দিল্লি অবশেষে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করতে চাইছে, তবে...

০৮ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০৬ PM , আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৫, ০৩:৫২ PM
বাংলাদেশ-ভারতের পতাকা

বাংলাদেশ-ভারতের পতাকা © সংগৃহীত

বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে গত বছরের ৫ আগস্ট। এরপর পাঁচ মাসেরও বেশি সময় কেটে গেছে। সেই থেকে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও দেখা গেছে নাটকীয় অবনতি, যা এখনো ‘স্বাভাবিক’ হয়েছে মোটেই বলা যাবে না। গত কয়েক মাসে দুই দেশের সরকার নিজেদের মধ্যে যে ঠিক ‘বন্ধুপ্রতিম’ ব্যবহার করেনি, সেটাও দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

 সম্প্রতি এমন কিছু লক্ষণ দুপক্ষ থেকেই দেখা যাচ্ছে—যা থেকে দিল্লির পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন, নতুন বছরে হয়তো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটা উন্নতির সম্ভাবনা আছে।

পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন, ভারত ও বাংলাদেশকে যে পরস্পরের স্বার্থেই নিজেদের মধ্যে কূটনৈতিক, স্ট্র্যাটেজিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ‘মোটামুটি একটা সুসম্পর্ক’ রেখে চলতে হবে। এই উপলব্ধিটা ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসছে এবং তার রাস্তাটা খুঁজে বের করারও চেষ্টা চলছে।

তারা এটাও স্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে ভারতের দিক থেকে এই প্রচেষ্টা হবে পুরোপুরি ‘শর্তাধীন’ –অর্থাৎ ভারতের দেওয়া বিশেষ কয়েকটি শর্ত পূরণ না হলে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দিল্লি সম্ভবত খুব একটা গরজ দেখাবে না। এর মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দু তথা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কিংবা পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো অতি স্পর্শকাতর বিষয়ও থাকতে পারে। সামরিক বা নিরাপত্তা স্বার্থের দিকটিও অবশ্যই গুরুত্ব পাবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নতুন বছরে স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা ‘ঠিক কোন ধরনের’ বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ায় আগ্রহী। মানে সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়াটা যেকোনো অপশন নয়–প্রকারান্তরে দিল্লিও সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর প্রধান কিংবা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বক্তব্যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যে ধরনের বার্তা এসেছে, সেটাকেও ভারত বেশ ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

দিল্লিতে শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যে ভারতবিরোধী ‘রেটোরিক’ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে, এটা একটা ভালো লক্ষণ, যা সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্কের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

আর অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটা খানিকটা ‘অটো পাইলট’ মোডে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চলতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যাতে দুপক্ষের সরকারি হস্তক্ষেপের হয়তো তেমন প্রয়োজন হবে না।

দিল্লির সাউথ ব্লক যা বলছে
ভারত ঠিক কী ধরনের বাংলাদেশ দেখতে চায়, এর জবাবে শেখ হাসিনার আমলে সাউথ ব্লক (যেখানে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) বারবার যে কথাটা বলত তা হলো, তারা একটি 'শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল' বাংলাদেশের পক্ষে এবং আমেরিকাকেও সে বক্তব্য জানানো হয়েছে।

এই কথাটাকে অবশ্য শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন হিসেবেই দেখা হতো। কারণ, শেখ হাসিনার আমলেই বাংলাদেশ এই বিশেষ মাইলস্টোনগুলো অর্জন করেছে–ভারত সেটাও বিশ্বাস করত প্রবলভাবে।

সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের পরই প্রেস বিবৃতির আকারে এই মনোভাব স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল, ইনক্লুসিভ বাংলাদেশকে সমর্থন করে।’

তিনি বলেন, ‘এটাও বলা হয়েছে যে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়তে চাই, যা হতে হবে পারস্পরিক আস্থা, মর্যাদা, স্বার্থ ও একে অপরের উদ্বেগগুলো নিয়ে সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে।’

বছরখানেক আগেকার চেয়ে ভারতের এই বক্তব্যে নতুন শব্দ দুটো হচ্ছে–গণতান্ত্রিক আর ইনক্লুসিভ (অন্তর্ভুক্তিমূলক)।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ দ্রুত গণতান্ত্রিক পরম্পরায় ফিরুক এবং মানুষের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার সে দেশে ক্ষমতায় আসুক, প্রথম শব্দটির মধ্য দিয়ে ভারত সেটাই বোঝাতে চেয়েছে। আর ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক' কথাটার মধ্যে দিয়ে সে দেশের সমাজজীবনে সংখ্যালঘুদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে সব ধরনের শক্তিকে ঠাঁই দেওয়ার কথাই বলতে চাওয়া হয়েছে বলে তারা ব্যাখ্যা করছেন।

কিন্তু নতুন দুটো শর্ত যোগ করার চেয়েও যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, পাঁচ আগস্টের পর এই প্রথম ভারত প্রকাশ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। বেশ কয়েক মাস ধরে সংখ্যালঘু নির্যাতন, আকস্মিক বন্যা ঘটানোর অভিযোগ ইত্যাদি ইস্যুতে লাগাতার সমালোচনা বা দুই সরকারপ্রধানের মধ্যে বৈঠকের অনুরোধ নাকচ করার পর দিল্লির দিক থেকে এই পদক্ষেপ অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ।

