স্বল্প বেতনে খুঁড়িয়ে চলছে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষকদের জীবন

১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৩ PM , আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪১ PM
শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নিচ্ছেন কওমি শিক্ষক

শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নিচ্ছেন কওমি শিক্ষক © টিডিসি ছবি

দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণে নেই কোনো নীতিমালা। ফলে প্রতিষ্ঠানভেদে মাসে ৭ থেকে ১৫ হাজার টাকায় শিক্ষকতা করছেন তারা। পরিচিতি আছে এমন হাতেগোনা কয়েকটি মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষকরা ১৭ থেকে ৩৫ হাজার টাকা বেতন পান। আর মুহতামিমদের (প্রধান শিক্ষক) বেতনের পরিমাণটি প্রকাশ্যেই আনেন না তারা। স্বল্প বেতনে জীবনসংসার চালাতে কেউ কেউ করছেন মসজিদের ইমামতি, খতিব ও টিউশনি। ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েও নিত্যপণ্যের এই ঊর্ধ্বগতিতে পরিবারের ব্যয়ভার সামলাতে আর্থিক সংকটে দিন কাটছে কওমির সাধারণ শিক্ষকদের। ধর্মীয় শিক্ষার খেদমতকে প্রাধান্য দিয়ে বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করলেও নিদারূণ কষ্টে জীবনযাপন করছেন তারা। 

তবে তাদের সরকারি সুবিধার আওতায় আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন উদ্যোগের চেষ্টা হলেও তা বাস্তবায়নে আগ্রহ নেই কওমি আকাবিরদের (মুরুব্বি)। কারণ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই দানের টাকায় পরিচালিত হয়ে থাকে। সরকারের আওতায় আসলে আর্থিক অডিটের ভয়ে যুক্ত হতে চান না বলে জানান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের তৎকালীন কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তবে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বলছে, আর্থিক অডিট নয়, সরকারের আওতায় গেলে কওমি শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হতে পারে এবং এর স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হতে পারে, তাই তারা যুক্ত হতে চান না। 

৭ হাজার টাকা বেতনে কর্মজীবন শুরু করেন রাজধানীর কাজলার জামেয়া রাহমানিয়া দারুল উলুম কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আব্দুল হালিম। মাদ্রাসার মুহতামিম ওযায়ের আমীন শুধু ‘লিল্লাহির’ কথা বলে তাকে সাত মাস ধরে অপেক্ষা করান। পরে ক্ষোভে-কষ্টে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি এবং বিদেশে চলে যান। —ভুক্তভোগীর ছোট ভাই আব্দুল করিম 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর কাজলার জামেয়া রাহমানিয়া দারুল উলুম কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আব্দুল হালিম ৭ হাজার টাকা বেতনে ২০২৪ সালে আবাসিক শিক্ষক হিসেবে চাকরি শুরু করেন। তবে সাত মাসের বেতন না পেয়ে হতাশায় চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। পরে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে প্রবাস জীবন শুরু করেন। তার আপন ছোট ভাই আব্দুল করিম। তিনিও কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরা হাদিস পাস করেছেন। তার সঙ্গে কথা হয় দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইকে সাত মাস ধরে বেতন দেওয়া হয়নি। মাদ্রাসার মুহতামিম ওযায়ের আমীন শুধু ‘লিল্লাহির’ কথা বলে সাত মাস ধরে অপেক্ষা করান। পরে ক্ষোভে-কষ্টে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। শুধু আমার ভাই নয়, দেশের হাতেগোনা কয়েকটা ভালো মাদ্রাসা ছাড়া বেশির ভাগ মাদ্রাসায় শিক্ষকদের বেতন ঠিকমতো দেওয়া হয় না। ভালো মাদ্রাসাগুলোতেও একমাসের বেতন আরেকমাসে দেওয়া হয়। 

তিনি বলেন, দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর মুহতামিমদের (প্রধান শিক্ষক) বেতনের বিষয়টি গোপন রাখা হয়ে থাকে। তারা মাসের শুরুতে বেতন নিলেও অন্যদের বেলায় ভিন্ন আচরণ করে থাকেন। ফলে ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে আকাবিরদের (মুরুব্বি) কষ্ট দেওয়া যাবে না বলে সাধারণত কোনো প্রতিবাদ করেন না তারা। মুহতামিমরা ঠিকই স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করলেও শিক্ষকদের ‘লিল্লাহি’ বলে সান্ত্বনা দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন, পারিবারিক জীবন নির্বাহ করতে হয়। পরিচিতি আছে এমন কওমি মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষকরা ১৫ হাজার টাকা বেতন পেয়ে থাকেন। এসব প্রতিষ্ঠানের হাতেগোনা কয়েজন সিনিয়র শিক্ষক হয়তো ১৭ থেকে ৩৫ হাজারের মধ্যে বেতন পেয়ে থাকেন। আর গ্রাম-জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে স্বাভাবিকভাবে ৭ হাজার টাকা থেকে বেতন দেওয়া শুরু হয়ে থাকে। সেখানেও মুহতামিমরা ভালো মানের জীবনযাপন করেন। বলতে পারেন তারা স্বচ্ছল হয়ে ওঠেন।  

