সাক্ষাৎকার

দক্ষ মানব সম্পদ গড়ার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার

অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন

অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন © টিডিসি সম্পাদিত

অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন। গত ২৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের এই অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে নিয়োগ...
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইরফান এইচ সায়েম
আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬, ০৮:০৮ PM

অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন। গত ২৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের এই অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তিনি আগামী চার বছরের জন্য এই দায়িত্ব পালন করবেন। ড. মামুন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ হাডার্সফিল্ড এর অর্থনীতি, অর্থায়ন এবং হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। 

তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জাপানিজ স্টাডিজ, উন্নয়ন পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা, উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সহায়তা কার্যকারিতা, উন্নয়ন সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান। গবেষণা ও প্রকাশনায়ও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। ড. মামুনের প্রকাশিত বই, বইয়ের অধ্যায় ও গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ৫০টির বেশি। তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি স্প্রিঙ্গার, রাউটলেজ, প্যালগ্রেভ ম্যাকমিলান এবং এমেরাল্ডের মতো খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা থেকে তাঁর বই ও বইয়ের অধ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। দেশের শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষা নিয়ে তাঁর ভাবনাসহ শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটির আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব—

ইউজিসির পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার প্রায় এক মাস হয়েছে। আপনাকে কোন বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে? ইউজিসিতে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা কেমন জানাবেন।
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন: গত ২৩ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ আমাকে ইউজিসির সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী আগামী চার বছরের জন্য এ দায়িত্ব পেয়েছি। এরই মধ্যে প্রায় এক মাস পার হয়েছে। এই সময়ে কমিশনের বিভিন্ন সভা, দাপ্তরিক কার্যক্রম ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও ইউজিসির প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছি। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রের নানা বিষয় কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।

বর্তমানে আমি ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগ এবং জনসংযোগ ও তথ্য অধিকার বিভাগের দায়িত্ব পালন করছি। পাশাপাশি ইউজিসির হায়ার এডুকেশন অ্যাকসিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় টিচার্স ট্রেনিং, গ্র্যাজুয়েট এমপ্লয়েবিলিটি ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট–সংক্রান্ত সাবকমিটির দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব দায়িত্বকে আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।

ইউজিসির কাজের পরিবেশ অত্যন্ত ইতিবাচক ও পেশাদার। চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের নেতৃত্বে কমিশনের সদস্য ও কর্মকর্তারা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা, গবেষণা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা ইউজিসিতে কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছি। আমি মনে করি, সরকারের উচ্চশিক্ষাবিষয়ক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুশাসন নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে ইউজিসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন।

নিজ কার্যালয়ে ড. মামুন

সরকারের উচ্চশিক্ষানীতি কেমন হওয়া উচিত? সেক্ষেত্রে ইউজিসির ভূমিকা কী থাকবে
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন: সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে উচ্চশিক্ষায় গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নারীদের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক ও ফলাফলভিত্তিক পাঠক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়নে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ইউজিসি সরকারের উচ্চশিক্ষা-সংক্রান্ত নীতিমালা এবং ইউজিসির কৌশলগত পরিকল্পনার আলোকে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রণয়ন করবে। সরকারের উচ্চশিক্ষানীতি বাস্তবায়নে ইউজিসি নীতিনির্ধারক, সমন্বয়কারী ও তদারকি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিশ্চিত করা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সহায়তা দেওয়া, দক্ষতা-ভিত্তিক কারিকুলাম প্রবর্তন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইউজিসি কাজ করবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রমে সমন্বয় সাধন, মান নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং গবেষণায় অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণেও ইউজিসি গুরুত্ব দেবে।

বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা বিবেচনায় নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভবিষ্যতের কর্মবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে ইউজিসি প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। সরকারের উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলাও ইউজিসির অন্যতম অগ্রাধিকার হবে।

এছাড়া দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বাস্তব ও কর্মমুখী করতে এপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু করা হবে। এতে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে এবং কর্মজীবনে প্রবেশ সহজ হবে।

