‘মাটিতে শুয়েই আম্মাকে ফোন দিলাম’— স্বৈরাচার পতনের মুহূর্তের এক আবেগঘন স্মৃতিচারণ

১১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৬ PM , আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৪ PM
লেখক

লেখক © লেখকরে সৌজন্যে

কী উত্তাল সময় এবং নানা ঘটনা। ২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রক্তাক্ত, বেদনাবিধুর ও গৌরবময় এক অধ্যায়। ছাত্র-আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে সরাসরি রাজপথে সক্রিয় ছিলাম।

এই সময়টাতে আমাদের পাশে ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান ভাই এবং তিনি আমাদের নির্দেশনা দিতেন। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার।

আমার শুরুটা হয়েছিল ১০ জুলাই, পল্টন মোড়ে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমি আমার কয়েকজন ছোট ভাই নিয়ে পূর্ব ঘোষিত ব্লকেড কর্মসূচিতে যোগ দিই। দুপুর ১২টায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে আমরা একত্রিত হয়ে পুরো পল্টন মোড় অবরোধ করে ফেলি।

ধীরে ধীরে সবাই বসে পড়ি, কোটার ন্যায্য সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে পল্টনের চার রাস্তার মোড়ে শুরু হয় এক অন্যরকম সৃষ্টিশীল প্রতিবাদ। কারো মুখে দৃপ্ত স্লোগান, কারো কণ্ঠে প্রতিবাদী সুর, আবার কেউ আগুনঝরা কবিতায় জ্বালিয়ে তোলে আশেপাশের আবহ। ঐ সময় আমার হাতে ছিল একটি প্ল্যাকার্ড, তাতে লিখা ছিল; একেতো কোটার বাঁশ, তার উপর প্রশ্ন ফাঁস!

১১ জুলাই
বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের হুঁশিয়ারি ও কঠোর অবস্থান উপেক্ষা করে শতশত শিক্ষার্থী শাহবাগ মোড়ে সমবেত হয়ে অবরোধ গড়ে তোলে।

আমরাও পূর্ব-পরিকল্পিত কৌশল অনুযায়ী ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শাহবাগমুখী হই, যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একত্রিত হওয়া সহজ হয়। আমি আমার কিছু অনুসারী নিয়ে শাহবাগে পৌঁছাই। ইতোমধ্যে মোড়জুড়ে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শাহবাগ মোড়।

আমরা দ্রুত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। পুলিশ আমাদেরকে শাহবাগ মোড় ক্রস করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে আসতে দিতে চাচ্ছিল না। তারা শাহবাগ মোড়ে আমাদের ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেয়। ঐ মুহূর্তে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে বিপুল সংখ্যক ছাত্র জনতা শাহবাগ মোড় পার হয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে অবস্থান নেয়।

আমাদের কয়েকজন দায়িত্বশীল ছাত্রদল নেতা আশেপাশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নজরদারি করছিল। আমি ও ব্যক্তিগতভাবে আশেপাশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং আমাদের অবস্থান সুসংগঠিত রাখার চেষ্টা করি।

শাহবাগের সেই বিকেলটা ছিল আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত যেখানে ভয়কে জয় করে, সংগঠনের দায়িত্ববোধ ও রাজনৈতিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আমরা ছাত্র জনতার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছিলাম।

১৫ জুলাই
দেশের ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত দিন ছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের পরিকল্পিত ও অমানবিক হামলার ঘটনা ঘটে।

শতাধিক শিক্ষার্থী রক্তাক্ত হয়, কেউ রডের আঘাতে, কেউ বাঁশের আঘাতে, কাউকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে গণপিটুনিতে। সেদিন আমি সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল এলাকায় অবস্থান করছিলাম। শহীদুল্লাহ হল, ঢামেক হাসপাতাল ও চারপাশের ক্যাম্পাস এলাকায় ছাত্রদের সাথে সংহতি জানাতে, তাদের পাশে থাকতে আমি এবং আমার সহযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলাম।

ঐদিন অনেক আহত শিক্ষার্থীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম। ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের যৌথভাবে চালানো সেই বর্বর হামলা আমাদের সবাইকে হতবাক করে দেয়। মুখোশধারীদের আগ্রাসনে আমরা বেশিক্ষণ টিকতে পারিনি, তবে যতক্ষণ পেরেছি, প্রতিরোধ করেছি, শিক্ষার্থীদের রক্ষা করেছি, পাশে ছিলাম।

এই হামলার ঘটনায় দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে রক্তাক্ত ছবিগুলো। আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায় সেদিন থেকেই।

ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ হারায়, প্রশাসন বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, আর সাধারণ শিক্ষার্থীরা পায় দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন। আমি সেইদিনের প্রত্যক্ষদর্শী, অংশগ্রহণকারী এবং প্রতিরোধের একজন ক্ষুদ্র সৈনিক ছিলাম। সেদিনের রক্ত, কান্না আর প্রতিজ্ঞা পুরো জুলাই জুড়ে বুকের ভেতর আগুন হয়ে জ্বলেছিল।

১৬ জুলাই
বিকেল ৩টা উত্তপ্ত জুলাইয়ের বিকেল। ঢাকা কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে গিয়ে অবস্থান নিই। আমাদের সাথে যুক্ত হয় আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বহু ছাত্র।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকি অর্থাৎ সামনের সারিতে অবস্থান নিই, যাতে করে অপজিট থেকে আসা গুলি, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট আগে আমরা মোকাবেলা করতে পারি। স্বৈরাচারী হাসিনাবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে থাকায় আমরা মোটামুটি এগুলো তে অভ্যস্ত ছিলাম এই জন্যেই আমাদের সামনে সারিতে থাকা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নিউমার্কেটের দিক থেকে এগিয়ে আসে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ, নিউমার্কেটে থানা ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। শুরুতেই তারা তাদের অবৈধ অস্ত্র দিয়ে গুলি ছুড়তে থাকে। শুরু হয়ে যায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় ও এর আশপাশ এলাকা তখন রণক্ষেত্র। আমরা আমাদের হাতে থাকা ইটের টুকরো তাদের দিকে নিক্ষেপ করতে থাকি। ঐদিন ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের অনেক সহযোদ্ধা আহত হয়, তবু আমরা পিছু হটিনি।

হঠাৎ নিউমার্কেটের দিক থেকে পুলিশের ছোড়া টিয়ারশেলের কারণে আমার তখন নিঃশ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হওয়া শুরু হয়। আমি আমার হাতে থাকা গ্যাস লাইটার দিয়ে নাকের কাছে আগুনের তাপ নিতে শুরু করি। কিন্তু কিছুতেই নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হচ্ছিল না।

টিকতে না পেরে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় পুলিশ বক্স থেকে চেয়ারসহ পুরনো কিছু আসবাবপত্র বের করে তাতে আগুন লাগিয়ে দিই। আগুনের তাপে টিয়ারগ্যাসের উত্তাপ কিছুটা কমে। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকলো।

অপরদিকে আমাদের আহতদের সংখ্যাও এক এক করে বাড়তে থাকল। সন্ধ্যার আগেই বহু সাধারণ শিক্ষার্থী এবং আমাদের অনেক সহযোদ্ধা রক্তাক্ত হলো। তখনকার আহত নিরপরাধ ছেলেগুলোর করুণ অবস্থা ভাষায় প্রকাশ করার মতো ছিল না। সে এক হৃদয়বিদারক অবস্থা। একটা মুহূর্তে মনে হয়েছিল, এই রাষ্ট্র যেন আমাদের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সন্ধ্যা ৭টার দিকে, প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে আমি সায়েন্স ল্যাব মোড় ত্যাগ করি।

১৮ জুলাই
বাংলাদেশের ইতিহাসের এক সাহসী দিন, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির দিন। কমপ্লিট শাটডাউনের দিনে আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, আর আমি ছিলাম সেই ঢেউয়ের সরাসরি অংশীদার।

ঐ দিন সকাল ৯টায় কাকরাইল মোড় থেকে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের নেতৃত্বে দিনের প্রথম এবং বিশাল মিছিল শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা সকাল ৯ টার আগেই কাকরাইল মোড়ে এসে মিছিলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। ঠিক নয়টায় আমাদের মিছিল শুরু হয়। স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠে কাকরাইল এলাকা। মিছিলে স্পষ্ট প্রতিফলন হচ্ছিল আমাদের ক্ষোভ, আশা আর দৃঢ়তা। মিছিল শেষ করে আমি চলে যাই পুরানা পল্টনে।

কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দুপুর ১২ টায় আবার আরও একটি মিছিলের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই মিছিল শুরু হয় ফকিরাপুল মোড় থেকে, যেখানে আমরা নতুন করে সংগঠিত হই। আমিও সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় দ্বিতীয় দফার এই মিছিলে অংশগ্রহণ করি।

