শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন কথা বলছেন © জনসংযোগ
দেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে উন্নত বিশ্বের আদলে একটি পোস্টগ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তিনি বলেছেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো পোস্টগ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠেনি। অথচ প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে বিশ্বমানের গবেষণা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীও উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
আজ শনিবার (২২ আগস্ট) সাভারের ব্র্যাক সিডিএমে দুই দিনব্যাপী ‘উপাচার্যদের সংলাপ’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) বাস্তবায়নাধীন হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জেড এন তাহমিদা বেগম এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে একটি পোস্টগ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উন্নত বিশ্বের আদলে গড়ে তুলতে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।
তিনি বলেন, মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। আগামী বছর তা ৩ শতাংশ এবং পর্যায়ক্রমে ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করতে হবে। নতুন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, দেশে এমন কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলো মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে পারছে না। এসব বিশ্ববিদ্যালয় চিহ্নিত করতে ইউজিসিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় সরকার এখনই মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বর্তমান সরকার নতুন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়নি উল্লেখ করে তিনি মানসম্মত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে ইউজিসিকে নির্দেশ দেন।
গবেষণা খাতে বর্তমান বরাদ্দ অপ্রতুল উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গবেষণার পরিবেশ ও অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইউজিসি কাজ করবে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষাবাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য তাদের ৩৫ বিলিয়ন ডলারের শিক্ষাবাজার ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করেই তারা এ বাজার গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশকেও বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করার মতো মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি রিসার্চ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার কম হওয়ার কারণ চিহ্নিত করারও পরামর্শ দেন।
সভাপতির বক্তব্যে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, সরকারের অগ্রাধিকারমূলক খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ইউজিসি কাজ করছে। উচ্চশিক্ষার চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলপত্রের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে এটি চূড়ান্ত করা হবে।
তিনি বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন স্নাতক তৈরি উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এজন্য পাঠ্যক্রম আধুনিকায়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, দলগতভাবে কাজ করা ও নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তাঁদের মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষার্থীদের শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের বাস্তব কর্মপরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করতে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, এ কার্যক্রমে ইউজিসি সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে। ইন্টার্নশিপ চলাকালে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। গবেষণার গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে হবে। গবেষণার ফল দেশের অর্থনীতি, শিল্পখাত ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে।
সংলাপের দ্বিতীয় দিনে পাঠ্যক্রম সংস্কার, শিক্ষার্থী সহায়তা ও কর্মসংস্থানযোগ্যতা, আর্থিক ও ক্রয় ব্যবস্থাপনা, উচ্চশিক্ষার রূপান্তরে হিট প্রকল্পের ভূমিকা এবং উচ্চশিক্ষার কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে চারটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
অধিবেশনগুলোতে সভাপতি ও আলোচক হিসেবে অংশ নেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব, অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন, অধ্যাপক মো. মেহেদী হাসান খান, অধ্যাপক ড. মো. আসলাম হোসেন এবং অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ চৌধুরী। সংলাপের উন্মুক্ত আলোচনায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং হিট প্রকল্প ও বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাও অংশ নেন।