহমদ অনিক বলেন, ঢাকা শহরে ফুটওভার ব্রিজ বাইপাস করে রাস্তা পারাপার একরকম ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহাসড়কে সাধারণ মানুষের আসার কথা না। এখানে ফুটপাতও দেওয়া হয় না। তবে আমাদের যেহেতু অতিরিক্ত জনবহুল শহর, বাধ্য হয়েই মাহাসড়কে আসতে হয়। আর বেশিরভাগ মানুষই ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে পার না হয়ে সরাসরি রাস্তা দিয়ে পার হয়ে যান। তবে এ ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনা, ট্রাফিক জ্যামের মতো আরও অনেক বিষয় জড়িয়ে আছে।
ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে এ নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, অনেকের সাথে বৃদ্ধ এবং শিশুরা থাকে। তাদের নিয়ে এসব উঁচু ব্রিজ পার হওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। তাই মানুষ ঝুঁকি নিয়ে হলেও রাস্তা দিয়ে পার হন। এটা কিন্তু শুধু বাংলাদেশে না, বাইরের অনেক দেশের মানুষও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করেন না।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে তৌকির আহমদ অনিক বলেন, মানুষকে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে উৎসাহী করতে করতে হলে আগে এর ব্যবহার সহজ করতে হবে। চলন্ত সিঁড়ি বসিয়ে দিলে কিন্তু মানুষ সহজেই এটি ব্যবহার করতে পারবে। এই উদাহরণটা মেট্রোরেলে ভালো দেখতে পাবেন। বনানী, ফার্মগেটের মতো কয়েকটি জায়গায় এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে আর কার্যকর হয়নি। তা ছাড়া নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান পরিচালনার মাধ্যমেও মানুষকে এগুলো ব্যবহারে উৎসাহী করা সম্ভব।