ঢাকার ঈদ © টিডিসি ফটো
ঢাকা আজ বাংলাদেশের রাজধানী। কিন্তু এই নগরীর ইতিহাস শুধু প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক নয় এটি উৎসব, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যেরও ইতিহাস। বিশেষ করে ঈদ উৎসবের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক বহু শতাব্দীর। মুঘল আমলে এই শহরে ঈদ শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না; ছিল রাজনীতি, ক্ষমতা, সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগের এক বিশেষ পরিসর। ইতিহাসের পাতায় এমন একটি ব্যতিক্রমী ঘটনার কথা পাওয়া যায়, ১৭২৯ সালে ত্রিপুরা বিজয়ের পর বন্দী ত্রিপুরা রাজা ধর্মমানিক্যকে ঢাকায় এনে যে ঈদ উদযাপন করা হয়েছিল। সেই ঈদ ছিল বিজয়ের আনন্দ ও ধর্মীয় উৎসবের এক বিরল সমন্বয়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায় নয়, বরং মুঘল আমলে ঢাকার ঈদ উদযাপনের দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাও দেখতে পাই। বিশেষত দেখা যায়, মোগল আমলে ঢাকার ঈদ উদযাপন ছিল রাজকীয় আড়ম্বরপূর্ণ এবং নানা ঐতিহ্যে পরিপূর্ণ।
১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খান চিশতী যখন বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন, তখন থেকেই ঢাকা দ্রুত বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, সামরিক শক্তি এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদের আগমনের ফলে শহরটি হয়ে ওঠে একটি প্রাণচঞ্চল নগরী। এই সময় থেকেই ঢাকায় মুসলিম সংস্কৃতি ও ধর্মীয় উৎসবগুলো জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হতে থাকে। ঐতিহাসিক মির্জা নাথানের ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বী’ গ্রন্থে ঢাকায় ঈদ উৎসবের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ রয়েছে যে রমজান মাসের শুরু থেকেই মোগল সেনা ও কর্মকর্তারা পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হতেন এবং ঈদের দিনটিকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হতো। ঈদের চাঁদ দেখা গেলে সৈন্য শিবিরে বাজত শাহী তূর্য এবং গোলন্দাজ বাহিনীর কামান নিক্ষেপে আকাশ আলোকিত হয়ে উঠত। আতশবাজি ও নানা আয়োজনের মাধ্যমে ঢাকাবাসী ঈদের আগমন উদযাপন করত। ঢাকার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ইতিহাসবিদ নাজির হোসেন তাঁর ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, মুঘল আমলে ঢাকার প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকা কেল্লাকে ঘিরেই ঈদ উৎসবের প্রধান আয়োজন হতো। মুঘল অভিজাতরা ঈদের দিন বিশেষ পোশাক পরে ঈদগাহে যেতেন এবং নামাজ শেষে দরবারে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন।
শাহ সুজা ও ধানমন্ডির শাহি ঈদগাহ
ঢাকার ঈদ উদযাপনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো ধানমন্ডির শাহি ঈদগাহ। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা যখন বাংলার সুবাহদার ছিলেন, তখন তাঁর নির্দেশে এই ঈদগাহ নির্মিত হয়। ঐতিহাসিক কেদারনাথ মজুমদার তাঁর ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এই ঈদগাহ নির্মাণ করেন মীর আবুল কাশেম। উঁচু প্রাচীরঘেরা এই স্থানে মুঘল আমলে সুবাহদার, নায়েবে নাজিম এবং অভিজাত শ্রেণির লোকেরা ঈদের নামাজ আদায় করতেন।
ও১
এই ঈদগাহের পাশ দিয়ে একসময় পাণ্ডু নদীর একটি শাখা প্রবাহিত হতো, যা জাফরাবাদের সাতগম্বুজ মসজিদের কাছে গিয়ে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। ফলে ঈদগাহটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বরং নগর পরিকল্পনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। মুঘল আমলে সাধারণ মানুষ এই ঈদগাহে নামাজ পড়ার সুযোগ খুব বেশি পেত না। কারণ ঈদ উৎসব তখন মূলত শাসক ও অভিজাতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে ব্রিটিশ আমলে এবং বিশেষ করে উনিশ শতকের শেষ দিকে এই ঈদগাহে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়।
মুঘল আমলের ঈদ উৎসবের রীতিনীতি