কিন্তু পরিস্থিতি হঠাৎই রূপ নেয় ভয়ঙ্কর এক রূপে। মিছিল শুরু হতেই পুলিশের গুলির শব্দ ভেসে আসে সামনের দিক থেকে। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে আমরা প্রাণ বাঁচাতে ছুটে যাই। যার যার মতো করে ছুটে গিয়ে আমি আশ্রয় নিই ফকিরাপুল বাজার এলাকার একটি ভবনে।

দুপুরের পর পরিস্থিতি খানিকটা স্থিত হলে, ভবন থেকে বের হয়ে আমি সরাসরি চলে যাই শান্তিনগর মোড়ে, সেখানে তখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজপথ অবরোধ করে বসেছিল। এর মধ্যেই আমরা আবার বিপুল সংখ্যক ছাত্রদল নেতা-কর্মী সংগঠিত হয়ে যাই।

আমি এবং আমার সহযোদ্ধারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে মিশে গিয়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে শুরু করি। আমরা জানতাম ছাত্রদল তখন শুধু একটি সংগঠন নয়, বরং ছাত্রসমাজের একটি আস্থার জায়গায় ছিল এবং ছিল একটি প্রতিরোধের নাম।

শান্তিনগর মোড়ে দাঁড়িয়ে আমি একদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলি। আমি তাদের আশ্বস্ত করি যে, আমরা অগ্রভাগে থাকবো। তোমরা মাঝখানে থাকবা। গুলি, টিয়ারশেল যাই আসুক আগে আমরা তা ফেস করব তারপরে তোমাদের দিকে আসবে। ছাত্ররা আমাদের উপর আস্থা রাখে। তাদেরকে আমরা মাঝখানে রেখে আমরা মোড়ের চারদিকে দাঁড়িয়ে যাই।

সারাদিনই রমনা থানার পুলিশ কিছু সময় পর পর থানার সামনে থেকে কাকরাইল মোড় তথা শান্তিনগরের দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছিল। সন্ধ্যার পর ঢাকা মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন ভাইয়ের এর নেতৃত্বে আমরা একটা পরিকল্পনা করি। আর তা হলো থানায় হামলা করার।

পরিকল্পনা অনুযায়ী রমনা থানা আক্রমণের জন্য নয়ন ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা এগিয়ে যাই। কাকরাইল মোড় থেকে রমনা থানার দিকে ঢুকেই নয়ন ভাই তার হাতে থাকা পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারেন থানার টিনের উপর, দাউ দাউ করে আগুন জ্বলা শুরু হয়।

সাথে সাথেই আমরাও আমাদের হাতে থাকা ইটের টুকরো থানার দিকে ছুড়ে মারতে থাকি। মিনিট দুয়েকের মতো ইট মারতে পারি থানার দেওয়ালে, তারপর থানা থেকে একদল পুলিশ পুনরায় বের হয়ে আমাদের প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ শুরু করে। আমরা আবার চলে আসি শান্তিনগর মোড়ে। এরপর আর আমরা বেশিক্ষণ টিকতে না পেরে যে যার মতো করে স্থান ত্যাগ করি।

১৯ জুলাই
কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিক্ষার্থী হত্যার প্রতিবাদে প্রেসক্লাবে বিএনপি সমাবেশের ডাক দেয়। এই সমাবেশে অংশগ্রহণের জন্য জুমার আগেই আমি পল্টনে চলে আসি।

হাইকোর্টের সামনে দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীসহ আমরা প্রেসক্লাবের দিকে আসতেই পুলিশের অতর্কিত গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ। হামলায় টিকতে না পেরে সেগুনবাগিচা হয়ে আমি পুরানা পল্টনের আজাদ প্রোডাক্টসের গলিতে চলে আসি। এই গলির মুখে তখন শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একটি সমাবেশ চলছিল।

বিএনপিকে প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় দাঁড়াতে না দিয়ে ইসলামী আন্দোলনকে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশ করতে দেওয়ায় মনে বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন জাগতে থাকে। হঠাৎ মনে আসলো ইসলামী আন্দোলনের সমাবেশ বানচাল করে দিতে পারলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে তারাও হয়তো আমাদের সাথে যোগ দেবে।

যেই চিন্তা সেই কাজ, সুযোগ খুঁজতে থাকলাম কিভাবে তাদের সমাবেশটা বানচাল করা যায়। গলির ভেতরে লাগানো আওয়ামী লীগের অনেকগুলো ব্যানার বিভিন্ন পিলারের থেকে ছিঁড়ে নিয়ে গলির মুখে তাদের সমাবেশের পাশে আগুন লাগিয়ে দিই।

