সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল © সংগৃহীত
টানা ২২ মাস ধরে বেতন-ভাতা না পেয়ে কর্মবিরতি শুরু করেছেন দেশের একমাত্র সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৩৭ জন শিক্ষক ও চিকিৎসক। গত ১০ মে থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির কারণে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম ও চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। একদিকে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে ঢাকার মিরপুরের এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত রোগী।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ভুক্তভোগী ৩৭ জন শিক্ষক ও চিকিৎসক মূলত বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে নবম গ্রেডে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাদের কেউ কেউ দীর্ঘ ৬ থেকে ১২ বছর ধরে এখানে কর্মরত। চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে তাদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
তারা বলছেন, দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে আর্থিক অনটন ও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা পাঠদান, প্রশাসনিক কাজ ও চিকিৎসাসেবা সচল রেখেছিলেন। তবে দফায় দফায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান না আসায়, শেষ পর্যন্ত দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর তারা এই কর্মবিরতির পথ বেছে নেন।
আরও পড়ুন: আবাসন সুবিধা না থাকায় ক্লাস শুরুর ৫ দিনের মাথায় বাড়ি যেতে হলো নবীন শিক্ষার্থীদের
আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী মেডিসিন বিভাগের তথ্যমতে, ১৯৯৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে নতুন কোনো স্থায়ী পদ সৃষ্টি কিংবা নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত এই প্রকল্পভিত্তিক জনবলকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর না করায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে কলেজটিতে এই দুই বিভাগে আরও ৩৬টি পদ শূন্য রয়েছে। বিপরীতে ক্যাডারভুক্ত ২০ জন এমবিবিএস চিকিৎসক ও ১০ জন মেডিকেল অফিসার কর্মরত থাকায় তাদের বেতন নিয়ে কোনো সমস্যা না হলেও, হাসপাতালের মূল কার্যক্রম পরিচালিত হতো এই প্রকল্পভিত্তিক চিকিৎসকদের মাধ্যমেই।
এদিকে হঠাৎ এই অচলাবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কলেজের শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাচেলর অব আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (বিএএমএস) এবং ব্যাচেলর অব ইউনানী মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (বিইউএমএস) কোর্সে প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। তাদের চলমান ফাইনাল ভাইভাসহ নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যাওয়ায় সেশনজটের তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: নবীন ছাত্রদের সিট দিচ্ছেন ছাত্রদল নেতারা, দপ্তর সম্পাদক বললেন— ‘আমি তোমাদের এক্টিং প্রভোস্ট’
ভুক্তভোগী শিক্ষক ও চিকিৎসকদের দাবি, অনতিবিলম্বে তাদের বকেয়া ২২ মাসের বেতন পরিশোধ করতে হবে এবং প্রকল্পভিত্তিক পদগুলো দ্রুত রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করতে হবে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলছেন, কর্তৃপক্ষ যদি তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতিও দিতে চায়, তবে যেন দ্রুত বকেয়া পরিশোধ করে সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়।
সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. মকছেদ আলী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের এখানে কর্মকর্তা যারা আছে, ডাক্তার-চিকিৎসক-শিক্ষক, আমরা ২২ মাসের বেতন পাচ্ছি না। গত ১০ মে থেকে আমরা কর্মবিরতিতে আছি। মূলত প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পরে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি সরকার, সেজন্য আমাদেরকে কর্মবিরতিতে যেতে হয়েছে।
সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. রাশিদুজ্জামান খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের কলেজের ২০ জন শিক্ষক এবং হাসপাতালের ১৭ জন চিকিৎসক প্রকল্পের অধীনে চাকরি পেয়েছিলেন। এখন প্রজেক্টের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়ে গেছে। এরপর উচ্চতর মহল থেকে কোনো আশ্বাস এই শিক্ষক-চিকিৎসকরা পাননি, তবুও আবার শুরু হবে এমন আশায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ইতোমধ্যে ২২ মাস পার হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, যাদের সমস্যা হচ্ছে, তারাই মূলত শাস্ত্রীয় ডাক্তার। তারা যদি প্রতিষ্ঠানে না আসে, তাহলে আমার মাত্র চারজন থাকবে এখানে— দুজন শিক্ষক, দুজন ডাক্তার। শুধুমাত্র তাদের তাদের দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব না।