স্থানীয় সরকার নির্বাচন
এনসিপি লোগো © টিডিসি সম্পাদিত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাফল্যের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ইতোমধ্যে দলটির তৃণমূলে লেগেছে নির্বাচনের ছোঁয়া। প্রস্তুতি শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তবে তারুণ্য নির্ভর দলটি এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে নাকি জোটগতভাবে তা নিয়ে এখনও অবস্থান পরিষ্কার করেনি। যদিও জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূল পর্যায়ে দলের অবস্থান তৈরি ও সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ হিসেবে দেখছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।
আগাম প্রস্তুতি
দল গঠনের ১ বছরের মাথায় জোটগতভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। ৩০টি আসনে শাপলা কলি প্রতীকে নির্বাচন করে ৬টি আসনে জয়লাভ করে দলটির প্রার্থীরা। দল গঠনের পর নির্বাচন প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় না পেলেও সংসদ নির্বাচনে এমন ফলাফলকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে মনে করছেন অনেকে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে দলটি।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমকে চেয়ারম্যান ও যুগ্ম সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদকে সদস্য সচিব করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি গঠনের পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি সারজিস আলম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দ্রুত প্রাথমিকভাবে প্রার্থী যাচাই বাছাই শুরু করব। উপজেলা এবং সাংগঠনিক অঞ্চলে গিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে আমাদের প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।
এছাড়া এনসিপি এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুতি শুরু করতে যাচ্ছে উল্লেখ করে পৌরসভা ও ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জেলা উপজেলায় মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মী যারা রয়েছেন, তাদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান সারজিস আলম। আগাম প্রস্তুতির কারণ হিসেবে সারজিস বলেন, গত এক বছরে এনসিপি বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তর রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠেছে। অনেক বন্ধুর পথ আমাদের পাড়ি দিতে হয়েছে। আমরা পর্যাপ্ত সময় পেলে আসন সংখ্যা ৬ থেকে বাড়তে পারত। এজন্য আমরা সবার আগেই স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি কার্যক্রম শুরু করেছি।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। গত রোববার (২৯ মার্চ) রাতে সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক আবদুর রহমান আফজাল মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানান নাহিদ ইসলাম। এছাড়াও শিগগিরই বাকি ৭ সিটি করপোরেশনেও নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে দলটি।
এদিকে আসন্ন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এনসিপি থেকে ডিএসসিসি আওতাধীন ৭৫টি ওয়ার্ড এবং ২৫টি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ইচ্ছুক প্রার্থীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে মহানগর দক্ষিণ শাখা এনসিপি। সেই লক্ষ্যেই দলটি তৃণমূল থেকে জনপ্রিয়, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী এবং জনসেবায় নিবেদিত ব্যক্তিদের সামনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। প্রার্থী হিসেবে আগ্রহী ব্যক্তিদের কিছু গুণাবলি ও যোগ্যতা থাকা বাধ্যতামূলক বলে জানিয়েছে দলটি। এর মধ্যে রয়েছে- জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা; সৎ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মানসিকতা; নিজ নিজ ওয়ার্ডে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা; নগর সমস্যা ও নাগরিক সেবার বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা ও কাজ করার আগ্রহ।
একক না জোটগত নির্বাচন স্পষ্ট করেনি কেন্দ্র
এনসিপির কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলা হলেও জোটগতভাবে নির্বাচন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। দলের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি বিবেচনায় জোটগত নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হতে পারে।
জোট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে সারজিস আলম বলেন, এখন পর্যন্ত এনসিপি ও জামায়াত এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জোটকেন্দ্রিক নির্বাচন হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত শেষ মুহূর্তে নেওয়া হবে।
এরপর গত রোববার সংবাদ সম্মেলনে জোটগত নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো জোট হবে কি হবে না এটা আসলে পরবর্তী পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে শুরুতে একক নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলো এনসিপি। এমনকি এনসিপির মনোনয়নপত্র বিতরণ কার্যক্রমে ৩০০ আসনের বিপরীতে ১ হাজার ৪৮৪ টি মনোনয়ন পত্র বিক্রি করে দলটি। ১০ ডিসেম্বর ১২৫ টি আসনে দলে প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকা ঘোষণা করে এনসিপি। তবে শেষমেষ জোটগতভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা আসে এনসিপির পক্ষ থেকে। ২৮ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেন, জামায়াত ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে তাদের। বিষয়টি নিয়ে অনেকে অবাক হলেও এনসিপির পক্ষ থেকে তিনটি কারণকে সামনে আনা হয়। এরমধ্যে অন্যতম গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। সেক্ষেত্রে গণভোটে এনসিপির প্রত্যাশা অনুযায়ী ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান ছিল জোটের। এছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের পর অভ্যুত্থানের নেতাদের নিরাপত্তা ইস্যু। এছাড়াও নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া।
ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে একক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও শেষ মুহূর্তে জোটে ঝুঁকবে কী, তা নিয়ে আছে প্রশ্ন।
দলীয় সূত্র বলছে, নির্বাচন নিয়ে দুইটি সিদ্ধান্ত আছে এনসিপির নীতিনির্ধারকদের। এরমধ্যে একটি সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই এককভাবে অংশ নিয়ে দলীয় সক্ষমতা যাচাই ও বৃদ্ধি করা। এছাড়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নিয়ে, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়নে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। বিশেষত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে দলটির আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
তৃণমূলের জন্য সক্ষমতা তৈরির চ্যালেঞ্জ
জানা যায়, নির্বাচনের ছোঁয়া লেগেছে দলটির তৃণমূলেও। দলের কেন্দ্র থেকে সরাসরি মনিটারিং করা হচ্ছে তৃণমূলের কার্যক্রম। এনসিপির দুই সাংগঠনিক অঞ্চলের জেলা, উপজেলা ও অন্য ইউনিটিগুলোতে কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এরমধ্যে উত্তরাঞ্চলের ৩২টি জেলায় কমিটি গঠন শেষ হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের ২০টি জেলায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাকি জেলাগুলোতেও দ্রুত কমিটি ঘোষণা করা হবে। কমিটিগুলো নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছে।
তৃণমূলের প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক সাদিয়া ফারজানা দিনা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অধিকাংশ জেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলো তৃণমূলে কার্যক্রম শুরু করেছে এবং প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব সব কমিটি গঠনের চেষ্টা করছি। কমিটিগুলো শুধু গঠনেই সীমাবদ্ধ নেই, সাংগঠনিক কার্যক্রমও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মহানগর বা সিটি কর্পোরেশনের স্তরে কমিটি গঠন ও কার্যক্রম চলমান।
বিভিন্ন জেলা কমিটির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণভাবে প্রস্তুতি শুরু করেছেন তারা। এ বিষয়ে কথা বলা হলে সিলেট জেলা কমিটির আহ্বায়ক মো. জুনেদ আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নির্বাচনের জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে আমাদের। মেয়রের বিষয়টা প্রাথমিক নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন সিলেট মহানগরের ৪২টা ওয়ার্ড গোছানোর কাজ চলছে। এছাড়া আমাদের উপজেলা কমিটির কাজ চলছে। অর্ধেক উপজেলার কমিটি হয়ে গেছে, বাকিগুলোর কমিটিও দ্রুত সময়ে হয়ে যাবে। আমরা অযথা লোক দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব না। শুধুমাত্র দায়িত্বশীল ও প্রার্থী নির্বাচনের মান অনুযায়ী নির্বাচন কার্যক্রমে অংশ নেব।
জামালপুর জেলা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. সাদুল্লাহেল মামুন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জামালপুরে মোটামুটি আমরা অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছি। আমরা দ্রুতই জেলা ও উপজেলা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা বসে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করবো। আলটিমেটলি নির্বাচনে আমরা যাই বা না যাই দল গোছানোর সুযোগ হবে, কার্যক্রম বাড়বে, একটা ফলাফল আসবে।
জামালপুরের সব উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নে আপনাদের প্রার্থী থাকবে কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের রুট লেভেলে যদি সব কমিটি হয়ে যায়, তাদের মধ্য থেকে যদি একটা রেসপন্স ভালো আসে এবং ভালো প্রার্থী আসে- সেই ক্ষেত্রে তো আমরা অবশ্যই চেষ্টা করবো এককভাবে নির্বাচনের। আর যদি দেখা যায় ওভাবে সিচুয়েশন ক্রিয়েট হয় নাই, কোনো কারণে যদি আমরা অযোগ্য লোক দিয়ে তো নিশ্চয়ই নির্বাচনে যাব না শুধু দায়সারা একটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে।
ঢাকা মহানগর উত্তর এনসিপির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসিন বলেন, সাংগঠনিকভাবে আমরা সব ওয়ার্ড পর্যায়ের সব জায়গায় প্রার্থী দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখনও সিলেকশনের কাজ চলমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, উত্তরের জন্য প্রস্তুতি একইভাবে চলছে। সাভার, আশুলিয়া ও হামলা—এই তিন জায়গাতেই প্রস্তুতি সমানভাবে নেওয়া হচ্ছে। যেকোনো নির্বাচনে নির্বাচনকে সহজভাবে না নিয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। সেই মনোভাব নিয়েই আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশা করি এনসিপির পারফরমেন্স ভালো হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে জানতে চাইলে দলের এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক সাদিয়া ফারজানা দিনা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সংগঠন গোছানোতে। তৃণমূলের সর্বত্র প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আমরা মনোযোগী। কমিটি গঠন করে নির্বাচনের জন্য শক্তিশালীভাবেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।