আগুন দেখে তাদের নেতাকর্মীরা আগুন নেভাতে আসলো কিন্তু সমাবেশ চলতেই থাকলো, তাদের কোনো কর্ণপাত হলো না। তারা সমাবেশ করেই যাচ্ছে এবং একের পর এক তাদের নেতারা বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে হোটেল ফারসের সামনে থেকে পুলিশ ঠিক অপোজিট গলি দিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের উপর একের পর এক গুলি, টিয়ারশেল মেরে যাচ্ছে।

এমন সময় আল্লাহর কি রহমত, সাদা পোশাকধারী পুলিশের দুজন সদস্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য গলির ভেতর আসতেই আমিসহ আমার সাথে থাকা নেতাকর্মীরা তারা যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক তা বুঝতে পারি। তাদেরকে ঘিরে ধরে হাজি কাচ্চি বিরিয়ানি নামক দোকানের ভেতর ঢুকিয়ে বাহির থেকে শাটার লাগিয়ে দিই।

ভিতরে থাকা ২ পুলিশ সদস্য তাদের সাথে থাকা ওয়াকিটকি দিয়ে যোগাযোগ করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তা দিয়ে পুলিশের একটি বিশাল দল পল্টন মোড় হয়ে ঐ দুই পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করার জন্য সমাবেশের দিকে আসতে থাকে। দুই পুলিশ সদস্যের নিরাপত্তার জন্যই পুলিশ সদস্যরা সমাবেশ উদ্দেশ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে থাকে, মুহূর্তে সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়। আমরা গলির আরও ভিতরে চলে আসি। তারা পুলিশের ঐ দুই সদস্যকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

আশ্চর্যজনকভাবে ইসলামী আন্দোলনের সমাবেশ পণ্ড হলেও তারা আমাদের সাথে আন্দোলনে যোগ না দিয়ে পাশেই থাকা তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। আমরা তখন বিভিন্ন গলিতে ঢুকে পড়ি। পুলিশ একাধারে বিভিন্ন গলির মুখ থেকে আমাদের দিকে গুলি বর্ষণ করতে থাকে। তখন চলে যাই পুরানো পল্টন কালভার্ট রোডে। কালভার্ট রোডে থাকা অবস্থায়ও আমাদের সাথে বিজয়নগর পানির ট্যাংকের দিকে থাকা পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে।

এর মধ্যেই হঠাৎ পুলিশ আমাদের ধাওয়া দিলে আমরা পল্টন টাওয়ারের দিকে দৌড় দিই। একটু দৌড় দিতেই চোখের সামনে লুটিয়ে পড়লেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদল নেতা নবীন তালুকদার ভাই। তাকিয়ে দেখি তার মাথার পিছন থেকে রক্ত স্রোতের মতো বের হচ্ছে। নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারলাম না, মাটির মধ্যে বসে পড়লাম।

একটু পরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন ভাই, আমিসহ কয়েকজন হাতে ধরাধরি করে লাশ নিয়ে পল্টন টাওয়ারের পাশের গলির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুদূর গিয়ে আমি আর পা বাড়ানোর মতো শক্তি পেলাম না, মাটিতে বসে পড়লাম আবারও। আর মনের অজান্তেই কাঁদতে শুরু করলাম।

এখানে আর বেশিক্ষণ টিকতে না পেরে আমরা চলে গেলাম নয়াপল্টন আমাদের পার্টি অফিসের দিকে। আমরা একদল গিয়ে পার্টি অফিসের তালা ভাঙলাম। তালা ভেঙে পার্টি অফিসের সামনের রোডে অবস্থান নিলাম।

পল্টন থানা পুলিশ থানা থেকে বের হয়ে আমাদের গুলি ছুড়লে আমরা আবার বিভিন্ন গলিতে অবস্থান নিই। এভাবেই পল্টন থানা পুলিশের সাথে আমাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকলো। কখনো আমরা ধাওয়া দিয়ে পুলিশকে পল্টন থানায় ঢুকিয়ে দিচ্ছি, আবার কখনো পুলিশ আমাদের ধাওয়া দিয়ে পার্টি অফিসের অপোজিট গলি, মসজিদ গলি সহ আশপাশের গলিতে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এভাবেই চলতে থাকলো।

সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে আমরা তখন নয়াপল্টন মসজিদ গলিতে। আমরা তখন ক্লান্ত, পুলিশও অনেকটা ক্লান্ত। হঠাৎ দেখি কাকরাইল মোড় থেকে তিন-চারটে রিকশাযোগে পুলিশের কয়েকজন সদস্য পল্টন থানার দিকে আসছে। নয়ন ভাই প্ল্যান দিল পুলিশের উপর হামলা করার, যে ভাবনা সেই কাজ।

