আরফার দিন ও ড. মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বাশার © সংগৃহীত
ইসলামি শরিয়তে হিজরি বর্ষপঞ্জিকার ১২তম মাস জিলহজ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় একটি মাস। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এই মাস ছাড়াও রজব, জিলকদ ও মহররমকে বিশেষ সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের আমল খোদ মহান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের আমল অন্যান্য দিনের আমলের তুলনায় উত্তম।” সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘জিহাদও কি (উত্তম) নয়?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা স্বতন্ত্র, যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়ে জিহাদ করে এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯১৮)।
জিলহজ মাসের ৯ তারিখকে ‘ইয়াউমুল আরাফা’ বা আরাফার দিন বলা হয়। যারা হজে যাননি, তাঁদের জন্য এই দিনে রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি সুন্নত আমল। স্বাভাবিকভাবে অন্য কোনো নফল রোজার ক্ষেত্রে এত বিশাল সওয়াব বা ফজিলত পাওয়া যায় না। আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতি মাসে তিন দিন সাওম (রোজা) পালন করা এবং রমজান মাসের সাওম এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান পর্যন্ত সারা বছর সাওম পালনের সমান। আর আরাফাত দিবসের সাওম সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তাতে পূর্ববর্তী বছর ও পরবর্তী বছরের গুনাহের ক্ষতিপূরণ (মাফ) হয়ে যাবে। এছাড়া আশুরার সাওম সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তাতে পূর্ববর্তী বছরের গুনাহসমূহের কাফফারা হয়ে যাবে।’ (হাদিস: ২৬১৭)।
আরাফার দিনের বিশেষ গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, ‘আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার নিকটবর্তী হন এবং বান্দাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন, ‘কী চায় তারা?’ (অর্থাৎ তারা যা চায়, তাই তাদের দেওয়া হবে)।’ (সহিহ মুসলিম: ১৩৪৮)।
উল্লেখ্য, নবীজি (সা.) আরাফার দিনসহ জিলহজের প্রথম আট দিনও রোজা রাখতেন। জিলহজ মাসের প্রথম নয়দিনের এই রোজা তিনি কখনো বাদ দিতেন না। উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.) কখনো চারটি আমল পরিত্যাগ করেননি—আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম দশকের (নয় দিন) রোজা, প্রতি মাসে তিন দিন রোজা এবং ফজরের পূর্বের দুই রাকাত সুন্নত নামাজ।’ (সুনানে নাসাঈ: ২৪১৬)।
এছাড়া আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘এ দশকের প্রতি দিনের রোজা এক বছরের রোজার এবং এর প্রত্যেক রাতের নামাজ কদরের রাতের নামাজের সমতুল্য।’ (সুনানে তিরমিজি: ৭৫৮)। জিলহজ মাসের চাঁদের ওপর ভিত্তি করে ৯ জিলহজ আরাফার দিবসের রোজা রাখতে হয়। তবে অনেক সময় সৌদি আরব ও বাংলাদেশের চাঁদ দেখার পার্থক্যের কারণে এই তারিখে ভিন্নতা দেখা দেয়, যা নিয়ে সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
চলতি বছর আগামী ২৬ মে পবিত্র হজ পালিত হবে এবং পরদিন ২৭ মে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশে আগামী ২৮ মে পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হবে। চাঁদ দেখার এই ভিন্নতা অনুসারে বাংলাদেশে অবস্থানকারীদের জন্য ফজিলতপূর্ণ ‘আরাফার দিন’ বা ৯ জিলহজ হলো আগামী ২৭ মে, বুধবার। যারা বাংলাদেশে থেকে আরাফার দিনের ঐতিহ্যগত রোজাটি রাখতে চান, তারা আগামী মঙ্গলবার (২৬ মে) দিবাগত রাতে সাহরি খেয়ে বুধবার (২৭ মে) রোজা রাখবেন।
আরাফার রোজা মূলত একটি, দুটি বা তিনটি নয়। তবে সৌদি আরবের হজের দিন নাকি নিজ দেশের ৯ জিলহজে রোজা রাখতে হবে—তা নিয়ে আলেমদের মাঝে দুটি ভিন্ন মত রয়েছে।
আরও পড়ুন: তাকবিরে তাশরিকের বিধান কী, কবে থেকে পড়তে হবে?
