ম্যাচের কাঠি আর রেশমি সুতার সুনিপুণ বুননে রূপ নিচ্ছেন দেবী দুর্গা © টিডিসি
শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের প্রতিটি প্রতিমা শিল্পালয়ে এখন তুঙ্গে কারিগরদের ব্যস্ততা। তবে কাদা-মাটি, বাঁশ কিংবা খড়ের পরিচিত ফ্রেম পেরিয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর দুর্গা মন্দিরে গড়ে তোলা হচ্ছে এক অনন্য বিস্ময়। ম্যাচের কাঠি আর রেশমি সুতার সুনিপুণ বুননে রূপ নিচ্ছেন দেবী দুর্গা।
সাধারণত দিয়াশলাই বা ম্যাচের কাঠি বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আগুনের উত্তাপ। অথচ সেই কাঠিকেই ভক্তির নান্দনিক অলংকার বানিয়ে ফেলেছেন ভাস্কর নবদ্বীপ সরকার ও তার তিন সহযোগী কারিগর। দেবীর পুরো শরীরের অবয়ব গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় ১০ কেজি রেশমি সুতা দিয়ে, যা কাদা-মাটির সূক্ষ্মতার রূপ ফুটিয়ে তুলেছে। আর দেবীর রাজকীয় পোশাক, বক্ষচ্ছদ ও হাতের অলঙ্করণ তৈরি হয়েছে দেড় লাখেরও বেশি নীল-মাথার দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে।
কারিগর নবদ্বীপ সরকার জানান, ২০২৩ সালে ভারতের একটি শিল্প কারখানা থেকে তিনি এই বিশেষ কাঠামোর কাজ শেখেন। দীর্ঘ এক মাসের টানা শ্রমে রূপ নেওয়া এই প্রতিমা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার জানামতে দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার নিখুঁত মেলবন্ধনে প্রতিমা তৈরির ঘটনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম। অনেকের মনে অগ্নিকাণ্ডের ভয় থাকতে পারে, কিন্তু কাঠিগুলো খোলা বাতাসে দীর্ঘদিন থাকায় এর বারুদ কার্যকারিতা হারায়। এছাড়া বাড়তি নিরাপত্তার জন্য আমরা এর ওপর বিশেষ মেডিসিনের কেমিক্যাল প্রলেপ দিয়েছি, ফলে এতে আগুন লাগার বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নেই।
স্থানীয় পূজা মণ্ডপে প্রতি বছরই নতুন কিছু উপহার দেওয়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা জয়দেব দত্ত জানান, ভারতে যেমন বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভিন্নধর্মী থিম বা উপাদান ব্যবহার করা হয়, ঠিক সেই আদলেই ব্রহ্মরাজপুরে এই সৃজনশীলতার বিকাশ। গত বছর ধানের শীষ ও ধান দিয়ে প্রতিমা তৈরি করে পুরো এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল এই মন্দিরটি।
পূজা উদযাপন কমিটির ক্যাশিয়ার অমিত ঘোষ জানান, গত বছরের উপচে পড়া জনস্রোত এবং দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহের কথা বিবেচনা করেই এবার নতুন চিন্তার সূচনা। কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা বাজেটে নবদ্বীপ সরকারের ভাস্কর দলকে এই প্রতিমা নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মণ্ডপে প্রতিমার নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই দূর-দূরান্ত থেকে উৎসুক মানুষ ছুটে আসছেন এটি এক নজর দেখতে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ জানান, ঐতিহ্যবাহী জেলা সাতক্ষীরায় প্রতি বছরই উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসব পালিত হয়। শুধু সাতক্ষীরা সদরের পুরাতন সাতক্ষীরা মায়ের বাড়িতেই ১০০টিরও বেশি প্রতিমা নিয়ে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুরের এই ‘ম্যাচ-কাঠির দুর্গা’ দেখতে এবার শুধু সাতক্ষীরা নয়, পুরো দেশ থেকেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দর্শনার্থীদের ঢল নামবে।
পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে, গত বছর জেলায় ৫৮৭টি মণ্ডপে উদযাপিত হলেও এবার মণ্ডপের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। মণ্ডপগুলোতে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে শতভাগ মন্দিরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ কঠোর নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিতের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।