মসজিদ গলির ঠিক সামনে দিয়ে থানার দিকে পুলিশ সদস্যরা যেতেই গলির ভেতর থেকে আমাদের হাতে যার যা ছিল তাই দিয়ে পুলিশের উপর হামলা করি। কিন্তু মোটেই বুঝতে পারিনি পল্টন থানা থেকে পুলিশের আরেকটা দল আমাদের টার্গেট করে রেখেছে। টার্গেট অনুযায়ী নয়ন ভাইসহ আমরা একদল এগিয়ে যাই গলির সামনে।

নয়ন ভাই হাতে থাকা ইট ছুড়ে মারল। সাথে সাথে আমিও আমাদের হাতে থাকা ইট পুলিশের দিকে ছুড়ে মারলাম। তাৎক্ষণিক থানার দিক থেকে টার্গেটে থাকা পুলিশও আমাদের লক্ষ্য করে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে শুট করা শুরু করল। আল্লাহর অশেষ রহমতে কানের পাশ দিয়ে চাইনিজ রাইফেলের বুলেট চলে যায়। বুলেটের বাতাস তখন আমার কানে লাগছিল।

এই দৃশ্য কতটা ভয়াবহ ছিল তা আমি লিখে হয়তো বোঝাতে পারব না, অল্প একটু জন্য প্রাণে রক্ষা পাই। এই দৃশ্য মনে পড়লে আজও আমার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। এরপর নয়ন ভাইসহ আমরা গলির ভেতরে চলে আসি।

গলির ভিতরে আসতেই নয়ন ভাই আবার বলল কয়েকটা পেট্রোল বোমা বানাতে। রনি নামে নয়ন ভাইয়ের এক ছোট ভাইসহ আমি গলির ভেতর কাঁচের বোতল খুঁজতে থাকি। একটা মুদি দোকানের সামনে থেকে পড়ে থাকা সেভেন আপের প্রায় সাত-আটটা কাচের বোতল সংগ্রহ করি।

এরপর আমাদের সাথে থাকা ইমন ভাইয়ের গাড়ি থেকে তেল সংগ্রহ করে আমার পাঞ্জাবির নিচে থাকা স্যান্ডো গেঞ্জি খুলে এবং রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া কিছু গস কাপড় দিয়ে কয়েকটা পেট্রোল বোমা বানিয়ে ফেলি। নয়ন ভাই হাতে নেয় দুইটা, আমার হাতে দুইটা আর রনি ভাইয়ের হাতে থাকে দুইটা।

সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে পল্টন থানা আক্রমণের জন্য নয়ন ভাইয়ের নেতৃত্বে আবার গলি থেকে বেরিয়ে থানার উদ্দেশ্যে দৌড়াতে থাকি। নয়ন ভাই একটা পেট্রোল বোমা ধরিয়ে পলওয়েল মার্কেটের কোনা দিয়ে থানার ভেতর ছুড়ে মারেন। আমরাও আমাদের হাতে থাকা বোমাগুলো মারা শুরু করার আগেই পল্টন থানা পুলিশ থানার গেট থেকে আমাদের উদ্দেশ্যে আবারও গুলি করতে থাকে।

আমরা আবার পার্টি অফিসের দিকে চলে আসি। আবার কিছুক্ষণ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয় পুলিশের সাথে। আটটার দিকে আমরা স্থান ত্যাগ করে চলে যাই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে।

নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সময় হঠাৎ করে দেখি আমার কানে রক্ত। হাত দিয়ে দেখি কানের মধ্যে একটা স্প্লিন্টার/বুলেট এখনো বিদ্ধ অবস্থায় আছে। কাঁটাবন এসে আমার পরিচিত হোমকেয়ার হসপিটালের ইমারজেন্সিতে গিয়ে বাম কানের পাতার মধ্যে থাকা বুলেটটি বের করে ফেলি।

তখন খেয়াল হলো আমার বাম হাতে, নাভির পাশে, পায়ের রানে মোট তিনটে ছররা বুলেটের গুলি আঘাত করেছে। কোনো রকম ড্রেসিং করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাই। ১৯ জুলাই রাত থেকে শুরু হয় কারফিউ। গুলিবিদ্ধ হয়ে অসুস্থতার কারণে ২০ শে জুলাই থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত আত্মগোপনে ছিলাম।

৩০ জুলাই
তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার একতরফাভাবে দিনটিকে ‘রাষ্ট্রীয় শোক দিবস’ ঘোষণা করে। কিন্তু দেশের গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতা এই শোক দিবস প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ জানায়।

এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ জুলাই লাল কাপড় চোখ ও মুখে বেঁধে প্রতীকী প্রতিবাদের ছবি তোলা এবং তা অনলাইনে ব্যাপকভাবে প্রচারের কর্মসূচি নেওয়া হয়। আমিও আমার অবস্থান থেকে এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করি।

ঐদিন একটা লাল টি-শার্ট পরে মুখে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলেছিলাম এবং তা আমার ব্যবহার করা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করি। ঐদিন ফেসবুকে দেখলাম ওয়াল জুড়ে শুধু লাল আর লালের বন্যা বইছিল।

৩ আগস্ট
এটা ছিল একটি ঐতিহাসিক দিন, একটি মোড় বদলের ক্ষণ। সেদিন দুপুর তিনটার দিকে আমি ও আমার সঙ্গে থাকা ছাত্রদলের কয়েকজন ছোট ভাই শহীদ মিনারের দিকে রওনা দিই। আমাদের হৃদয়ে তখন শুধুই একটাই প্রত্যয়—এই দুঃশাসনের অবসান চাই।

শহীদ মিনারের মূল ফটকের সামনের রাস্তায় এসে অবস্থান নিই আমরা। আমি একটি রিকশার উপর দাঁড়িয়ে গর্জে উঠি স্লোগানে। চারপাশের জনস্রোত সাড়া দেয় তাতে। চারপাশে শুধু মানুষের ঢল, লক্ষাধিক মানুষ একত্রিত হয়েছে; চারদিকে পতাকার ছায়া, প্রতিবাদের ভাষা আর মুক্তির আকুতি।

হঠাৎ এক আবেগঘন মুহূর্তে, পূর্বঘোষিত নয় দফার পরিবর্তে আওয়াজ ওঠে একটাই দাবি "এক দফা"। চারদিক থেকে প্রতিধ্বনিত হয় সেই ডাক—এক দফা, এই সরকারের পদত্যাগ। শহীদ মিনার যেন হয়ে ওঠে এক বিপ্লবের জন্মভূমি।

সেখান থেকেই পরদিন ৪ আগস্ট থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। আমরা মিছিল সহকারে শহীদ মিনার ছাড়ি, এগিয়ে যাই শাহবাগ মোড়ে। শাহবাগ মোড়ে গিয়ে আমি একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে যাই- হাতে লিখা ছিল ❝দিনে নাটক রাতে আটক❞। শাহবাগে রাত আটটা পর্যন্ত আমি অবস্থান করি।

৪ আগস্ট
সকাল ১১টার আগেই আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী শাহবাগ মোড়ে পৌঁছে যাই। লক্ষ্য ছিল অসহযোগ আন্দোলনকে সফল করা। কিন্তু ধারণা ছিল না, দিনটা এতটা রক্তাক্ত ও বিভীষিকাময় হতে যাচ্ছে।

পিজি হাসপাতালের ভেতরে আগে থেকেই অবস্থান নিয়েছিল স্বৈরাচার সরকারের দোসর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। হঠাৎ করেই ভেতর থেকে শুরু হয় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, আর আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য হাসপাতালের ভেতরে রাখা কয়েকটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় ছাত্রলীগ। তার সঙ্গে শুরু হয় গুলির শব্দ, সে এক ভয়াবহ দৃশ্য!

প্রথমে আমরা কিছুটা হতবাক হয়ে গেলেও, মুহূর্তেই ঘুরে দাঁড়াই। রূপালী ব্যাংকের পাশের গেট দিয়ে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে ধাওয়া দিই আমরা। আতঙ্কে তারা পেছনের গেট দিয়ে পালিয়ে যায়, শাহবাগ মোড় পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

দুপুর ১২টার দিকে আমরা একটি দল নিয়ে শেরাটন মোড়ে অগ্রসর হই। তখন বাংলামোটর মোড়ে অবস্থান নেওয়া ছাত্রলীগ, পুলিশ ও র‍্যাবের সমন্বয়ে গঠিত সরকারের 'বিশেষ বাহিনী' শেরাটন মোড়ের দিকে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। আমাদের অনেক ভাই আহত হয়। আমরাও হাল ছাড়ি না, ইট-পাটকেল নিয়ে প্রতিরোধ চালিয়ে যাই।

শাহবাগ মোড়ে খবর পাঠাই, সঙ্গে সঙ্গেই বড় একটি মিছিল শাহবাগ মোড় থেকে আমাদের সহযোদ্ধারা নিয়ে আসে। একত্র হয়ে বাংলামোটরের দিকে ধাওয়া দিই এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বাংলামোটর আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এরপরে সেই বাহিনী পিছিয়ে চলে যায় কারওয়ান বাজার মোড়ে।