ড. মামুন বক্তব্য রাখছেন

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শিক্ষার উন্নতি, মানব সম্পদের মানোন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দক্ষতার ওপর। সরকার দক্ষ মানব সম্পদ গড়ার ওপর জোর দিচ্ছে। পর্যায়ক্রমে শিক্ষা বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশ করার লক্ষ নির্ধারণ করেছে। এই বাজেটেই বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতে ৫৬ শতাংশ বাজেট বাড়িয়েছে। সরকার শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার পাশাপাশি আয়ের উৎস তৈরি করার জন্য স্মার্ট সিটি গড়ে তুলছে। সৃজনশীল অর্থনীতিতে এই প্রথম বাজেটে টাকা রাখা হয়েছে। আমি মনে করি, সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন হয়েছে এই বাজেটে। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশে উন্নীত করে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে এই বাজেট ক্রীড়নক হিসেবে ভূমিকা পালন করবে বলে আমি মনে করি। 

বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের কথা উল্লেখ ছিল শিক্ষা সংস্কার কমিশন, শিক্ষানীতি কিংবা শিক্ষা আইন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত?
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন: শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই শিক্ষা সংস্কার, শিক্ষানীতি কিংবা শিক্ষা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। বিএনপি সরকারের উচ্চশিক্ষা-ভাবনার মূল ভিত্তি হলো গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং উচ্চশিক্ষাকে কর্মসংস্থান ও জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা।

আমি মনে করি, শিক্ষা সংস্কার কমিশনের কাজ হবে দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতায় মূল্যায়ন করা এবং আগামী কয়েক দশকের চাহিদা বিবেচনায় একটি বাস্তবভিত্তিক রূপরেখা প্রণয়ন করা। বর্তমানে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও কর্মবাজারের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। এ জন্য কমিশনে দেশি-বিদেশি শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, শিল্পখাতের প্রতিনিধি এবং শিক্ষা প্রশাসনের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে আমি তিনটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে। প্রথমত, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি; দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রসার; এবং তৃতীয়ত, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে হবে, যারা শুধু চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে না, বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নেও অবদান রাখতে পারবে।

কর্মশালায় ড. মামুন

শিক্ষা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও একটি সমন্বিত ও ভবিষ্যতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, জবাবদিহি, মান নিশ্চিতকরণ, গবেষণা অর্থায়ন এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলো আইনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন লার্নিং এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো নতুন বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

আমার বিশ্বাস, শিক্ষাখাতে ধারাবাহিক সংস্কার, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা হবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, গবেষণানির্ভর, দক্ষতাভিত্তিক এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়নে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে পরিকল্পনা ছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের বড় অংশ বেকার থাকে। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে আপনার কী পরামর্শ থাকবে?
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি এখন শুধু শিক্ষা খাতের নয়, জাতীয় উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও তাঁদের অনেকেই চাকরির বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে বের হতে পারছেন না। ফলে ডিগ্রি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

আমার মতে, এ সমস্যা সমাধানে প্রথমেই পাঠক্রমকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। বর্তমান সময়ে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়; যোগাযোগ দক্ষতা, ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা, তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব দক্ষতা শিক্ষাক্রমের অংশ হওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে শিল্প খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ এবং ওয়ার্ক-বেইজড লার্নিংয়ের সুযোগ বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মপরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাবে এবং চাকরির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে।

আমি মনে করি, সব শিক্ষার্থীর চাকরি হবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসাও প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্যোক্তা তৈরির দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মকর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং স্টার্ট-আপ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং জোরদার করাও জরুরি। একই সঙ্গে কোন বিষয়ে কতজন গ্র্যাজুয়েট প্রয়োজন এবং শ্রমবাজারে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, সে বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা করে ভর্তি ও পাঠক্রম পরিকল্পনা করতে হবে।

