প্রতীকী ছবি © ফাইল ছবি
বিশ্ব সৃষ্টির সূচনা থেকে শেষ অবধি মানবজাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তমসাবৃত পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ও নেয়ামত হিসেবে আগমন করেছেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, শান্তির দূত, সায়্যিদুল মুরসালিন, খাতামুন্নাবিয়্যিন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তাঁর ধূলির ধরায় আগমন পৃথিবীর ইতিহাসকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল।
অন্ধকার যুগের বর্বরতা, অবিচার ও জাহেলিয়াত দূর করে এক সত্য ও সুন্দরের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাই বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর নিকট ১২ রবিউল আউয়াল বা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) কেবল একটি বিশেষ দিন নয়; বরং এটি সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য শ্রেষ্ঠ আনন্দের দিন।
ঈদের শব্দার্থ ও ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর গভীরতা
‘ঈদ’ শব্দের অর্থ আনন্দ, খুশি বা পুনরাবৃত্তি হওয়া। আর ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ জন্ম বা আগমন। সুতরাং ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ বলতে বোঝায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন বা শুভ জন্ম উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করা।
ইসলামি শরিয়তে সাধারণ দুটি উৎসব বা ঈদ নির্ধারিত রয়েছে, ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। তবে আত্মিক দিক থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই দুই ঈদ পালনের পেছনেও যে মহান সত্তার শিক্ষা ও নির্দেশনা কাজ করছে, তিনি আমাদের প্রিয় নবী (সা.)। হযরত হাসান বসরী (রহ.)-সহ বহু মুহাদ্দিস ও আরিফিনদের মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.) যদি দুনিয়াতে আগমন না করতেন, তবে না পাওয়া যেত মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, না হতো ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহা। রাসুল (সা.)-এর আগমনই হলো সৃষ্টিজগতের যাবতীয় নেয়ামতের মূল। তাই তাঁর আগমনের দিনটিকে খুশি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা মুমিনের ঈমানের দাবি।
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘বলুন, এটা আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর রহমতে; সুতরাং এতে তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। এটা তারা যা সঞ্চয় করে তা অপেক্ষা উত্তম।’ (সূরা ইউনুস, আয়াত: ৫৮)। রাহমাতুল্লিল আলামিন (সা.)-এর চেয়ে বড় রহমত ও অনুগ্রহ আর কী হতে পারে? সুতরাং তাঁর জন্মদিনে খুশি প্রকাশ করা সরাসরি আল্লাহর নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
নবী করীম (সা.)-এর আগমনের পূর্বে সমগ্র পৃথিবী, বিশেষ করে আরব উপদ্বীপ, নিমজ্জিত ছিল এক অন্ধকার গহ্বরে, যা ইতিহাসে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অন্ধকারের যুগ নামে পরিচিত। ওই যুগে সামাজিকভাবে কন্যাসন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, নারীজাতিকে দাসী ও পণ্যের মতো ব্যবহার করা হতো। ‘জোর যার, মুলুক তার’—এই নীতিতে সমাজ পরিচালিত হতো। মদ্যপান, ব্যভিচার, খুন ও যুদ্ধ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এক আল্লাহর ইবাদত ভুলে মানুষ ৩৬০টি মূর্তির পূজায় লিপ্ত হয়েছিল।
ঠিক এমন এক ঘোর অমানিশার মধ্যে রবিউল আউয়াল মাসের শুভ প্রভাতে মরুভূমির বুকে রহমতের নদী প্রবাহিত করে জন্ম নেন মহামানব মুহাম্মদ (সা.)। তিনি এসে সমাজ থেকে হিংসা-বিদ্বেষ মুছে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন সাম্য, মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের এক স্বর্ণালী যুগ। দাস-দাসী পেল সামাজিক সম্মান, নারীরা পেল সম্পত্তিতে অধিকার ও উচ্চ মর্যাদা। বিষাদগ্রস্ত বিশ্ব খুঁজে পেল শান্তির শীতল পরশ।
দয়াল রাসুল (সা.)-এর অভূতপূর্ব চরিত্র ও ইনসাফ