দুপুর সাড়ে তিনটা পর্যন্ত আমাদের সাথে ওদের সংঘর্ষ চলে। তারপর আমরা বাংলামোটর থেকে কারওয়ান বাজার মোড়ে ধাওয়া দিই। অবশেষে সেটাও দখলে চলে আসে আমাদের। ওরা ফের পিছু হটে, এবার ফার্মগেট মোড়ের দিকে অবস্থান নেয়।

আমরা কারওয়ান বাজার মোড়ে কিছুক্ষণ অবস্থান নিয়ে বিকেল চারটার দিকে ফার্মগেট মোড়ের দিকে অগ্রসর হই, আর ঠিক তখনই ঘটে সেই দিনের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি।

কারওয়ান বাজার মোড় থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশের উঁচু বিল্ডিংগুলোতে ওরা আগে থেকেই পজিশন নিয়ে ছিল, যা আমরা কিছুতেই বুঝতে পারিনি। এমনকি মেট্রোরেল লাইনের ওপরেও ওরা অবস্থান নিয়ে নেয়। আমরা ফার্মগেটের দিকে এগোতেই শুরু হয় পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং।

উঁচু ভবন থেকে আমাদের ওপর টার্গেট করে গুলি চালাতে থাকে। গুলিগুলো এসে কারো গলার মধ্যে, কারো পেটের নাভির বরাবর, কারো ঠিক মাথার খুলির মধ্যে পড়তে শুরু করল। গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানগুলো দেখে নিশ্চিত হই টার্গেট কিলিং চলছে।

চোখের সামনে একের পর এক সহযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়তে থাকে। বিভীষিকাময় সেই মুহূর্তে অনেকেই প্রাণ হারান। সেই বিভীষিকাময় সময়টার কথা মনে পড়লে আজও শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। আমরা বেশিক্ষণ টিকতে পারি নাই। আমি মারাত্মক গুলিবিদ্ধ এক সহযোদ্ধাকে নিয়ে দ্রুত শাহবাগ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিকে ছুটে যাই।

কিন্তু সেখানেও প্রবেশ করতে পারিনি, মেডিকেলের ইমারজেন্সির ভেতর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের ধাওয়া করে। কোনোভাবে বহির্বিভাগের সামনে গুলিবিদ্ধ ভাইটিকে রেখে আমি টিএসসির মোড়ে পৌঁছি। বুক ফেটে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল, একজন সহযোদ্ধাকে চিকিৎসা দিতে পারলাম না, এই যন্ত্রণাই আমাকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়াবে।

তারপর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর দিয়ে মৎস্য ভবন মোড় হয়ে পল্টনের এক নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছি। কিন্তু রাত্রি ৯:৩০ টার দিকে পুরোনো পল্টনের বিভিন্ন ভবনে তল্লাশির খবর পেয়ে সেই অফিস থেকেও বের হয়ে যাই।

কই যাব কি করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। পল্টনের এক গলির ভিতরে দীর্ঘক্ষণ বসে ছিলাম। হঠাৎ আম্মার কথা মনে পড়ল, তাই আর কিছু না ভেবেই সাহস নিয়ে ঐ দিন নিজের বাসায় মায়ের কাছে ফিরে যাই।

৫ আগস্ট
লড়াইয়ের এক ঐতিহাসিক সকাল, সারারাত মিলিয়ে বড়জোর দু’ঘণ্টার মতো ঘুম হয়েছে। সকালে ঘুম ভাঙে ঠিক ৮টার দিকে। চোখ খুলেই দেখি আম্মা আমার রুমে বসে আছেন। আমি তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হচ্ছি দেখে বুঝে ফেললেন আজও আমি আন্দোলনের উদ্দেশ্যেই বের হয়ে যাচ্ছি। কিছু না বলেই শুধু বললেন, পরিস্থিতিটা বুঝে রওনা দিস। আমি চুপচাপ বের হয়ে পড়ি, গন্তব্য ছিল শহীদ মিনার।

রাস্তা তখন প্রায় জনশূন্য। হেঁটে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি একটা লেগুনা গুলিস্তান যাবে, পুরো গাড়ি খালি তবুও সিটে বসতে ইচ্ছা করল না। লেগুনার পেছনে দাঁড়িয়ে রাস্তার পরিস্থিতি দেখতে দেখতে গুলিস্তানের দিকে রওনা দিলাম। গুলিস্তান শহীদ আহাদ পুলিশ বক্সের সামনে নামিয়ে দিল। রাস্তায় মানুষ নেই বললেই চলে। পুলিশ যারাই পাচ্ছে, জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তরুণ কাউকে দেখলেই তুলে নিচ্ছে পুলিশ ভ্যানে।