আমার বিশ্বাস, দেশের সর্ববৃহৎ উচ্চশিক্ষা নেটওয়ার্ক হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে না। বরং জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সুনাগরিক তৈরির অন্যতম সূতিকাগারে পরিণত হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ, ক্যারিয়ার সেন্টার ও জব প্লেসমেন্ট কার্যক্রম চালু, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কলাবোরেশন শক্তিশালীকরণ, এপ্রেন্টিসশীপ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ বৃদ্ধি, ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও তৃতীয় ভাষা শিক্ষার প্রসার, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচি, ‘ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ট্রি’ উদ্যোগ নেওয়া হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে সফট স্কিলস বাড়িয়ে বিদেশে হোয়াইট কালার জব এর জন্য প্রেরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য একটি যোগ্য, দায়িত্বশীল এবং আত্মনির্ভরশীল তরুণ প্রজন্ম গড়ে তোলা। 

উল্লেখ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলার প্রসারে বিএনপি সরকার শিক্ষাক্রমে ক্রীড়া শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি তারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে 'ট্যালেন্ট হান্ট' কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দিয়েছে। তরুণদের মাদক ও গ্যাজেট আসক্তি থেকে দূরে রাখতে দলটির ক্রীড়া রূপরেখায় এসব পরিকল্পনা রয়েছে। ইউজিসি সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলাধুলার প্রসার ও এটিকে পেশা হিসেবে নিতে বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে থাকে। গবেষণা নেই বললে চলে। গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে ইউজিসির কেমন ভূমিকা রাখতে পারে?
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন: আমি মনে করি, দেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শিক্ষার গুণগত মান এবং গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি। গত ১৭ বছর দেশে ক্ষয়িষ্ণু এবং ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ও শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

গবেষণা না থাকার বিষয়টি আমি এভাবে বলতে চাই না। দেশে অনেক ভালো গবেষণা হচ্ছে। তবে আমাদের সক্ষমতা ও সম্ভাবনার তুলনায় গবেষণার পরিমাণ এবং প্রভাব দুটোই কম। এর অন্যতম কারণ গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরে সীমিত বিনিয়োগ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব এবং গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়নি। 

ইউজিসির প্রধান দায়িত্ব হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও শিক্ষার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, গবেষণা অনুদান বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানো এবং গবেষণার ফলাফলকে জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণার মান মূল্যায়নের জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ড. মামুন

শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রেও ইউজিসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাঠক্রমকে যুগোপযোগী করা, মান নিশ্চিতকরণ কার্যক্রম জোরদার করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া গ্র্যাজুয়েটরা যেন চাকরির বাজার ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

বর্তমানে ইউজিসির ‘হায়ার এডুকেশন অ্যাকসিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট)’ এবং ‘আইসিএসইটিইপি’ প্রকল্প উচ্চশিক্ষার রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে গবেষণা সক্ষমতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।

আমার বিশ্বাস, শুধু গবেষণার বাজেট বাড়ালেই হবে না; সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার, জবাবদিহি এবং গবেষণার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে গবেষণামুখী, বিজ্ঞানমনস্ক এবং উদ্ভাবনী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করতে পারলে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে।

ওভার মার্কিং নাকি আন্ডার মার্কিং— বদলাচ্ছে ঢিলেঢালা খাতা মূ…
  • ২৫ জুন ২০২৬
ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপে স্নাতকোত্তর-পিএইচডির সুযোগ সৌদি আরবে…
  • ২৫ জুন ২০২৬
লক্ষ্মীপুরে হত্যাকাণ্ডের শিকার সায়মা ঢাবি শিক্ষার্থী নয়
  • ২৫ জুন ২০২৬
স্কুল ফাঁকি দিয়ে ইউএনও’র হাতে ধরা, ৪ ছাত্রকে করতে হবে ৮০০ ব…
  • ২৫ জুন ২০২৬
মিস্ত্রী সেজে ঘরে ঢোকেন, গেট আটকানো মাত্রই  হামলা— যেভাবে এ…
  • ২৫ জুন ২০২৬
ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, মাদ্রাসা পরিচালকের ১০ বছরের সাজা ও জর…
  • ২৫ জুন ২০২৬