এ বিষয়ে বিশিষ্ট ইসলামি স্কলার ও গবেষক ড. মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বাশার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘হাদিসে এ বিষয়ে দুই ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনায় নির্দিষ্ট তারিখের কথা উল্লেখ নেই, বরং ‘আরাফার দিবসের রোজা’র কথা বলা হয়েছে। সেখানে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমি আশা করি, আল্লাহ তাআলা আরাফার দিনের রোজার মাধ্যমে আগের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ এই হাদিসে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘আরাফার দিবস’-কে, নির্দিষ্ট তারিখকে নয়। আরাফা তো পৃথিবীতে এক বা আলাদা কোনো স্থান নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট স্থান। হাজিরা যেদিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন, সেদিনই প্রকৃত অর্থে আরাফার দিবস। বর্তমানে স্যাটেলাইট ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষ দেখতে পায় হাজিরা কোন দিন আরাফায় অবস্থান করছেন।’
তারিখের ভিন্নতার কারণে বাংলাদেশে যখন ৯ জিলহজ (বুধবার), তখন হাজিরা আগের দিনই (মঙ্গলবার) আরাফা সম্পন্ন করে ফেলেছেন। এ অবস্থায় মাওলানা বাশার পরামর্শ দেন, যেদিন হাজিরা আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন (অর্থাৎ বাংলাদেশের হিসাবে মঙ্গলবার, ২৬ মে) সেদিন রোজা রাখাই উত্তম। তবে কেউ যদি বাংলাদেশের হিসাবে ৯ জিলহজেও (বুধবার, ২৭ মে) রোজা রাখতে চান, সেটিও গ্রহণযোগ্য। এই বিভ্রান্তি এড়াতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ৮ জিলহজ এবং ৯ জিলহজ (অর্থাৎ আগামী মঙ্গলবার ও বুধবার) দুই দিনই রোজা রাখার পরামর্শ দেন। এতে একদিকে সৌদি আরবের আরাফার দিবসের ফজিলত যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি দেশের হিসাবে ৯ জিলহজের আমলও পূর্ণ হবে।
আবার শায়খ আহমাদুল্লাহসহ দেশের অধিকাংশ আলেমের মতে—যেহেতু পবিত্র হজ পৃথিবীতে শুধুমাত্র এক জায়গায় (মক্কা শরিফে) হয়, তাই সারা পৃথিবীতে হজের দিন তথা হাজিদের আরাফায় অবস্থানের দিনই আরাফার রোজা পালন করা উচিত। অন্যদিকে, একদল আলেমের মতে, যে দেশে চাঁদ দেখার ওপর যেদিন জিলহজ মাসের ৯ তারিখ হবে, সেখানকার অধিবাসীদের জন্য সেদিনই আরাফার দিন গণ্য হবে এবং ওই দিন রোজা রাখলেই ওপরোক্ত সওয়াব ও ফজিলত লাভ করা যাবে।
হজ পালনকারীদের জন্য আরাফার ময়দানে অবস্থানকালে রোজা রাখা সুন্নত নয়। বিদায় হজের সময় আরাফার ময়দানে নবী করীম (সা.) রোজা অবস্থায় আছেন কি না তা নিয়ে সাহাবিদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছিল। তখন রাসুলুল্লাহর (সা.) সামনে এক পেয়ালা দুধ পেশ করা হলে তিনি সবার সামনে তা পান করে প্রমাণ করেন যে তিনি রোজা রাখেননি (সহিহ বুখারি: ১৬৬১)।
সুতরাং, হজ পালনকারীদের জন্য সুন্নত হলো আরাফার দিন রোজা না রাখা, যেন তারা পূর্ণ শক্তি নিয়ে হজের মূল ইবাদত ও দোয়া সম্পন্ন করতে পারেন। তবে কোনো হাজি যদি মনে করেন রোজা রাখলে তার শারীরিক কোনো সমস্যা হবে না এবং হজের অন্যান্য সব আমল সুন্দরভাবে পালন করতে পারবেন, তবে তার জন্য রোজা রাখা না-জায়েজ নয়, বরং তা মুবাহ বা জায়েজ।