সাক্ষাৎকার

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান, গবেষণা-উদ্ভাবনে মনোযোগ দিলে র‍্যাঙ্কিংয়ে অগ্রগতি স্বাভাবিকভাবেই আসবে

অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন

অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন © টিডিসি ফটো

অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন। গত ২৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের এই অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে নিয়োগ...
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইরফান এইচ সায়েম
আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬, ০৭:০৬ PM

অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন। গত ২৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের এই অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তিনি আগামী চার বছরের জন্য এই দায়িত্ব পালন করবেন। ড. মামুন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ হাডার্সফিল্ড এর অর্থনীতি, অর্থায়ন এবং হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। 

তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জাপানিজ স্টাডিজ, উন্নয়ন পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা, উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সহায়তা কার্যকারিতা, উন্নয়ন সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান। গবেষণা ও প্রকাশনায়ও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। ড. মামুনের প্রকাশিত বই, বইয়ের অধ্যায় ও গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ৫০টির বেশি। তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি স্প্রিঙ্গার, রাউটলেজ, প্যালগ্রেভ ম্যাকমিলান এবং এমেরাল্ডের মতো খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা থেকে তাঁর বই ও বইয়ের অধ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। দেশের শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষা নিয়ে তাঁর ভাবনাসহ শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটির আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব—

আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেরা ৫০০’র তালিকায় নেই। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী?
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন: আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এখনও ধারাবাহিকভাবে সেরা ৫০০-এর মধ্যে জায়গা করে নিতে পারেনি। এটি অবশ্যই আমাদের জন্য সুখকর বিষয় নয়। তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং মূলত শিক্ষা, গবেষণা, আন্তর্জাতিকীকরণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, গবেষণার উদ্ধৃতি (সাইটেশন) এবং নিয়োগদাতাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের মতো বিভিন্ন সূচকের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। এসব ক্ষেত্রে আমাদের উন্নতির সুযোগ রয়েছে।

আমার মতে, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে গবেষণায়। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্যের পেছনে শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতি কাজ করে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও মানসম্পন্ন গবেষণা, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা এবং গবেষণার বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে হবে। গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত উন্নত করতে হবে, আধুনিক গবেষণাগার ও একাডেমিক সুবিধা বাড়াতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ করতে হবে। বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আকর্ষণের জন্যও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ আন্তর্জাতিকীকরণ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

নিজ কার্যালয়ে ড. মামুন

পাঠক্রমকেও আরও যুগোপযোগী ও গবেষণামুখী করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিল্প খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারলে গবেষণার মান ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

ইউজিসি এ ক্ষেত্রে নীতি সহায়তা, মান নিশ্চিতকরণ, গবেষণা অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে ‘হায়ার এডুকেশন অ্যাকসিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট)’ প্রকল্পসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী দিনে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে আরও ভালো অবস্থানে যেতে পারবে।

আমার বিশ্বাস, র‍্যাঙ্কিংকে লক্ষ্য না করে যদি আমরা শিক্ষার মান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক মানের একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিই, তাহলে র‍্যাঙ্কিংয়ে অগ্রগতি স্বাভাবিকভাবেই আসবে।

সম্প্রতি ইউজিসি আয়োজিত "বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষা রূপান্তর: টেকসই উৎকর্ষতার রোডম্যাপ" শীর্ষক একটি জাতীয় দেশের উচ্চশিক্ষার রুপান্তর এবং র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নয়নে বহুমাত্রিক পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এগুলোকে গুরুত্বের সাথে বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রথম সারির কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অধিকাংশে শিক্ষার মান নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা রয়েছে। সেগুলোর মানোন্নয়নে ইউজিসির পরিকল্পনা কী হতে পারে?
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন: বর্তমানে দেশে ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১০৭টিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, আর ৬১টি বিশ্ববিদ্যালয় এখনও অস্থায়ী ক্যাম্পাসে রয়েছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। তবে এটাও সত্য যে কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, গবেষণা কার্যক্রম, শিক্ষকসংখ্যা এবং অবকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ড. মামুন