গুলিস্তান হল মার্কেটের সামনে দিয়ে মাজার অতিক্রম করে নগর ভবনের দিকে হাঁটতে হাঁটতেই দেখি এক রিকশাওয়ালা মামা দ্রুত নগর ভবনের দিক থেকে আসছেন। তার রিকশায় রক্তের দাগ। জিজ্ঞেস করলাম—কি হয়েছে? মামা বললেন, মামা, শহীদ মিনারের দিকে পুলিশ নির্বিচারে গুলি করছে ওইদিকে যাইয়েন না।

তখনই মোড় ঘুরে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের সামনে চলে আসি। দেখি, জিরো পয়েন্ট মোড় দিয়ে পুলিশের ৮-১০টি গাড়ির বহর বঙ্গভবনের দিকে যাচ্ছে। ওরা চলে যাওয়ার পর আমি পায়ে হেঁটে পল্টন মোড়ে আসি। পরিচিত একটা অফিসে একটু আশ্রয় নিই।

কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সেলিম ভাই এসে হাজির হন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আমরা দু’জন একসাথে পুরানা পল্টন থেকে রমনা পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে শাহবাগের দিকে রওনা দিই।

শিশু পার্কের গেট থেকেই খেয়াল করলাম শাহবাগ মোড় থেকে পুলিশ কিছু ছাত্রকে ধরে পুলিশ ভ্যানে তুলছে। তখন আমরা গেটের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকি। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে শাহবাগ মোড়ে পুলিশ যাকেই পাচ্ছে তাকে গাড়িতে তুলছে। আমরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে বিষয়টা দেখছি।

অল্প সময়ের মধ্যে আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি ওইখানে কিছু সমমনা লোক চলে আসলো। সবাইকে নিয়ে সাহস করে শাহবাগের দিকে রওনা দিলাম। পরিস্থিতি কেমন জানি গুমোট হয়ে ওঠে। আমাদের দেখে শাহবাগ মোড়ে আরও কিছু লোক জড়ো হলো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাবাহিনী শাহবাগ ঘিরে ফেলল। পুরো এলাকা তখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। আমাদের কিছু লোক শাহবাগ থানার দিকে যেতে চাইলে সেনাবাহিনী কঠোরভাবে বাধা দিল। ঠিক তখনই সেই বার্তা—খুনি হাসিনা পদত্যাগ করেছে।

আমি সেনাবাহিনীর রাখা একটা ট্যাংকের পাশে বসে পড়লাম। গতকালকের কারওয়ান বাজার মোড়ে চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ হওয়া মুখগুলোর কথা মনে পড়ল। মেডিকেলের রাস্তায় রেখে চলে আসা গুলিবিদ্ধ ভাইটার কথা মনে পড়তেই চোখে কান্না চলে আসলো।

কেন যেন কিছুতেই কান্না থামিয়ে রাখতে পারলাম না। মাটিতে শুয়েই আম্মাকে ফোন দিলাম। কথা বলে মনটা কিছুটা হালকা হলো। আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে হাসিনার মতো নিষ্ঠুরতম জালিমের হাত থেকে আমরা মুক্ত হলাম। এই লড়াই, এই ত্যাগ, এই রক্ত, সবই সার্থক।

এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের চরম সত্য হয়ে থাকবে। এটা কেবল একটি প্রতিবাদ ছিল না, এটা ছিল একটি স্বপ্নের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়ার ইতিহাস। কারণ ইতিহাস বলে যেখানে ছাত্র-জনতা এক হয়, সেখানেই জন্ম নেয় নতুন সূর্য।

মো. জিয়াউর রহমান খন্দকার
যুগ্ম-আহ্বায়ক, ঢাকা কলেজ ছাত্রদল।

ডিএমপির শিক্ষাবৃত্তি পেল ৪৩৭ কৃতি শিক্ষার্থী
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঝালকাঠিতে গাঁজা-ইয়াবাসহ যুবদল নেতার ছেলেসহ আটক ৩
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর লালবাগের বাসায় একা থাকা আইনজীবীর মরদেহ উদ্ধার
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে ৪০ 'মিটার রিডার-কাম-ম্যাসেঞ্জার' নিয়ো…
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুল ভর্তিতে নতুন নিয়ম, তিন বিষয়ে দিতে হবে ১০০ নম্বরের পরী…
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গাজীপুরে তানযীমুল উম্মাহ হিফয মাদ্রায় কৃতী শিক্ষার্থীদের সং…
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9