মুঘলদের ঈদ উদযাপনে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান ছিল। ইতিহাসবিদ রিদওয়ান আক্রাম তাঁর ‘ঢাকার ঐতিহাসিক নিদর্শন’ গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে মুঘলরা ঈদের সময় কয়েকদিন ধরে আনন্দ উৎসব করত। সংগীত, নৃত্য, মেলা এবং আতশবাজি ছিল এই উৎসবের অংশ।
ঐতিহাসিক হেকিম হাবীবুর রহমান তাঁর ‘ঢাকা পাচাশ বারস পহেলে’ গ্রন্থে ঢাকার ঈদ উৎসবের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা থেকে জানা যায় যে ঈদের আগের দিন থেকেই শহর জুড়ে আনন্দের আবহ তৈরি হতো। মানুষ নৌকায় করে নদীর মাঝখানে গিয়ে চাঁদ দেখত এবং চাঁদ দেখা গেলে বন্দুকের গুলি ছুড়ে আনন্দ প্রকাশ করত। ঈদের দিন সকালে নামাজ শেষে শুরু হতো শুভেচ্ছা বিনিময়। ধনী পরিবারগুলোতে আয়োজন করা হতো নানা ধরনের খাবারের। আবু যোহা নূর তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন যে ধনী পরিবারের বাড়িতে “তোরাবন্দি” নামে এক বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হতো, যেখানে চার প্রকার পোলাও, চার প্রকার রুটি, চার প্রকার কাবাবসহ প্রায় চব্বিশ ধরনের খাবার পরিবেশন করা হতো।
আজকের আধুনিক ঢাকায় সেই পুরনো ঐতিহ্যের অনেক কিছুই হারিয়ে গেলেও ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সেগুলো অমর হয়ে রয়েছে। তাই ঢাকার ঈদের ইতিহাস শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের কাহিনি নয়; এটি একটি শহরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ঢাকার ঈদ উৎসবের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ঈদ মিছিল। মুঘল আমলে এই মিছিল মূলত রাজকীয় শোভাযাত্রা হিসেবে শুরু হলেও পরে তা জনসাধারণের উৎসবে পরিণত হয়। উনিশ শতকের শুরুতে শিল্পী আলম মুসাওয়ার আঁকা চিত্রে ঢাকার ঈদ মিছিলের দৃশ্য পাওয়া যায়। এই মিছিল নিমতলী প্রাসাদ থেকে বের হয়ে চকবাজার, হোসেনি দালান, বেগমবাজার হয়ে আবার প্রাসাদে ফিরে আসত। মিছিলে সজ্জিত হাতি, ঘোড়া, পালকি এবং সৈন্যদল থাকত। অনেক সময় ব্যান্ড পার্টি ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারও দেখা যেত। ঈদ মিছিলে গাওয়া হতো বিশেষ ধরনের গান, যা স্থানীয়ভাবে ‘কাসিদা’ নামে পরিচিত ছিল। কাসিদা শিল্পীরা রমজানের রাতে ঢাকার অলিগলিতে গান গেয়ে মানুষকে সেহরির জন্য জাগিয়ে তুলতেন। ঈদের দিন কাবুলিওয়ালাদের নাচ, কাওয়ালির আসর এবং বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হতো। এসব অনুষ্ঠান ঢাকার নাগরিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছিল।
মোগল আমলে ঢাকার ঈদ
খাবারের ক্ষেত্রেও ছিল বৈচিত্র্য। শির খোরমা, সেমাই, পোলাও, কোরমা, কাবাব, নানরুটি, বাকেরখানি, ফালুদা এবং নানা ধরনের মিষ্টি ছিল ঈদের প্রধান আকর্ষণ। ধনী পরিবারগুলোতে বিশেষভাবে ‘তোরাবন্দি’ নামে বিশাল ভোজের আয়োজন করা হতো, যেখানে বহু পদ খাবার পরিবেশন করা হতো।
মুর্শিদকুলী খান ও বাংলার শাসন
মুঘল আমলের শেষদিকে বাংলার প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হলো মুর্শিদকুলী খান। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল করতলব খান। তিনি প্রথমে বাংলার দেওয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে সুবাহদার হন। ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেছেন যে তিনি প্রায় ২৫ বছর বাংলার প্রশাসন পরিচালনা করেন।
রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে তিনি তাঁর প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকার পরিবর্তে মখসুসাবাদে স্থানান্তর করেন, যা পরে মুর্শিদাবাদ নামে পরিচিত হয়। তবে তিনি ঢাকার গুরুত্ব কখনোই কমিয়ে দেখেননি। তাঁর ন্যায়পরায়ণতার একটি বিখ্যাত উদাহরণ ইতিহাসে পাওয়া যায়। বিচার করতে গিয়ে তিনি নিজের ছেলেকেও মৃত্যুদণ্ড দিতে দ্বিধা করেননি। এই ঘটনা তাঁর কঠোর ন্যায়বোধের প্রমাণ হিসেবে ইতিহাসে উল্লেখিত হয়েছে।
ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে সংঘাত
