শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম © এআই সম্পাদিত
শিশুদের হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাব তুলে দেওয়া নিয়ে অভিভাবকদের চিন্তার শেষ নেই। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা প্রচলিত, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুম, আচরণ এবং মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে নতুন একাধিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। গবেষকদের একাংশের মতে, শুধু কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নয়-শিশু কী দেখছে, কী উদ্দেশ্যে দেখছে এবং তার দৈনন্দিন জীবনযাপন কেমন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি স্ক্রিন টাইমের ক্ষতি নিয়ে প্রচলিত অনেক ধারণার পক্ষে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণও মেলেনি।
যুক্তরাজ্যের বাথ স্পা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক পিট এটচেলস দীর্ঘদিন ধরে স্ক্রিন টাইম ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক শত শত গবেষণা বিশ্লেষণ করেছেন। তার দাবি, স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হয় এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রচলিত অনেক ধারণা দুর্বল বা সীমাবদ্ধ গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।
২০২১ সালে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণেও একই ধরনের চিত্র উঠে আসে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৩৩টি গবেষণা পর্যালোচনা করে গবেষকেরা দেখেছেন, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও গেমের ব্যবহার শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যে তুলনামূলকভাবে খুব কম প্রভাব ফেলে।
গবেষণায় সীমাবদ্ধতা
গবেষকদের মতে, স্ক্রিন টাইম নিয়ে বেশির ভাগ গবেষণাই শিশু-কিশোরদের নিজের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ তারা নিজেরাই কতক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করেছে এবং তাতে কেমন অনুভব করেছে, তা জানিয়েছে। ফলে এসব তথ্য সব সময় পুরোপুরি নির্ভুল নাও হতে পারে। এ ছাড়া দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেই যে একটি অন্যটির কারণ, তা নয়। গবেষকদের ভাষায়, গ্রীষ্মকালে যেমন আইসক্রিম বিক্রি ও ত্বকের ক্যানসার—দুটিই বাড়ে, কিন্তু একটির জন্য অন্যটি দায়ী নয়। স্ক্রিন টাইমের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রযোজ্য।
অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্নতা বা উদ্বেগে ভোগা তরুণদের মধ্যে বেশি স্ক্রিন ব্যবহারের পাশাপাশি একাকীত্বও বেশি ছিল। পরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, মানসিক সমস্যার পেছনে একাকীত্বই বড় ভূমিকা রেখেছে।
সব স্ক্রিন কী এক?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পড়াশোনা, নতুন কিছু শেখা বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য স্ক্রিন ব্যবহার আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীনভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করা এক বিষয় নয়। তাই সব ধরনের স্ক্রিন ব্যবহারের প্রভাবও এক রকম হয় না। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী প্রায় ১১ হাজার ৫০০ শিশুর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় মস্তিষ্কের কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও স্ক্রিন টাইমের সঙ্গে মানসিক সুস্থতা বা চিন্তাশক্তি কমে যাওয়ার কোনো স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
তবে সব গবেষক একই মত পোষণ করেন না। যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিন টুয়েঞ্জ মনে করেন, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তার পরামর্শ, যতটা সম্ভব দেরিতে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া উচিত।
২০২৪ সালে ডেনমার্কে পরিচালিত একটি ছোট গবেষণায় দেখা যায়, দুই সপ্তাহের জন্য শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমিয়ে দিলে তাদের কিছু মানসিক উপসর্গ কমে এবং ইতিবাচক সামাজিক আচরণ কিছুটা বাড়ে। তবে গবেষকেরা এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।
অনলাইন ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা
স্ক্রিন টাইমের প্রভাব নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে প্রায় সব গবেষক একমত। অনলাইনে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট, অপরিচিত ব্যক্তির প্রলোভন, সাইবার বুলিংসহ বিভিন্ন ঝুঁকি বাস্তব। তাই শিশু কী দেখছে এবং কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের নজর রাখা জরুরি।
বর্তমানে শিশুদের জন্য স্ক্রিন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে একক কোনো নির্দেশনা নেই। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য স্ক্রিন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে। আর চার বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বদলে শিশুদের নিরাপদ, ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত করে তোলাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
সূত্র: বিবিসি