আমার মতে, এখন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের চেয়ে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমেই দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক সক্ষমতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, গবেষণা কার্যক্রম, অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা দরকার। এর ভিত্তিতে কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় পিছিয়ে আছে, তা চিহ্নিত করে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

ইউজিসির অন্যতম দায়িত্ব হবে মান নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়মিত একাডেমিক ও প্রশাসনিক মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে। স্থায়ী ক্যাম্পাস, পর্যাপ্ত পূর্ণকালীন শিক্ষক, গবেষণার পরিবেশ, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং গ্রন্থাগারের মতো মৌলিক শর্তগুলো কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে পাঠক্রমকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। তাই শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা, ইন্টার্নশিপ, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে।

গবেষণার সংস্কৃতিও জোরদার করা প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রম সীমিত। গবেষণা অনুদান, যৌথ গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে এ পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব।

আমি মনে করি, ইউজিসির লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু নিয়মকানুন প্রয়োগ করা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করা। জবাবদিহি, মান নিশ্চিতকরণ এবং ধারাবাহিক উন্নয়ন—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে পারলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে এবং তারা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

দেশে নতুন নতুন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ও গবেষণা নিশ্চিত করতে পারছে না? এভাবে অনুমোদন দেওয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন।
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন: উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোই উচ্চশিক্ষার উন্নয়নের একমাত্র সূচক হতে পারে না।

বাস্তবতা হলো, দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা কার্যক্রম, অবকাঠামো এবং দক্ষ শিক্ষকসংখ্যা সেই হারে বৃদ্ধি পায়নি। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও পর্যাপ্ত শিক্ষক, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, আবাসন ও একাডেমিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। ফলে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের শিক্ষা বাজেট বৃদ্ধির পরিকল্পনা এ সমস্যাগুলোর সমাধানে ভূমিকা রাখবে।

ড. মামুন

আমার মতে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনভিত্তিক ও সক্ষমতাভিত্তিক পরিকল্পনা থাকা উচিত। কোনো অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন রয়েছে কিনা, প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত ও আর্থিক সক্ষমতা কতটুকু, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না—এসব বিষয় গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মান নিশ্চিত না করে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে উচ্চশিক্ষার জন্য সুফল বয়ে আনবে না।

এ ক্ষেত্রে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আগে সরকার ইউজিসির মতামত গ্রহন করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরে ইউজিসি’র কাজ হবে মান নিশ্চিতকরণ, নিয়মিত তদারকি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান, গবেষণা সক্ষমতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগসহ বিভিন্নক্ষেত্রে স্বচ্চতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণায় আগ্রহ কম। সেটা কী তাদের অনীহা নাকি সুযোগ-সুবিধার অভাব? আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন: আমি বিষয়টিকে শুধু শিক্ষকদের অনীহা বলে দেখতে চাই না। বাস্তবতা হলো, গবেষণার ক্ষেত্রে একাধিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও পর্যাপ্ত গবেষণাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি, গবেষণা সহকারী, আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে গবেষণার জন্য যে ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন, তা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সমানভাবে নেই।

তবে এটাও সত্য যে গবেষণা মূলত একটি মানসিকতা ও একাডেমিক সংস্কৃতির বিষয়। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে গবেষণার প্রতি প্রত্যাশিত আগ্রহ দেখা যায় না। আবার অনেক শিক্ষক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করে প্রশংসা অর্জন করছেন। ফলে বিষয়টিকে একক কোনো কারণে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

আমার অভিজ্ঞতায় বলে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের ওপর পাঠদান, পরীক্ষা, প্রশাসনিক কাজ এবং বিভিন্ন কমিটির দায়িত্বের চাপ অনেক বেশি। ফলে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে গবেষণার ফলাফলকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন ও উৎসাহিত করার ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