ত্রিপুরার মানিক্য রাজবংশ সুলতানি আমল থেকেই শক্তিশালী ছিল। তারা অনেক সময় মুসলিম শাসকদের অধীন করদ রাজ্য হিসেবে থেকে নিজেদের শাসন বজায় রাখত। দ্বিতীয় ধর্মমানিক্য ১৭১৪ সালে ত্রিপুরার রাজা হন। প্রথমদিকে তিনি নবাব দরবারে নজরানা পাঠিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করতেন। কিন্তু পরে তিনি কর প্রদানে গড়িমসি শুরু করেন এবং স্বাধীনতার পরিকল্পনা করতে থাকেন। এই পরিস্থিতিতে ত্রিপুরার রাজপরিবারের আরেক সদস্য জগৎ রায় ঢাকার নায়েব সুবাহদারের কাছে সাহায্য চান। এর ফলে মুর্শিদকুলী খান দ্বিতীয় ত্রিপুরা অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। ১৭২৯ সালে মুঘল বাহিনী ত্রিপুরা অভিযান শুরু করে। করম আলী খান রচিত ‘মোজাফফরনামা’ এবং আজাদ আল হোসায়নি রচিত ‘নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খানি’ গ্রন্থে এই অভিযানের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই অভিযানে একটি বিশাল বাহিনী অংশ নেয়। সেখানে শুধু সৈন্যই ছিল না; ছিল পাথর কাটার শ্রমিক, সুড়ঙ্গ নির্মাতা, কামান বসানোর কারিগর, চিকিৎসক, নাপিত ও দর্জি পর্যন্ত। আধুনিক অস্ত্র যেমন মাস্কেট বন্দুক ও রকেট ব্যবহার করা হয়েছিল। ত্রিপুরার দুর্গগুলো একে একে পতন হলে রাজা ধর্মমানিক্য পালানোর সময় ধরা পড়েন। তাঁকে মীর হাবিবের কাছে নিয়ে আসা হয় এবং পরে ঢাকায় পাঠানো হয়। ১৭২৯ সালের এপ্রিল মাসে মীর হাবিব বন্দী রাজা ধর্মমানিক্যকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে ১৯ এপ্রিল ছিল সে বছরের ঈদুল ফিতর।
সেই বছর ত্রিপুরা বিজয়ের আনন্দ এবং ঈদের আনন্দ মিলিয়ে ঢাকায় এক বিরাট উৎসবের আয়োজন করা হয়। নবাব দরিদ্রদের মধ্যে এক হাজার টাকা বিতরণের নির্দেশ দেন। কেল্লা থেকে ঈদগাহ পর্যন্ত পথজুড়ে মুদ্রা বিতরণ করা হয়। বন্দী ধর্মমানিক্যকে ঢাকার দুর্গে সম্মানের সঙ্গে রাখা হয় এবং তাঁর জন্য খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা হয়। এই ঘটনাকে অনেক ইতিহাসবিদ সাম্প্রদায়িক সহনশীলতার একটি বিরল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ঐতিহ্যের পরিবর্তন ও আধুনিক ঈদ
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার ঈদ উদযাপনের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। একসময় যে ঈদ ছিল অত্যন্ত সামাজিক ও সমষ্টিগত উৎসব, বর্তমানে তা অনেকাংশে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছে। আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততা, প্রযুক্তির প্রভাব এবং সামাজিক পরিবর্তনের কারণে অনেক পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও ঈদের মূল আনন্দ এখনো অটুট রয়েছে। মানুষ এখনো ঈদের নামাজ আদায় করে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করে এবং আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। যদিও মিছিল, মেলা বা লোকজ বিনোদনের অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই, তবুও ইতিহাসের স্মৃতিতে সেই জাঁকজমকপূর্ণ ঈদ আজও অম্লান হয়ে আছে। ঢাকার ঈদ উৎসবের ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরোনো এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ। মোগল আমলে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের রূপ পেয়েছে। ত্রিপুরা বিজয়ের পর ১৭২৯ সালের ঈদ উৎসব এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে বিজয়ের আনন্দ মিলিত হয়েছিল। মুর্শিদকুলী খান ও তার উত্তরসূরিদের শাসনামলে ঢাকায় যে রাজকীয় ঈদ উদযাপনের প্রচলন হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়।
আজকের আধুনিক ঢাকায় সেই পুরনো ঐতিহ্যের অনেক কিছুই হারিয়ে গেলেও ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সেগুলো অমর হয়ে রয়েছে। তাই ঢাকার ঈদের ইতিহাস শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের কাহিনি নয়; এটি একটি শহরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে তারা জানতে পারে যে একসময় ঢাকার ঈদ ছিল রাজকীয় আড়ম্বর, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ।
লেখক: শিক্ষক
বাংলাদেশ স্টাডিজ এন্ড জিওগ্রাফি
মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, ঢাকা।