‘আমি ৫ মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না। অথচ মাদ্রাসার প্রধান (মুহতামিম) মাইক্রোবাসে করে নিয়মিত মাদ্রাসায় আসেন। হুজুরের কাছে বেতন চাইতে গেলে আমাকে দুনিয়াবি চিন্তার বিষয়টি বাদ দিতে বলেন। তখন মাদ্রাসার মাঠে রাখা গাড়িটির দিকে তাকাই, তিনি এ বিষয়টি দেখতে পেয়ে আবারও বলেন ওটা (গাড়ি) দুয়িয়ার বিষয়, নজর দেওয়া যাবে না। — মাওলানা রাকিবুল ইসলাম 

ময়মনসিংহ জেলার সদর উপজেলার দাওয়াতুল হক কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক হাফিজুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের মুহতামিমের (প্রধান) বেতন ২৫ হাজার। বাকিদের কারও কারও বেতন ১০ থেকে ১৮ হাজার টাকা। বেতন নীতিমালা নিয়ে আমাদের আকাবিরদের গুরুত্ব কম, তবে তারা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নতির দিকে সর্বদা মনযোগ দিয়ে থাকেন। আমাদের প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষকই আবাসিক। তবে আমাদের কওমি অঙ্গনের ৯৫ শতাংশ সাধারণ শিক্ষক ঠিকঠাক বেতন পান না। ফলে তাদের শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য পেশায় যুক্ত হতে হয়। যেমন, কোনো শিক্ষক একটি মসজিদে ইমামতি, অন্য মসজিদে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিন জায়গা থেকে তিনি সবমিলিয়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। কিন্তু শুধু মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে এ টাকা আয় করা সম্ভব না। আবার কোনো শিক্ষক বাসা-বাড়িতে গিয়ে কোরআন শরীফ পড়াচ্ছেন। তবে সব শিক্ষক যে শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য পেশায় যুক্ত হতে পারছেন না তা ঠিক নয়। বেশির ভাগ শিক্ষকই অন্য পেশায় যুক্ত হতে পারেন না। কারণ শিক্ষকের তুলনায় কর্মসংস্থান কম বলে জানান তিনি। 

এর বাইরেও একটি ভিন্ন চিত্র রয়েছে, দেশের বেশির ভাগ কওমি শিক্ষক ভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত হতে না পেরে, স্বল্প বেতনেই নিদারূণ কষ্টে জীবনযাপন করছেন। তাদের মধ্যে অনেকে স্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছ থেকে মাঝে মাঝে আর্থিক উপঢৌকন পেয়ে থাকেন। একরকম অভিভাবকদের তৈলমর্দন করে আকার-ইঙ্গিতে চেয়ে-চিন্তে উপহার নিচ্ছেন তারা।

রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় এক কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা রাকিবুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি ৫ মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না। অথচ মাদ্রাসার প্রধান (মুহতামিম) মাইক্রোবাসে করে নিয়মিত মাদ্রাসায় আসেন। একদিন প্রধান শিক্ষক গাড়িতে করে অফিসে আসার পর তার কাছে বেতনের বিষয়ে বলতে গেলে, তিনি আমাকে দুনিয়াবি চিন্তার বিষয়টি বাদ দিতে বলেন। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই মাদ্রাসার মাঠে রাখা গাড়িটির দিকে আমি তাকাই, তিনি এ বিষয়টি দেখতে পেয়ে আবারও বলেন ওটা (গাড়ি) দুয়িয়ার বিষয়। এদিকে নজর দেওয়া যাবে না।’ শুধু রাকিবুল নয়, তাদের দেশের ৯৫ শতাংশ সাধারণ শিক্ষক ঠিকঠাক বেতন পান না। ফলে শিক্ষকতার পাশাপাশি কেউ কেউ ভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। 

