লকডাউনে সবার গল্প এক নয়

লকডাউনে সবার গল্প এক নয়
  © ফাইল ছবি

গত ৪ এপ্রিল থেকে সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। আদৌও জানি না কতদিন চলবে এ লকডাউন। তবে একটা বিষয় উপলব্ধি করলাম, করোনা মহামারি ঠেকাতে এই লকডাউন হলেও পেটের মহামারি ঠেকানোর বিষয়ে সরকারের কোন সুনির্দিষ্ট বক্তব্য শুনিনি।

যে কারণে প্রজাতন্ত্রের একজন নাগরিক হিসাবে কিছু প্রশ্ন তুলতে চাই। দয়া করে বিরোধিতা না দেখে বাস্তবতার নিরিখে কথাগুলো গ্রহণ বা বর্জন করবেন। বিনয়ের সাথে শুরু করছি। লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার, কিন্তু আমরা কি জানি? বাংলাদেশে কত শতাংশ মানুষ নিম্ন আয়ের, মধ্য আয়ের এবং উচ্চ আয়ের...।

উচ্চ আয়ের মানুষের কথা বাদ দিলাম, কারণ তাদের অর্থ আছে, তাছাড়া আবার তারা উপরন্ত সরকারী প্রনোদনার হকদারের বিষয়টা তো আছেই। এই যারা নিজেদের চালিয়ে নিতে পারবে তাদের পার্সেন্টটা কত হবে? উত্তর তারা ৮-১০ শতাংশের বেশি হবে না।

এবার আসা যাক মধ্যবিত্তদের ভেতরে। এখানেও আবার আছে উচ্চ মধ্যবিত্ত, মদ্ধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্ত। এই সংখ্যাটা বের করা করা কঠিন হবে। তবে বলতে গেলে যারা চাকুরীজিবী তারাই মধ্যবিত্ত। তবে এখানেও প্রশ্ন উঠে আসে কেমন ধরনের চাকরীজিবি।

সেই হিসাবে সরকারি, স্বায়িত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, তারপর বড় বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানি, তারপর দেশীও কোম্পানি, ফ্যাক্টরি বা বিভিন্ন প্রাইভেট ফার্ম। এগুলোতে যারা চাকরী করে তারা ছাড়া চাকরী করলেও নিম্নবিত্ত। মানে মোটা দাগে বলা যায় মধ্যবিত্ত শ্রেনীর সংখা ২০ শতাংশ। এবার শতাভাগের ভেতর থেকে এই সকল বাবু এবং তাদের ফ্যামিলি মানে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের বাদ দিলে তাহলে দাঁড়ায় ৭০%। এই ৭০% মানুষ যারা নিম্ন আয়ের।

এখানে নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে একেবারে দিন মজুর আর বেকারত্বের বোঝা তো আছেই সব মিলে দাড়ালো ৭০%। এবার প্রশ্ন হল এই ৭০% মানুষ যারা হিসেব করে মাস এবং দিন পার করে, যাদের পুজি বলতে কিছু থাকে না মাস শেষে। তারা এই কর্মহীন ৭টা দিন কিভাবে চালাবে? তাদের জন্যে কি সরকার সুনির্দিষ্টভাবে কোন কর্মসূচির ঘোষণা করেছেন? তাদের ডাল-ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করেছেন?

তাদের এই সাত দিন নিশ্চিন্তে চলার মত কোন উদ্যোগ নিয়েছেন? এখন পর্যন্ত আমার জানামতে শুনিনি। ধরে নিলাম সরকার রেশনিক ব্যবস্থায় ৭০% মানুষের দায়িত্ব নেই তবুও কি এটা নিশ্চিত করেছেন যে সেই রেশনগুলো জনগনের হাতে সঠিকভাবে পৌঁছাবে কিভাবে?

সরকার কি এই নিশ্চয়তা দিতে পারবে যে, পৌর মেয়র কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার পর্যন্ত রেশন পৌছাবে? এখন প্রশ্ন আসছে তাহলে এই লকডাউন, স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে জনগনের কথা চিন্তা করে, করোনা মহামারি ঠেকাতে এ ধরনের পদক্ষেপ কি আমাদের দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাছে হাস্যকর নয়?

যেখানে ৭০% মানুষ দিন আনে দিন খায়, যেখানে তাদের ভাত কাপড় জমি কাজ নিয়ে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হয়। সেখানে করোনা মহামারি ঠেকাতে ৭০ ভাগ মানুষের জীবনকে লকডাউনের সময় দায়িত্ব না নিয়ে লকডাউন সফল্যের আহবান সত্যিই হাস্যকর এবং জনগনের সাথে তামাশাও নয় কি?

লকডাউন তখনই গর্বের হত, যদি সরকার এই ৭০% মানুষের নিশ্চয়তা দিতে পারতেন এবং তখন লকডাউন কার্যকরও হত। দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত করা যেখানে ৭০ ভাগ মানুষের প্রতিনিয়ত মহাসংগ্রাম, সেখানে করোনা ঝুকি এড়াতে লকডাউন এবং করোনাভাইরাস এক প্রকার হাস্যকর।

লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মী


মন্তব্য