আমি মনে করি, গবেষণাকে আরও আকর্ষণীয় ও ফলপ্রসূ করতে হলে একদিকে যেমন অবকাঠামো, অর্থায়ন ও গবেষণা সহায়তা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে গবেষণার গুণগত মানকে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং একাডেমিক স্বীকৃতির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনা, গবেষণার প্রভাব এবং উদ্ভাবনী অবদানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ড. মামুন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলা। শিক্ষক গবেষণায় সক্রিয় হলে শিক্ষার্থীরাও গবেষণার প্রতি আগ্রহী হবে। একটি গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয়ই পারে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে এবং দেশের উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখতে। তাই আমি মনে করি, এটি শুধু সুযোগ-সুবিধার প্রশ্ন নয়, বরং সুযোগ, প্রণোদনা এবং গবেষণাবান্ধব সংস্কৃতির সমন্বিত একটি বিষয়।

উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ১৯৪ কোটি টাকা এবং ইউজিসির জন্য ২৫ কোটি টাকাসহ মোট বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়ে ২১৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। আইসিএসইটিইপি প্রকল্পের আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে ২০টি ইন্ডাস্ট্রি-ইউনিভার্সিটি কোলাবোরেটিভ রিসার্চ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে, যার মোট বরাদ্দ ৩৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। অন্যদিকে, হিট প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ১৮০টি সাব-প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে, যার জন্য মোট ৬৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, সরকারের ধারাবাহিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা এবং ইউজিসির সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এই উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানভিত্তিক সমাজ, উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি এবং স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।

ইউজিসির এতো কম জনবল দিয়ে প্রায় ১৭০টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করা কী সম্ভব? এজন্য কাজের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়, নাকি কোনো সমস্যা হয় না?
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন: বাস্তবতা হলো, বর্তমানে ইউজিসির বিদ্যমান জনবল ও অবকাঠামো দিয়ে দেশের প্রায় ১৭০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম তদারকি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চশিক্ষা খাত গত দুই দশকে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে ইউজিসির সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি। ফলে কাজের চাপ স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেড়েছে।

আমি বলব না যে কাজ থেমে যাচ্ছে বা ইউজিসি তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। তবে সীমিত জনবল নিয়ে এত বড় একটি খাত পরিচালনা করতে গিয়ে কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে একই কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। নিয়মিত দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন, নীতিনির্ধারণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন, গবেষণা কার্যক্রম, সভা-সমাবেশ এবং বিভিন্ন জরুরি বিষয় সামলাতে হয়।

এ অবস্থায় অনেক কর্মকর্তা নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরেও কাজ করেন। অনেক সময় সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও দায়িত্ব পালন করতে হয়। আমি যোগদানের পর দেখেছি, ইউজিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের এই প্রচেষ্টার কারণেই কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।

তবে এটাও সত্য যে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চশিক্ষা খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় ইউজিসির জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। মান নিশ্চিতকরণ, গবেষণা তদারকি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল অপরিহার্য।

আমার মতে, উচ্চশিক্ষার বর্তমান বাস্তবতায় ইউজিসির সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি সময়ের দাবি। একটি শক্তিশালী ও দক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছাড়া উচ্চশিক্ষার গুণগত উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তাই ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনায় ইউজিসির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ আইন দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

শনিবার টানা ৮ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব জেলায়
  • ২৬ জুন ২০২৬
ভেনেজুয়েলা: ছেলেকে খুঁজতে খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ খুঁড়েই যাচ্ছ…
  • ২৬ জুন ২০২৬
স্কুল কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে প্রধান শিক্ষককে জুতাপেটার অভিযোগ…
  • ২৬ জুন ২০২৬
আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, গ্রেপ্তার ৫
  • ২৬ জুন ২০২৬
পরীক্ষা শেষে আটক তিতুমীর ছাত্র নাজিম কারাগারে
  • ২৬ জুন ২০২৬
বিশ্বকাপ ফুটবলে গোলের বন‍্যা, গ্রুপ পর্বেই গতবারকে টপকে গেল…
  • ২৬ জুন ২০২৬