নিম্নবিত্ত পরিবারের একটি বড় অংশ কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। তাই রাষ্ট্রের উচিত তাদের বিষয়ে ইতিবাচকভাবে চিন্তা করা। অ্যাকাডেমিক বিষয়ে নমনীয় থাকলেও আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে। কওমি স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই শিক্ষকদের আর্থিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে— অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম,  ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়

কওমি শিক্ষকরা বলছেন, এই ধারায় শিক্ষা অর্জন করে কিছু সামর্থ্যবান ব্যবসা করলেও বড় অংশকে বাধ্য হয়েই অল্প বেতনের চাকরি করতে হচ্ছে। আর দেশের বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন মূলত দেশের ধর্মপ্রাণ জনগণের অনুদান, ওয়াজ-মাহফিল, মাদ্রাসার নিজস্ব আয়ের বিভিন্ন উৎস বা ছাত্র-ছাত্রীদের বেতনের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়।

তারা বলছেন, বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার ইতিহাস একশ বছরের বেশি হলেও এই সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা বোর্ডই বেতনকাঠামো তৈরি করেনি। এ সুযোগে মাদ্রাসা প্রধানরা শিক্ষকদেরকে নিজেদের মনমতো বেতন দিচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের। এমনকি চাকরির কোনো নীতিমালা বা ধরাবাঁধা নিয়ম না থাকায় প্রতিবাদও করতে পারেন না তারা। ধর্মীয় খেদমতের দিকে তাকিয়ে মুখ বুঝে কষ্ট সহ্য করে অল্প বেতনে শিক্ষককতা করছেন তারা। ইসলামের খেদমতের স্বার্থেই কওমির হিফজ ও কিতাব বিভাগে চাকরি করলেও উচ্চমূল্যের বাজারে সংসার চালানোসহ স্ত্রী-পিতা-মাতা-সন্তানদের চিকিৎসা ও নিত্যনৈমিত্তিক খরচ মেটাতে পারছেন না তারা।

হুজুর যখন কওমি মাদ্রাসাটি চালু করেন তখন তিনি সাইকেল দিয়ে চলাচল করতেন, এখন তিনি মোটরসাইকেল দিয়ে যাতায়াত করেন। তার বাড়িঘরও উন্নত হয়েছে। অথচ আমাদের কেউ কেউ ৭ হাজার, কেউ ১০ হাজার অথবা সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা পান, তা-ও অনিয়মিত। পরিবার চালাতে গিয়ে আমরা যে কী পরিমাণ কষ্ট করি, তা আপনাকে বলতে পারব না।— মুফতি শফিকুল আলম 

তাদের অভিযোগ, কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষ করে যাদের সম্পদ বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ভালো তারা শহর কিংবা গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে মহিলা বা ছেলেদের জন্য একটি নতুন কওমি মাদ্রাসা চালু করছেন। মাদ্রাসা চালু করেই তারা সামান্য বেতনে শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছেন। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে মাদ্রাসার মুহতামিমরা (প্রধান) স্থানীয় ধর্মপ্রাণ জনগণের কাছ থেকে বাৎসরিক বা মাসিক আর্থিক সাহায্যও নিচ্ছেন। দান-সাদকা ও শিক্ষার্থীদের থেকে আদায় করা মাসিক বেতনে শিক্ষকদের বেতন দিয়ে থাকেন। কখনো দুই বা তিন মাসের বেতন একসাথে দিচ্ছেন। শিক্ষকদের বেতন বাকি থাকলে বাৎসরিক ওয়াজ উপলক্ষে যে চাঁদা ওঠে তা দিয়ে বকেয়াসহ অন্যান্য খরচ মিটে যায়।

পাশাপাশি আয়ের একটা বড় অংশ কোনো কোনো মুহতামিম নিজ পকেটে ভরে থাকেন বলে অভিযোগ বেশির ভাগ শিক্ষকের। ফলে মাদ্রাসা প্রধানদের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটলেও শিক্ষকদের জীবনমানের সারা বছরই একই থাকে বলে মত তাদের। এ অঙ্গনে পড়াশোনা করে মসজিদের খাদেম, মুয়াজ্জিন, ইমাম-খতিব কিংবা শিক্ষকতা ছাড়া অন্য পেশায় যাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে জানান শিক্ষকরা।

