পৌনে দুইশ কোটি টাকার টেন্ডার
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর © টিডিসি সম্পাদিত
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ১৭৫ কোটি টাকার একটি টেন্ডার নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন’ সংশোধন করে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরিত গেজেটে অধ্যাদেশ জারির আগের দিন ডাকা এই টেন্ডারে আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে অন্যায্য শর্ত আরোপ করার অভিযোগ তুলেছেন বিএনপিপন্থীরা। তাদের অভিযোগ, শর্ত শিথিলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নির্দেশনাও উপেক্ষা করেছে অধিদপ্তর।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইন উপেক্ষা নয়, বরং আইন মেনেই এই টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, নতুন আইন কার্যকর না হওয়ায় সে অনুযায়ী টেন্ডার আহ্বানের সুযোগ এখনও সৃষ্টি হয়নি।
তথ্য বলছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর মাতৃত্বকালীন এবং মাতৃত্ব পরবর্তী প্রায় ২৫ ধরনের জরুরি ওষুধ (ডিডিএস কিট) ক্রয়ের জন্য টেন্ডার আহ্বান করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। পাঁচটি প্যাকেজের এই টেন্ডারে অংশগ্রহণের শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিটি প্যাকেজের জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত একুশ কোটি বারো লক্ষ টাকার ওয়ার্ক এক্সপিরিয়েন্স বা কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যা প্রতি প্যাকেজের মূল অঙ্কের ৬০ শতাংশ। আগামী ১৯ অক্টোবর এই টেন্ডার উত্তোলন করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, টেন্ডারে জুড়ে দেওয়া কাজের অভিজ্ঞতার শর্তের কারণে আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত ঠিকাদাররা এতে অংশ নিতে পারছেন না। বিপরীতে এতে এককভাবে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদাররা সুযোগ পাচ্ছেন। কেননা গত ১৭ বছর তারাই একচেটিয়া কাজ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। তখন বিএনপিপন্থী বা অন্য কোন ঠিকাদার অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি। ফলে অভিজ্ঞতা না থাকার অজুহাতে তারা বাদ পড়ছেন।
এদিকে, ইতোমধ্যে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন সংশোধন করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের শর্ত শিথিলের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ২১ সেপ্টেম্বর গেজেটের মাধ্যমে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ এর অধিকতর সংশোধনকল্পে প্রণীত অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়, যেখানে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর (২৪ নং আইন) ২৫ নং ধারা সংশোধন করে বলা হয়, ‘যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন কোনো শর্ত আরোপ করা যাবে না, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নতুন নিবন্ধিত ব্যক্তি বা নবীন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ সীমিত করে।’
গেজেটটি গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। তবে গেজেটের ১(২) অংশে বলা হয়েছে, সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা যে তারিখ নির্ধারণ করবে, সেই তারিখে এই অধ্যাদেশ কার্যকর হবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি বা বিপিপিএ এই নির্দেশনা দেবে। তখন এটি কার্যকর হবে। যদি টেন্ডার ওপেন হওয়ার আগে হয়ে যায়, তাহলে শর্ত পরিবর্তন করা যাবে— ড. আ ফ ম আরাফাত হোসেন, প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত পরিচালক (ড্রাগস অ্যান্ড স্টোরস), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরিত গেজেটে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন সংশোধনের পরও টেন্ডারে অংশগ্রহণের শর্ত সংশোধন না করায় গত ১ অক্টোবর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের দৃষ্টিগোচর হয়। ওই সময় তিনি তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীকে নির্দেশ দিয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানাকে শর্ত শিথিল করে ওয়ার্ক এক্সপিরিয়েন্স ৬০ শতাংশের পরিবর্তে ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে নির্দেশনা জারি করতে বলেন।
এই কর্মকর্তা বলেন, ডিডিএস কিট প্রকল্পটি আওয়ামী লীগের আমল থেকেই গুটিকয়েক কোম্পানির হাতে বন্দী ছিল। ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদের পতন হলেও সেই সিন্ডিকেট এখনো পুরোদমে ঠিকাদারি কাজ করে যাচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মদতে এই কাজ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এসব বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (ড্রাগস অ্যান্ড স্টোরস) ড. আ ফ ম আরাফাত হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অনুযায়ী, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ওয়ার্ক এক্সপিরিয়েন্স থাকা বাধ্যতামূলক। আমরা কিন্তু বেশি অংশগ্রহণের জন্য সর্বনিম্নটা শর্ত হিসেবে রেখেছি। আমার তো নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নাই।
ডিডিএস কিট প্রকল্পটি আওয়ামী লীগের আমল থেকেই গুটিকয়েক কোম্পানির হাতে বন্দী ছিল। ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদের পতন হলেও সেই সিন্ডিকেট এখনো পুরোদমে ঠিকাদারি কাজ করে যাচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মদতে এই কাজ হচ্ছে—নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা
আইন সংশোধন করে প্রকাশিত অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গেজেটটি গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। তবে গেজেটের ১(২) অংশে বলা হয়েছে, সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা যে তারিখ নির্ধারণ করবে, সেই তারিখে এই অধ্যাদেশ কার্যকর হবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি বা বিপিপিএ এই নির্দেশনা দেবে। তখন এটি কার্যকর হবে। যদি টেন্ডার ওপেন হওয়ার আগে হয়ে যায়, তাহলে শর্ত পরিবর্তন করা যাবে।
আওয়ামী সিন্ডিকেটের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, কোম্পানিগুলোর কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপি বা কে জামায়াত, এগুলো তো আমরা চিনি না। তা ছাড়া আমার কাছে কোনো কোম্পানি এসে ওভাবে বলেওনি বা অভিযোগও দেয়নি যে, এটাকে এত পার্সেন্ট করেন, এটা এত পার্সেন্ট করেন।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. জিন্নাত রেহানা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, গেজেট কার্যকরের প্রজ্ঞাপন জারি হলে আমরাও এটি কার্যকর করতে পারব। যেদিন থেকে গেজেট কার্যকার করা হবে, সেদিন থেকেই আমরা করব।
মহাপরিচালক বলেন, অধ্যাদেশে যেটি আছে, আমরাও তা চাই। আমরা দেশীয় শিল্পের ক্ষেত্রে, দেশীয় উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সুযোগটাকে আরও ফ্লেক্সিবল করতে চাই।