মুক্ত আলোচনায় আইনজ্ঞরা

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল দেশকে ভয়ানক পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে

১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫২ PM
জাতীয় প্রেসক্লাবের মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

জাতীয় প্রেসক্লাবের মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। © টিডিসি ফটো

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল এর মাধ্যমে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, তা দেশকে ভয়ানক পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। 

শনিবার (১১ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত “সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল হতে লেগেছে ৫৫ বছর, স্বাধীনতা আর কতদূর?” শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় বক্তারা একথা বলেন। 

স্বেচ্ছাসেবী মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’ এবং ‘আইন ও বিচার’ পত্রিকা জরুরী ও জনগুরুত্বপূর্ণ এ মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন, হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপার্সন এবং আইন ও বিচার পত্রিকার সম্পাদক মুহাম্মদ শফিকুর রহমান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আপীল বিভাগের সম্মানিত বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে যে পরিমান কাটাছেড়া করা হয়েছে তাতে একে সংস্কার করতেই হবে। যদি গণঅভ্যূত্থানকে বৈধ মনে করা না হয়, তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যে সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিলো তার অধিকাংশই বৈধতা হারায় এবং বর্তমান সরকারও বৈধতা হারাবে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় থেকেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি আলোচিত হয়ে আসছে। সুতরাং বিষয়টি ৫৫ বছরের নয়, এ দাবী সার্বজনীন এবং সর্বকালের। এ দাবী থেকে পশ্চাদপসারণ করার চিন্তা কেবলই পিছিয়ে যাওয়ার নামান্তর। 

তিনি বলেন, অধ্যাদেশসমূহ রহিতকরণের মাধ্যমে বর্তমান সরকার অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদকে পরিত্যাগ করলো। যে জনগণ হাসিনার মতো ফ্যাসিস্টকে সরাতে পারে, তাদের কাছে বর্তমান সরকারকে সরানো কোন ব্যাপারই না। তারা আত্মঘাতি কাজ করছে। তারা মানুষকে মূল্যায়ন করছে না। অমীমাংশিত বিষয় সমঝোতার মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেন তিনি। বিচার বিভাগের ২৮ জন অফিসারকে কারণ দর্শাও নোটিশ জারী করার মাধ্যমে বিচার প্রশাসন ভালো কাজ করেনি।  সেই সাথে বিচার বিভাগ সংক্রান্তে কথা বলার প্রতিবাদে জারী করা নোটিশকেও তিনি বৈধ মনে করেন না। 

বিচারপতি  আবদুল মতিন আরো বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি বলছেন তাকে জোর করে অনেক কিছু করানো হয়েছে। তাহলেতো তিনি শপথের সঙ্গে অন্যায় করেছেন, তার পদত্যাগ করা উচিৎ। এছাড়াও এ কারণে তিনি ইমপীচযোগ্য।

সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন তার বক্তব্যে বলেন, যখন প্রয়োজন আইনী কাঠামোকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার, তখন বিল রহিতকরণের মাধ্যমে আমাদেরকে পিছিয়ে দেয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। অমাদের দেশে পার্লামেন্টে গিয়ে অনেকে নিজেকে আল্লাহ-খোদা মনে করে। অথচ হওয়ার কথা ছিল তার বিপরীত। ৫৫ বছরে আমাদের বিচার বিভাগ যেন সৎ মায়ের মতোই আচরণ পেয়ে আসছে। কোর্ট এখন ন্যায়বিচারের পরিবর্তে নির্যাতনের স্থানে পরিণত হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এ সংবিধানকে আওয়ামী দলীয় ইশতেহার হিসেবে ছুড়ে ফেলার কথা বললেও বর্তমানে কিছু লোকের কুমন্ত্রণায় ‘৭২ এর সংবিধানই এখন মুখ্য বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, খুব শীঘ্র সময়ে জজ নিয়োগ হতে যাচ্ছে। কিন্তু তার পুর্বে বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ রহিত করার মাধ্যমে আবারো দলীয় বিচারক নিয়োগের সুযোগ তৈরী করা হলো। যেখানে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাই মুখ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। 

সুপ্রিম কোর্টের জেষ্ঠ্য আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক বলেন, এই অধ্যাদেশ রহিতকরণের মাধ্যমে দেশ কঠিন পরিণতির দিকে এড়িয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী ২০ বছর পরেও যদি আওয়ামী লীগ ফিরে আসে, তখন তারা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। বর্তমান সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, যা ভয়ের কারণ। জানি পৃথক সচিবালয় এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ পাবো না। তারপরও আমি আশাবাদী হতে চাই।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী হাসান তারিক চৌধুরী বলেন, অতীতের সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারও চায় ক্রীতদাস বিচারক। লুটপাটের অর্থনীতি বজায় রাখতে তারা স্বাধীন বিচার বিভাগ ও দুদক চায় না। তারা চায়, মন্ত্রী ও আমলাদের হাতে থাকুক নিম্ন আদালতের বিচারকদের প্রমোশন-বদলীসহ সকল নিয়ন্ত্রণ। অথচ এই দানবদের বিরুদ্ধেই অভ্যুত্থান হয়েছিলো। তিনি বলেন, ৯০’র তিন জোটের সংস্কারের রূপরেখা এখনো ফাইলবন্দী। যেখানে অর্থ এবং ক্ষমতা বিষয়, সেখানেই কুচক্রীরা সংস্কারকে মানতে চায় না।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক বলেন, জুলাইয়ের শহীদ এবং আহতদের রক্ত এখনো দগদগে। এর মধ্যেই কি করে জুলাইয়ের ভুক্তভোগীরা ভুলে গেলেন, তাদেও পরিণতির কথা। কিছুদিন আগেও যে ব্যক্তি এই অধ্যাদেশের পক্ষে বলেছেন, আজ মন্ত্রী হয়ে তিনি ভোল পাল্টেছেন। আকবর আলী খান যেভাবে শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন, আমরাও সেভাবেই এদের হাত থেকে মুক্তি চাই।

তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে যে অধ্যাদেশ হলো, তা রহিতকরণের কারণে জনগণের কি উপকার হলো, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে ১৭ বছর ধরে আপনারা যে দুর্দশার মুখোমুখি হয়েছিলেন সামনে তারচেয়েও কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা আছে। 
সাবেক যুগ্ম জেলা জজ এবং আইনজীবী ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, রহিতকরণ ঠিক হয়নি, এ পদক্ষেপ সরকারের জন্যই বুমেরাং হতে পারে। মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগের কালচারাল ব্যাকআপ ছিলো কিন্তু বিএনপির তা নেই। আর কতকাল সংগ্রাম করলে বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে, জানতে চাই।

তিনি বলেন, তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কারণে স্বাধীন বিচার বিভাগ শেষ। কারণ বিচারকদের কেউ কেউ এ সরকারের প্রধান হতে চান। আর এর কারণেই তারা দলীয় আস্থাভাজন হবার চেষ্টা করেন, দলগুলোও তাই চায়।  

জুলাই ছাত্র আন্দোলন ও ‘গণবিপ্লবী উদ্যোগে’র প্রতিনিধি আরিফ সোহেল বলেন, বিচার বিভাগের অবস্থান পরষ্পরবিরোধী। অভ্যূত্থান চলাকালীন বিচার বিভাগকে যেভাবে নির্বাহী বিভাগের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি, এখনো তারই প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। আমরাতো এধরনের বিচার বিভাগ চাইনি। বিচার বিভাগ বৈষম্যবিরোধী হোক এটাই ছিলো আমাদের চাওয়া। বর্তমান সরকার অধ্যাদেশ রহিতকরণের মাধ্যমে জুলাইয়ের চেতনার উল্টো পথে হাটছে। যা জাতির জন্য বেদনাদায়ক।

তিনি আরো বলেন, বিএনপি পাওয়ার হাতে পেয়েছে। তারা তা কমাবে। এটা ভাবাও উদ্ভট চিন্তা। তবে কলোনিয়াল বিচার ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এর জন্য মুক্ত এবং স্বাধীন দেশের উপযোগী নতুন আইন প্রণয়নের সাহস করতে হবে। বর্তমান পার্লামেন্ট এটা করবে বলে আশা করছি।

সভাপতির বক্তব্যে মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, অধ্যাদেশ রহিতকরণের ফলে গণতন্ত্রের বিকাশ এবং গণতন্ত্র চর্চায় অন্তরায় তৈরীর সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সরকার কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। ভিন্নমত দমনে আদালতকে ব্যবহারের সুয়োগ সৃষ্টি হবে। দাগী অপরাধীরা সরকারী দলের ছত্রছায়ায় থেকে বিচারের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করবে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয় আদালতে নিয়ে আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টাও বৃদ্ধি পাবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চিতে বাঁধা হবে এ রহিতকরণ। বিচারকগণের একটি অংশ সরকার দলীয় রাজনীতিবিদগণ কর্তৃক ব্যপকভাবে প্রভাবিত হবে। গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের জন্য রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। নিরপেক্ষভাবে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিচারকগণ হয়রানীর শিকার হবার সম্ভাবনা রয়েছে। যাতে সৎ ও সাহসী বিচারকগণের মনোবল ভেঙ্গে পড়তে পারে। দক্ষ জনবল তৈরী ব্যাহত হবে। বিচার প্রশাসন ও আদালত ব্যবস্থাপণায় বিশৃংখলার পাশাপাশি সাধারণ বিচার প্রার্থী মানুষের মধ্যে আইন-আদালত সংক্রান্তে আস্থার সংকট তৈরী হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ডাকাত ধরতে ধানক্ষেতে নেমে কাদা মেখে একাকার …
  • ১১ এপ্রিল ২০২৬
রাতেই ৬০ কি.মি. বেগে ঝড় হতে পারে যেসব অঞ্চলে
  • ১১ এপ্রিল ২০২৬
১১৬ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি-প্রোভিসি-ট্রেজারার পদে কার…
  • ১১ এপ্রিল ২০২৬
অনলাইন ক্লাস সহজ করবে যেসব অ্যাপস
  • ১১ এপ্রিল ২০২৬
চাচি-ভাতিজার প্রেমের সম্পর্ক, অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি নিয়ে ব…
  • ১১ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের পদপ…
  • ১১ এপ্রিল ২০২৬
close