শিক্ষকদের অভিযোগ, মাদ্রাসার আয় থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হলেও কিছু প্রতিষ্ঠানে মুহতামিমদের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার মান বাড়ছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে সাধারণ শিক্ষকদের বেতন বাড়ছে না। এ কারণে অনেক শিক্ষক আর্থিক সংকটে থাকলেও চাকরি ছাড়তে পারছেন না। কারণ, অন্য প্রতিষ্ঠানে গেলেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কওমি মাদ্রাসাগুলোর মুহতামিমদের (প্রধানশিক্ষক) বেতনের বিষয়টি গোপন রাখা হয় এবং মাসের শুরুতে নিয়ে থাকেন তারা। আমাদের বেতন নিয়মিত দেওয়া হয় না। ফলে অন্য পেশার মাধ্যমে জীবন নির্বাহ করতে হয়। মুরুব্বিরা কষ্ট পাবেন বলে প্রতিবাদও করা হয় না। মুহতামিমরা স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করলেও আমাদের ‘লিল্লাহি’ বলে দেওয়া হয় স্বান্তনা। —ভুক্তভোগী শিক্ষক

দেশে কওমি মাদ্রাসার সঠিক সংখ্যাটি জানা না গেলেও দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলেই আবাসিক ধারায় গড়ে ওঠা এসব কওমি মাদ্রাসার অধিকাংশ শিক্ষার্থী খাবার খরচ দিয়ে থাকেন। যাদের সামর্থ নেই বা এতিম, তারা ফ্রিতে খেয়ে থাকেন। মাদ্রাসায় দুঃস্থদের ফান্ড নামে একটি খাত থাকে, যেখানে স্থানীয় বা সামর্থ্যবান জনগণ দান করে থাকেন। এ টাকা থেকেই তাদের (এতিম- গরিব-দুঃস্থ) খরচ মেটানো হয়ে থাকে। এ ছাড়াও গ্রামাঞ্চল বা মফস্বল শহরের অধিকাংশ কওমি মাদ্রাসায় লজিং বা অনাবাসিক পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের খাবারের চাহিদা মিটে থাকে। তবে শিক্ষকদের বেতনও হয়ে থাকে দান বা শিক্ষার্থীদের বেতন থেকে। পাশাপাশি বার্ষিক ওয়াজ থেকে আয় করা টাকা থেকে তাদের বকেয়া বেতন দেওয়া হয়ে থাকে। এদিকে কওমি মাদ্রাসায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সারাবছর কত টাকা দান করেন তার হিসাবের কথাও জানেন না শিক্ষকরা।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসাকে সরকারের আওতায় আনতে বিভিন্ন মাদ্রাসা প্রধানদের নিয়ে রাজধানীর একটি নামিদামি ফাইভস্টার হোটেলে বসা হয়, সেসময় সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয় যে, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড নামে একটি বোর্ড গঠন করা হবে। এর প্রশাসক শুধু সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে। বাকি যারা থাকবেন তাদেরই লোকজন থাকবেন। তারা যতদিন যোগ্য না হবেন, ততদিন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসক থাকবে। সরকার তাদের অ্যাকাডেমিক বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। শুধু তাদের অবকাঠামোগত ও আর্থিক বিষয়ে সরকার নজরদারি করবে। এ কথা জানেোনার পর তাারা তা নাকচ করে দেয়।   

শরীয়তপুর জেলা শহরের একটি কওমি মাদ্রাসার কিতাব বিভাগের শিক্ষক শফিকুল আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তাদের নিয়মিত বেতন দেওয়া হয় না। দুই বা তিন মাস পর পর বেতন দেওয়া হয়। বকেয়া থাকলে বার্ষিক ওয়াজের আয়োজন থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে তা পরিশোধ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘হুজুর যখন এ মাদ্রাসা চালু করেন তখন তিনি সাইকেল দিয়ে চলাচল করতেন, এখন তিনি মোটরসাইকেল দিয়ে যাতায়াত করেন। তার বাড়িঘরও উন্নত হয়েছে। অথচ আমাদের কেউ কেউ ৭ হাজার, কেউ ১০ হাজার অথবা সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা পান, তা-ও অনিয়মিত। পরিবার চালাতে গিয়ে আমরা যে কী পরিমাণ কষ্ট করি, তা আপনাকে বলতে পারব না। আপনি অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললে তারাও একই কথা বলবে। বর্তমানে উচ্চমূল্যের বাজারে এ টাকা দিয়ে জীবনযাপন করা যায় না।’