পাকিস্তানকে নিয়ে সাবধান থাকতে হবে
ভারতের সাবেক শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদ তথা ঢাকায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ভিনা সিক্রি মনে করেন, ভারত যে বাংলাদেশের সঙ্গে সহজ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক চায়, এর মধ্যে কোনো ভুল নেই। তবে এখন কয়েকটি বিষয় নিয়ে দিল্লিকে সাবধান থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কিন্তু বরাবরই আমাদের জন্য একটি “প্রায়োরিটি কান্ট্রি” ছিল, এখনো তা-ই আছে। কিন্তু এই সম্পর্ককে আমরা তখনই অগ্রাধিকার দেব, যখন এটা উভয়ের জন্যই সুফল বয়ে আনবে। গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে ভারত ঠিক এই বার্তাই দিয়েছে।’

সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, ‘তবে এখানে কয়েকটি “যদি বা কিন্তু” আছে। যেমন পাকিস্তান যেভাবে এই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাইছে, সেটা ভারতের জন্য কিন্তু একটা “রিয়াল” সিকিওরিটি থ্রেট বা সত্যিকারের নিরাপত্তাগত হুমকি। বাংলাদেশের মাটিকে পাকিস্তান যেকোনোভাবে ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে বা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে ব্যবহার করবে না, সেটা নিয়ে শতকরা একশোভাগ নিশ্চিত হতে পারলে তবেই ভারত এই সম্পর্ক নিয়ে এগোতে পারবে।

পাশাপাশি ভারত আরও দুটি ‘শর্তে’র ওপর জোর দিতে চাইবে, এমন পর্যবেক্ষণ করে ভিনা সিক্রি বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব সে দেশে নির্বাচন আয়োজনের ওপর ভারত জোর দেবে। শুধু তা-ই নয়, সে নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হতে হবে এবং তাতে সব দল ও মতাবলম্বীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের প্রশ্নেও বাংলাদেশ সরকারের একটা “রিয়েলিটি চেক” করা দরকার, অর্থাৎ বাস্তবতা মেনে নেওয়া প্রয়োজন। সবকিছু ভারতীয় মিডিয়ার অতিরঞ্জন বলে তারা ঢালাওভাবে অস্বীকার করে যাবেন, এটা মেনে নেওয়া যায় না!’

এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে ‘অগ্রগতি’ হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পালেও আবার হাওয়া লাগা সম্ভব বলে মনে করেন ভিনা সিক্রি।

ঠান্ডা জল ঢালতে পারে আওয়ামী লীগ ইস্যু
অন্যদিকে ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, শিগগিরই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতি হবে। তবে তিনি এই বিষয়টি মানছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক চিন্তা শোনা গেছে, যেমন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান বা পররাষ্ট্র উপদেষ্টাদের বক্তব্য, যা সম্পর্কের উন্নতির প্রতি ইঙ্গিত দেয়। তবে, তার আশঙ্কা—নির্বাচনের আগে যদি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ইস্যু সমাধান না করতে পারে, তাহলে ভারত সম্ভবত আবার অসহযোগিতার পথে যেতে পারে।

এ ছাড়া বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোনো মামলা থাকলে, সে বিষয়টি সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, এবং সেটি উভয় দেশের স্বার্থে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের বাজার ভারত কখনওই ছাড়তে চাইবে না, আবার বাংলাদেশও ভারী পণ্য আমদানির জন্য ভারতকে উপযুক্ত উৎস হিসেবে দেখে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে একটি ‘অটো পাইলট’ মোডে চলছে, যেখানে সরকারের তেমন হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

ভারতের অর্থনীতিবিদ প্রবীর দে বলেন, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশই একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তিনি মনে করেন, যদিও আগের মতো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা নেই, কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক লক্ষণ রয়েছে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে সীমান্ত এবং স্থলবন্দর চালু থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং বাণিজ্যিক কনসাইনমেন্ট বাতিল হয়নি, যা সম্পর্কের উন্নতির সম্ভাবনা তৈরি করে। যদিও বাংলাদেশে ভারতের রফতানিমুখী শিল্পগুলো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও ভারতের এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, তাদের গার্মেন্ট রফতানি বেড়েছে, যা ভারতের লাভজনক।

এছাড়া, ভারত যে বাংলাদেশে কিছু অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করছে, সেগুলো এখনও চলমান রয়েছে, এবং এগুলো যেকোনো সময় আবার শুরু হতে পারে। আশুগঞ্জ-আখাউড়া হাইওয়ে নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের সাথে বাংলাদেশের সমঝোতা এখনো বাতিল হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে বাংলাদেশ এবং ভারতের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে, এবং উভয় দেশের এই সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বিশেষভাবে তাগিদ থাকবে। তবে, সম্পর্কের উন্নতি নির্ভর করবে বাংলাদেশে নির্বাচন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং পাকিস্তান থেকে কোন ধরনের হুমকি এড়িয়ে চলা নিশ্চিত করতে পারলে।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী ২ কর্মকর্তা গ্রেফতার
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
রোহিঙ্গাদের জন্য ২.৯ মিলিয়ন ডলার অনুদান দি‌য়ে‌ছে সুইডেন
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
‘যারা ভোটকেন্দ্র দখল করতে আসবে, তারা যেন মা-বউয়ের কাছে মাফ …
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
নির্বাচন ডাকাতি আর কখনো যেন না ঘটতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে …
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
শাবিপ্রবি ভর্তি পরীক্ষায় কোন ইউনিটে কত প্রার্থী
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইনানের আটকের বিষয়ে যা জানা গেল
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SPRING 2026
Application Deadline Wednesday, 21 January, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9