আশ্রয়ণের ৬০ ঘর গুঁড়িয়ে দিল প্রভাবশালীরা, হতদরিদ্রদের কান্না

২৩ জানুয়ারি ২০২৫, ১১:২৮ AM , আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৫, ০৩:১০ PM
ধ্বংসস্তূপে পরিণত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর

ধ্বংসস্তূপে পরিণত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর © টিডিসি ফটো

স্বামী-পরিত্যক্তা হতদরিদ্র ফুলমালা বেগম (৪০) চক ভাড়ারা বাঁধের পাশে ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরের দরজায় বসে চোখের পানি ফেলছিলেন। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাবেন, কূলকিনারা না পেয়ে এখানে এসে কোনোমতে একটি ঘর তুলেছেন। কখনো অন্যের বাড়িতে, কখনো দিনমজুরের কাজ করে সংসার চলে তার। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ভেঙে দেওয়ার পর দিশেহারা তিনি।

শুধু ফুলমালা বেগম-ই নন, তার মতো আরও ৪০টি পরিবারের একই দুর্দশার চিত্র। তারা সবাই পাবনা সদর উপজেলার ভাড়ারা ইউনিয়নের চক ভাড়ারা গুচ্ছগ্রামে বিগত সরকারের কাছ থেকে পাওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে বসবাস করতেন। কিন্তু প্রকল্পের ঘর ভেঙে জমি দখলের পর এখন কেউ বাঁধে, কেউ অন্যের বাড়িতে মানবেতর জীবন যাপন করেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় জামায়াত-বিএনপি সমর্থিত কিছু লোক ঘর স্থাপন করা ওই জমিকে নিজেদের দাবি করে পরিবারগুলোকে অস্ত্রের মুখে ঘর ছাড়তে বাধ্য করে তুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে ঘরের সব আসবাব লুট করে নিয়ে যায়। অথচ ঘটনার পাঁচ মাস হলেও টনক নড়েনি স্থানীয় প্রশাসনের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে দেশব্যাপী ভূমিহীনদের জমিসহ ঘর দেওয়ার উদ্যোগ নেয় পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। তখন সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের পশ্চিম জামুয়া গ্রামে ভূমিহীন ৬০টি পরিবারকে দলিলসহ ঘর বুঝিয়ে দেয় স্থানীয় প্রশাসন।

গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী সরকারের পতনের পর ওই দিনই সন্ধ্যায় সেই জমি নিজেদের দাবি করে বসে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র। তারা বসবাস করা ভূমিহীন পরিবারগুলোকে ঘর ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেয়।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাদের অস্ত্রের মুখে ঘর ছাড়তে বাধ্য করে তারা। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় আশ্রয়ণ প্রকল্পের সবগুলো ঘর। লুট করা হয় ঘরের দরজা, জানালা, টিনের চালসহ সবকিছু। স্থানীয়রা জানান, সেখানে ৬০টি ঘর থাকলেও বসবাস করতেন ৪০টি পরিবার।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা নিজের প্রাণ বাঁচাতে অন্যত্র আশ্রয় নিলে ওই জমি নিজেদের দাবি করে সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা চলমান আছে উল্লেখ করে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয় চক্রটি।

জমির মালিক দাবিদার সাতজন হলেন, ভাড়ারা পশ্চিম জামুয়া গ্রামের আকরাম প্রামাণিক, উম্মত প্রামাণিক, আক্কাস প্রামাণিক, ইব্রাহিম প্রামাণিক, ইসমাইল প্রামাণিক, নায়েব আলী ও নবাব আলী। তাদের বেশির ভাগই জামায়াত ও দু-একজন বিএনপি সমর্থক বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র। আর এই প্রতিবেদকের কালে দুজন স্বীকার করেছেন তারা জামায়াত সমর্থক এবং কয়েকজন বিএনপির সমর্থক বলে স্বীকার করেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ হলে নজরে আসে সবার।

গত মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে সরেজমিনে ভাড়ারা পশ্চিম জামুয়া গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় সুনসান নিরবতা। ধ্বংসস্তূপের চারপাশে কোথাও কেউ নেই। প্রকল্পের ৬০টি ঘরের সব কটিই ভাঙাচোরা। দরজা, জানালা, টিন, ইটের দেয়াল কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই। ভেঙে ফেলা ইট-সুরকি চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কোনো ঘর সবটুকুই ভাঙা, কোনোটি আবার অর্ধেক। ভেঙে ফেলা ঘরে লোহার রড বেরিয়ে রয়েছে। প্রায় প্রতিটি ঘরের সামনে ও আশপাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে আবাদি শাকসবজি।

প্রকল্পের প্রবেশমুখেই একটি সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। যেখানে লেখা : ‘নিম্নবর্ণিত সম্পত্তি লইয়া পাবনা সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা চলমান আছে। বাদী সাতজনের নাম, বিবাদী সরকার। জমির পরিমাণ ১ দশমিক ৩৮ একর।’

জানতে চাইলে জমির মালিক দাবিদার পশ্চিম জামুয়া গ্রামের নায়েব আলী ও আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে আতিক প্রামাণিক বলেন, ‘এই জমি আমাদের। কিন্তু পতিত সরকারের সন্ত্রাসী আবু সাইদ খান চেয়ারম্যান সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে এই জমি জোর করে দখল নিয়ে প্রশাসনকে দিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প করেছিল।’