হেদায়াতুল্লাহ উসমানী নামের এক কওমি শিক্ষার্থী নিজ ফেসবুক আইডিতি এক পোস্টে লেখেন, ‘হুজুরদের বেতন ১৫ বা তার আশেপাশে বা আরও কম। সমস্যা নেই। কিন্তু অনেক মাদ্রাসা আছে এমন যে দুই ঈদের কোনো ঈদেই বোনাস দেওয়া হয় না। বর্তমান যুগেও এমন জাহিলি আইন-কানুন অনেক কওমি মাদ্রাসায় বিদ্যমান। যারা কর্তৃপক্ষ আছে তাদের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদেরকে বোঝাবে কে! কার সাধ্য আছে তাদের বোঝানোর। আল্লাহ ওই সব কর্তৃপক্ষকে সঠিক সুমতি দান করুন।’

ধুপখোলা মাঠের জামালুল কুরআন মাদ্রাসার মুহতামিম মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম বলেন, কওমি অঙ্গনে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় শিক্ষকদের কম বেতন দিতে হয়। এই অর্থ দিয়ে শিক্ষকদের সংসার চালাতে কষ্ট হয়, তা তারা বোঝেন। একই ধরনের কথা জানিয়েছেন পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকার মাদরাসা বাইতুল উলুম ঢালকানগরের মুহতামিম মুফতি জাফর আহমদ।

রাজধানীর বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটির উম্মে কুলসুম জামে মসজিদের ইমাম ও উত্তরখানের আন-নুহা শিশু একাডেমির পরিচালক মুফতী তাওহীদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বর্তমান বাজার দরে কওমি শিক্ষকরা যে টাকা বেতন পাচ্ছেন, তা দিয়ে জীবন চালানো খুবই কষ্টকর। তাছাড়া মাদ্রাসা প্রধানদের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষকদের বেতনে বৈষম্য রয়েছে। বেফাকের বেতন কাঠামো নিয়ে নীতিমালা নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন আমাদের বেতন কাঠামো নীতিমালা করে, সে দাবি জানাচ্ছি। কওমি শিক্ষকরা কম টাকা বেতন পাওয়ায় অনেকে শিক্ষকতার পাশাপাশি আরও অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকেন।’

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাওলানা আব্দুল জলিল বলেন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতনের বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। তবে আর্থিক অডিটের ভয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে যুক্ত হতে চাচ্ছি না, এ কথাটি সত্য নয়। আমাদের একটা নিজস্বতা রয়েছে।

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসাগুলো সমাজের একটি শ্রেণিকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাই রাষ্ট্রের উচিত তাদের বিষয়ে ইতিবাচকভাবে চিন্তা করা। সরকার প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। একইভাবে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের বিষয়টিও ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘অনেক কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন নেওয়া হয় না। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ সমাজের বিত্তবান মানুষের দান ও সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। ফলে শিক্ষকদের বেতনও অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত হয়ে থাকে। একজন শিক্ষককে নিজের পরিবারের ভরণপোষণও করতে হয়। শুধু ‘লিল্লাহি’ সহায়তার ওপর নির্ভর করে তার পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন। তাই শিক্ষকদের জন্য উপযোগী আয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

আরেকটি বিষয় হলো, কওমি মাদ্রাসাগুলোর আয় ও ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান যেহেতু সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রচলিত কাঠামোর বাইরে রয়েছে, তাই আয় কীভাবে হচ্ছে এবং তা কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে।’

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে চায়, আর সরকারও এ বিষয়ে নমনীয় অবস্থান রাখছে। তবে স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই শিক্ষকদের আর্থিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। আমি যতটুকু জানি, সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে কওমি মাদ্রাসার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কীভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান উন্নয়ন করা যায়, তা নিয়ে ইতিবাচকভাবে চিন্তাভাবনা করছে। শিক্ষকদের কোনো উপযুক্ত সরকারি সহায়তা বা স্কিমের আওতায় আনা গেলে তারা আর্থিকভাবে উপকৃত হবেন। এর ফলে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ও সামগ্রিকভাবে সমাজের অগ্রগতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি।’

মিষ্টির পর ইশরাকের বিদায়— অন্যদের প্রতিও কঠিন বার্তা প্রধান…
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
দেশবাসী তাকিয়ে আছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কবে পদত্যাগ করবেন: না…
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডি দিলীপ কুমার আগরওয়াল গ্রেপ্তার
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
এসএসসি পরীক্ষার খাতার সম্মানী পাবেন কবে, জানালেন আন্তঃশিক্ষ…
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ফেসবুকে যত্রতত্র পোস্ট-রিল? যেভাবে সাজাবেন ইচ্ছামতো
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
তামিমের বার্তা ফাঁস করলেন বাংলাদেশ কোচ
  • ১৯ অক্টোবর ২০২৬