হযরত মুহাম্মদ (সা.) কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক, দক্ষ সেনাপতি, ন্যায়বিচারক এবং সর্বোত্তম পারিবারিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব। নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বেও তাঁর সততা, সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতার কারণে আরবের কট্টর শত্রুরাও তাঁকে ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত) উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
তিনি কখনো কারও ওপর প্রতিশোধ নেননি। মক্কা বিজয়ের পর যখন চরম শত্রুরা তাঁর সামনে ভয়ে কাঁপছিল, তখন তিনি সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে ঐতিহাসিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর চরিত্র সম্পর্কে আল-কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।’ (সূরা আল-কলম, আয়াত: ৪)। ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে ছাড়া প্রেরণ করিনি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭)।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের মূল লক্ষ্য হলো প্রিয় নবীর (সা.) প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা প্রকাশ করা এবং তাঁর মহান জীবনের আদর্শকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালনের সবচেয়ে উত্তম উপায়গুলো হলো—উদযাপনের মাধ্যমে সীরাত চর্চা, রাসুল (সা.)-এর জীবন, তাঁর নৈতিকতা ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা ও সেমিনার আয়োজন করা। বেশি বেশি ‘দরুদ শরিফ’ ও ‘সালাতু সালাম’ পেশ করা, যা মুমিনের রুহানি খোরাক। অভাবী, এতিম ও মিসকিনদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করা এবং দান-সদকা করা। মহানবীর (সা.) প্রতিটি সুন্নাতকে ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক জীবনে ধারণ করা।
আমাদের মনে রাখা দরকার যে, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন যেন কোনো অপসংস্কৃতি, গোলযোগ বা শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডে রূপ না নেয়। বরং এটি হতে হবে সম্পূর্ণ ইবাদতমুখী, নমনীয় এবং নবীজির ভালোবাসায় সিক্ত এক পবিত্র আয়োজন।
আজকের আধুনিক যুগে মানুষ যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক থেকে চরম উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই নৈতিকতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং মানবিক মূল্যবোধের দিক থেকে এক বিরাট অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সমাজে আজ বর্ণবাদ, যুদ্ধ, অনাহার এবং বিশৃঙ্খলা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
এই চরম সংকটময় মুহূর্তে মানবতার মুক্তির একমাত্র পথ হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রদর্শিত পথ ও মত অনুসরণ করা।
বিদায় হজের ভাষণে নবীজি (সা.) ঘোষণা করেছিলেন যে, অনারবের ওপর আরবের কিংবা সাদার ওপর কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি। আজকের সংঘাতময় বিশ্বে এই সাম্যের বাণী বাস্তবায়ন করা জরুরি। শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক বুঝিয়ে দেওয়ার মানবিক নির্দেশ দিয়েছিলেন মহানবী (সা.)। মদিনা সনদের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করেন, যেখানে সকল ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিল।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আমাদের কেবল আনন্দের বার্তা দেয় না, বরং এটি এক মহান দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ ঈদ’ হিসেবে এই দিনটি পালনের আসল সার্থকতা সেখানেই, যেখানে আমরা মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরব এবং তাঁর দেখানো শান্তি, দয়া ও ইনসাফের পথ ধরে হাঁটব।
আসুন, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর এই মহিমান্বিত দিনে আমরা শপথ নিই—আমাদের প্রিয় নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শকে জীবন চলার একমাত্র পাথেয় করব, হৃদয়ে তাঁর প্রতি ভালোবাসার জ্যোতি জ্বালাব এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেব। তবেই আমাদের মিলাদুন্নবী পালন সার্থক ও ফলপ্রসূ হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্যিকারের সুন্নাহ অনুসারী হওয়ার এবং তাঁর শাফায়াত লাভের তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক:
মো. আনোয়ারুল কিবরিয়া
সাংবাদিক ও বিশ্লেষক