সরকারি টিকিটে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে পরীক্ষা লেখা হয়েছে ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী দিয়ে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা চলছে © টিডিসি সম্পাদিত
ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে সেকমোদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রোগীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা কয়েকজন সেকমোর বিরুদ্ধে টাকা আদায়, অপচিকিৎসা ও অব্যবস্থাপনার নানা অভিযোগ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা।
মহাসড়কের পাশে ফুলপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সব সময় রোগীর চাপ লেগেই থাকে। এ সুযোগে এখানে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো) নানাভাবে অসাধু উপায়ে অর্থ উপার্জন করছেন রোগীদের কাছ থেকে। কয়েকজন সেকমো সিন্ডিকেট করে জরুরি বিভাগের অভিজ্ঞ ইনচার্জ আনোয়ার হোসেনকে চাপে ফেলে বদলি করা হয়। নতুন ইনচার্জ হিসেবে রুবেল মিয়াকে আনা হয়। এর পর থেকে সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করছেন জরুরি বিভাগ। যেন দেখার কেউ নেই।
জানা যায়, প্লাস্টার, সেলাই, বেন্ডিস ও ড্রেসিং করলে টাকা দিতে হয় বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ । টাকা না দিলে প্লাস্টার খুলে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়, এমন জনশ্রুতি রয়েছে।
বিষ খেয়ে কোন রোগী এলে ওয়াশ করা পর টাকা দিতে হয়! তা ছাড়া জরুরি বিভাগের কাজ ফেলে সুন্নতে খৎনা ও অন্যান্য জটিল অস্ত্রোপচার টাকার বিনিময়ে হরহামেশাই করে থাকেন সেকমোরা। একজন সার্জারি বিশেষজ্ঞ বলেন, এরা চিকিৎসক নয়, চিকিৎসকের সহকারী। তাহলে অস্ত্রোপচার করেন কীভাবে? এটা অপচিকিৎসা।
জরুরি বিভাগে ১৮ বছর ধরে সেকমো পদে মফিজুর রহমান (মাহিন), বাবুল খান, আনোয়ার হোসেন, লুৎফর রহমান, অনন্ত কুমার, হালিমা খাতুন এবং ৬-৭ বছর ধরে মিজানুর রহমান, রুবেল মিয়া ও সাব্বির হোসেন কর্মরত। তাদের মধ্যে মফিজুর রহমানকে ভ্রাম্যমাণ আদালত প্যাথলজির এক দালালের সঙ্গে আটক করেন। পরে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান। তারপরও বদলি করা হয়নি। অনেকের পোস্টিং ইউনিয়নের উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানে না গিয়ে জরুরি বিভাগে ডিউটি করেন।
জরুরি বিভাগের ৫ টাকার ব্যবস্থাপত্র ১০ টাকা দিতে হয়। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন ১০০ থেকে ৩০০ ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়। তা ছাড়া খাতায় এন্ট্রি না করে ব্যবস্থাপত্রে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে সরকারি টাকা আত্মসাৎ, এক রোগীকে দিয়ে সুতা আনিয়ে অব্যবহৃত সুতা রেখে, ওই সুতা আরেক রোগীর কাছে বিক্রিও করেন।
নতুন ইনচার্জ জরুরি বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে অজ্ঞ। সঠিকভাবে পরিচালনার অভাবে অব্যবস্থাপনায় জরুরি বিভাগ এখন নিজেই রোগী। দুর্গন্ধ সব সময় লেগেই থাকে। জরুরি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ব্যবহার হয় না, আলমিরাতে তালাবদ্ধ থাকে। নিয়মানুযায়ী সার্জারি যন্ত্রপাতি একবার ব্যবহার করলে স্টেরিলাইজার মেশিনে জীবাণুমুক্ত করার কথা। কিন্তু কোনো যন্ত্রপাতি এক সপ্তাহেও জীবাণুমুক্ত করা হয় না। এক সিরিঞ্জ একাধিকবার ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এমন একটি সংবাদ সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এতে নেটিজেন ও ভুক্তভোগীরা জরুরি ভিত্তিতে তাদের বদলির দাবি জানিয়ে বলেন, এদের কমবেশি দালাল আছে। হাসপাতালের নাকের ডগায় চেম্বার করে। এরা ভালো ব্যবহার শিখেনি। গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে জোকের মতো চুষে খাচ্ছে।
ভাইরাল হওয়ার পর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাহাত চৌধুরী সেকমোদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে সেকমোদের সতর্ক করেছেন বলে জানা গেছে। এর আগে মফিজুর, মিজান, সাব্বিরসহ কয়েকজন সেকমোকে অনিয়মের অভিযোগে শোকজও করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে জরুরি বিভাগের ইনচার্জ রুবেল মিয়া বলেন, ‘স্যার আমাকে ইনচার্জ থেকে বাদ দেন, আমার কথা কেউ শুনে না।’
এ ব্যাপারে ইনচার্জ রুবেল মিয়া বলেন, ‘স্টেরিলাইজার মেশিন নামানো হয়েছে।’ এত দিন আলমিরাতে তালাবদ্ধ ছিল কেন? এই প্রশ্নে তিনি চুপ থাকেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাহাত চৌধুরী বলেন, ‘অনিয়ম রুখতে আমি তৎপর। ভাইরাল বিষয় নিয়ে সিভিল সার্জনকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে।’
বদলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বদলির বিষয়টিও সিভিল সার্জন দেখেন।