রৌমারী উপজেলা শিক্ষা অফিসের বই রাখার গোডাউন © সংগৃহীত
শেরপুরে পুলিশের হাতে আটক হওয়া মাধ্যমিক পর্যায়ের ৯ হাজার সরকারি বই রৌমারী থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। তদন্তে কেঁচো খুঁড়তে সাপের অস্তিত্ব পেয়েছেন তারা। উদ্ধার হওয়া বইয়ের চেয়ে গোডাউনে বই ঘাটতির পরিমাণ আরও বেশি বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে উপজেলা প্রশাসনসহ শিক্ষা বিভাগের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোডাউনে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বইয়ের ঘাটতি রয়েছে ১৭ হাজার ৫৩৩টি। এর মধ্যে শেরপুর থানা কর্তৃক ৯ হাজার ৬৭০টি বই উদ্ধার করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৭ হাজার ৮৬৩টি বইয়ের কোনো হদিস মেলেনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, তদন্তে রৌমারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের গোডাউনে বই ঘাটতির প্রমাণ মিলেছে। ঘাটতির পরিমাণ উদ্ধার হওয়া বইয়ের প্রায় দ্বিগুণ। শুধু তাই নয়, গোডাউনে কিছু বাড়তি বইও পাওয়া গেছে। তবে সেসব বইয়ের কোনো চালান ও নথি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, একই গোডাউনে ৯ম ও ১০ম শ্রেণির ভূগোল ও পরিবেশ, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সভ্যতা, পৌরনীতি ও নাগরিকতা, ইসলাম শিক্ষা এবং হিন্দুধর্ম শিক্ষা বিষয়ের মোট ৮ হাজার ৫৬১টি বই মজুদ রয়েছে। তবে তার কোনো চালান কপি পায়নি তদন্ত কমিটি। বইগুলো কীভাবে গোডাউনে এসেছে সে বিষয়ে গোডাউনের দায়িত্বে থাকা উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার ও অফিস সহায়ক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, রৌমারীতে ২০২৫ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে এখন পর্যন্ত বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৬৬ হাজার ৭৫০টি বই। এর মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৪১ হাজার ৭৮১ বই বিতরণ করা হয়েছে। সে হিসেবে শিক্ষা অফিসের গোডাউনে আরও ২৪ হাজার ৭৬৭ বই থাকার কথা।
সরকারিভাবে বিনামূল্যে বিতরণের বই উদ্ধারের ঘটনায় শেরপুর থানা পুলিশ বাদী হয়ে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করে। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ট্রাকচালক সজল মিয়া এবং বইয়ের সঙ্গে থাকা মাহিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে শেরপুর থানা পুলিশ। মাহিদুলের বাড়ি রৌমারী উপজেলায়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রৌমারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহায়ক (পিয়ন) জামাল উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে সরকারি বই পাচার, অর্থ আত্মসাৎসহ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ বই চুরি ও পাচারের সঙ্গে শুধু নিম্নশ্রেণির কর্মচারী জড়িত থাকতে পারে না। এর সঙ্গে বই বিতরণে জড়িত শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বশীলদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। বিষয়টি অধিকতর তদন্তের দাবি করে গত শনিবার (২৫ জানুয়ারি) মানববন্ধন করেন স্থানীয়রা।
জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, রৌমারী উপজেলা শিক্ষা অফিসের গোডাউনে রাখা বই সংরক্ষণ ও বিতরণের দায়িত্বে ছিলেন উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার মোক্তার হোসেন, অফিস সহকারী আখেরুল ইসলাম এবং পিয়ন জামাল উদ্দিন। প্রাথমিক তদন্তে তাদের প্রত্যেকের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিলেছে।
এদিকে বই উদ্ধারের ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পিয়ন জামালকে গ্রেপ্তার করা হলেও অপর দুই দায়িত্বশীল উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার এবং অফিস সহকারী আখেরুল ইসলাম বহাল তবিয়তে রয়েছেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা শিক্ষা অফিসার (ডিইও) শামসুল আলম।
ডিইও শামসুল আলম বলেন, ‘পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার এবং অফিস সহকারী দায়িত্বে অবহেলার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এখনও ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তবে জেলার অন্য উপজেলাগুলোতেও বইয়ের গোডাউনের মজুদ ও বিতরণ যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল কুমার হালদার বলেন, ‘তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বই পাচারের ঘটনায় আরও কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সাথে প্রাথমিক পর্যায়ের বইয়ের হিসাবও মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’