তারা আরও বলেন, ‘এই জমি নিয়ে ২০১০ ও ২০২০ সালে আদালতে মামলাও করেছি আমরা। সেই মামলা চলমান থাকা অবস্থায় প্রশাসনের লোকজন নিজেদের ইচ্ছামতো আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর করেছে। তখন আমরা অসহায় ছিলাম, কিছু করতে পারিনি। আমাদের জমি দাবি করে তাদের চলে যেতে বলেছিলাম, তবে ঘর ভাঙচুরের সঙ্গে আমরা জড়িত না। তারা নিজেরাই ঘরের সবকিছু ভেঙে নিয়ে চলে গেছে। এখানে আমাদের ওপর মিথ্যা দোষারোপ করা হচ্ছে।’

তখন তাদের জমির দলিল ও প্রমাণাদি দেখাতে বলা হয়। কিন্তু দেখাবে বললেও তিন দিনেও তারা জমির দলিল দেখাতে পারেননি এই প্রতিবেদককে। যে মামলার কথা তারা বলছেন, সেই মামলার কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, ২০১৯ সালে তদবিরের অভাবে খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। তারপর তারা সেই খারিজ বাতিলের আবেদন জানিয়ে আদালতে মিস কেস করেছেন। কিন্তু তারও যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভূমিহীনরা এখন পাশের একটি বাঁধে বসবাস করছেন। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ফুলমালা বেগম বাঁধের নিচে ছোট্ট একটা টিনের চাল ও পাটকাঠির বেড়া দিয়ে একটি ঘর তুলে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বসবাস করছেন। আশপাশে পাওয়া গেল ভুক্তভোগী আরও কয়েকজনকে।

কী হয়েছিল সেদিন, জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফুলমালা বেগম বলেন, ‘শেখ হাসিনা পালায়ে যাবার পর সন্ধ্যার সময় কিছু লোকজন এসে আমাগারে এক ঘণ্টার মধ্যি ঘর ছাইড়ে দিবার জন্যি বলে। তখন রান্না করতেছিলাম। তাগারে অনুরোধ কইরেও কাম হয় নাই। সারা রাত না খায়ে ঘরের বাইরে বসে কাঁদিছিলাম। সকালে কাপর-চুপুর (কাপড়চোপড়) লিয়ে বাপের বাড়িতে যাই। সেহেন (সেখান) থেনে এই বাধে আইসে কোনোরহমে এই ঘরডা তুইলে আছি। আমরা সরকারের কাছে মাথা গুজার ঠাঁই চাই।’

বাচ্চু প্রামাণিকের স্ত্রী ফাতেমা খাতুন বলেন, ‘ওই দিন পরথম কয়েকজন আইছিল। ঘণ্টাখানেক পর পিরায় ৩০০ থেকে ৪০০ লোক আইসে আমাগারে ওপর সেই হম্বিতম্বি। এক ঘণ্টা সুময় দিয়ে কইল, যার যা আছে টুপলা বাইধে চইলি যা, না হলি বিপদ হবি। এই কয়া ভাঙচুর শুরু করে। পরে কী করব, দিশামিশা না পায়া যা ছিল কাপড়-চোপড় একটা ছাগল ছিল লিয়ে চইলে আসি। পরে সেই ছাগলডা বেইচে এই বাধে কুনুরহম (কোনোরকম) ঘরডা তুইলে আছি বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন।’

মৃত আবেদ শেখের স্ত্রী বৃদ্ধা ফাতেমা বেগমের (৭০) ছেলে আলম শেখ বলেন, ‘ভাঙচুর শুরু হলি আমার বৃদ্ধা মাকে নিয়ে পাগলের মতো হয়ে গেছিলাম। কোনো যাব কী করব, দিশেহারা অবস্থা তখন। পরে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় লেই। আর দিনমজুরি কইরে বাধের এহেনে আইসে ছাপড়া তুইলে মাকে লিয়ে আছি।’

ঘটনার পর প্রশাসনকে বারবার জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন ভাঁড়ারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ খান। তিনি বলেন, ‘ভুক্তভোগীরা এখন বাঁধের ওপর মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের টয়লেট, পানির ব্যবস্থা নেই। দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছে তারা। সরকারের সঙ্গে দখলদারদের জমি নিয়ে ঝামেলা থাকুক, সমস্যা নেই। কিন্তু এই গরিব মানুষগুলোর তো কোনো দোষ নেই। তারা কোথায় যাবে এখন? তাদের দ্রুত পুনর্বাসনের দাবি জানাই।’

এ বিষয়ে পাবনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়িগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে, বিষয়টি জানা ছিল না। তবে নজরে আসার পর আমি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে বলেছি। পুরো বিষয়টি জানার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যদি কেউ ভেঙে থাকে, তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পাবনা সদর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রতিটি ঘর নির্মাণে খরচ হয় ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। সে হিসেবে ৬০টি ঘর নির্মাণে সরকারের খরচ হয়েছে এক কোটি দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা।

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জাবির পরিবহন অফিসের কর্মচারী বরখাস্ত…
  • ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
ফয়জুল করীমের আসনে জামায়াতের প্রার্থী না দেওয়া নিয়ে যা বলছে …
  • ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
পুরান ঢাকায় জবির সাবেক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
  • ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
আমির হামজার বিরুদ্ধে ইবি ছাত্রদল নেতার মামলা
  • ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
ইসির ওপর আস্থা নেই, এনসিপি নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা ভাবার সম…
  • ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
যৌথবাহিনীর অভিযানে ইয়াবাসহ জামাই-শ্বশুর গ্রেপ্তার
  • ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SPRING 2026
Application Deadline Wednesday, 21 January, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9