ঘুম নিয়ে নতুন গবেষণা © সংগৃহীত
ঘুম কম বা বেশি—দুই ক্ষেত্রেই শরীরের বার্ধক্য দ্রুত বাড়তে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি আরভিং মেডিকেল সেন্টার পরিচালিত এ গবেষণায় মানবদেহের বিভিন্ন জৈবিক ঘড়ি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অপর্যাপ্ত কিংবা অতিরিক্ত ঘুম মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাসহ শরীরের একাধিক অঙ্গের বয়স দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষণার প্রধান এবং জুনহাও ওয়েন বলেন, আগের গবেষণাগুলোতে ঘুমের সঙ্গে বার্ধক্য ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগগত জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল। তবে নতুন এই গবেষণায় দেখা গেছে, খুব কম বা খুব বেশি ঘুম শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের দ্রুত বার্ধক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি প্রমাণ করে, মস্তিষ্ক ও শরীরের সমন্বিত কার্যক্রম, বিপাকীয় ভারসাম্য এবং সুস্থ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখতে ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যারা দিনে ছয় ঘণ্টার কম অথবা আট ঘণ্টার বেশি ঘুমান, তাদের শরীরে দ্রুত বার্ধক্যের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। বিপরীতে, প্রতিদিন ৬ দশমিক ৪ থেকে ৭ দশমিক ৮ ঘণ্টা ঘুমানো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বার্ধক্যের হার সবচেয়ে কম ছিল। শুধু ঘুমের সময়কালই সরাসরি অঙ্গের বার্ধক্যের কারণ নয়। বরং অতিরিক্ত বা অপর্যাপ্ত ঘুম সামগ্রিক শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ ঘুমের সময় মস্তিষ্ক বিপাকীয় বর্জ্য পরিষ্কার করে, শরীরের হরমোনের ভারসাম্য পুনঃস্থাপিত হয়, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনর্গঠিত হয় এবং হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস দৈনন্দিন চাপ থেকে পুনরুদ্ধার হওয়ার সুযোগ পায়। এসব প্রক্রিয়া শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা অভ্যন্তরীণ বার্ধক্যের গতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. মেনগার বলেন, ঘুম ছয় ঘণ্টার নিচে নেমে গেলে শরীর দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মধ্যে থাকে। এতে প্রদাহ বাড়ে, রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়, শ্বাসপ্রশ্বাসের গুণগত মান খারাপ হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত ঘুমও শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
আরও পড়ুন: অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেবে সরকার, আবেদন শুরু কাল
তার মতে, অতিরিক্ত ঘুমকে অলসতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। অনেক সময় এটি শরীরের গভীর কোনো সমস্যার সংকেত দেয়। বিশেষ করে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া, স্থূলতা, থাইরয়েডের সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ, বিষণ্নতা বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে শরীরের ঘুমের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে ঘুমের সময় বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয় এবং গভীর আরামদায়ক ঘুম ব্যাহত হয়। ফলে অনেকে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়েও ক্লান্ত বোধ করেন।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, তরুণদের ক্ষেত্রেও অনিয়মিত ঘুম নীরবে শারীরিক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। অনেক তরুণ ক্যাফেইন, ব্যায়াম বা দৈনন্দিন রুটিনের মাধ্যমে ঘুমের ঘাটতি সামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বিপাকীয় কার্যক্রম, হরমোন নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ফুসফুসের পুনরুদ্ধার এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে অনেক তরুণের মধ্যে ক্লান্তি, উদ্বেগ, মনোযোগ কমে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ওজন বৃদ্ধি এবং ইনসুলিন প্রতিরোধের মতো সমস্যা দেখা যাচ্ছে, যার পেছনে দীর্ঘদিনের অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ডা. মেনগার বলেন, মাঝে মাঝে ঘুম কম হওয়া শরীর সহ্য করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ব্যাঘাত ধীরে ধীরে জৈবিক চাপ বাড়িয়ে তোলে। বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ঘুমকে আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঘুমের ভারসাম্যহীনতা এখন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, বিষণ্নতা, হৃদযন্ত্রের অনিয়মিত স্পন্দন, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো বড় বড় দীর্ঘমেয়াদি রোগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ ঘুম মানে শুধু আট ঘণ্টা বিছানায় থাকা নয়; বরং নিয়মিত সময় মেনে নিরবচ্ছিন্ন ও আরামদায়ক ঘুম নিশ্চিত করা। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমই সবচেয়ে উপযোগী বলে মনে করেন।
এ ছাড়া ঘুমের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার ওপরও জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা রাত জেগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কমানো, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল গ্রহণ কমানো এবং নাক ডাকা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যার দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
সতর্কীকরণ: এই আর্টিকেলটি সর্বজনীন তথ্য এবং/অথবা আমাদের সাথে কথা বলা বিশেষজ্ঞদের তথ্যের উপর ভিত্তি করে লেখা। যেকোনো রুটিন শুরু করার আগে সর্বদা আপনার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করুন।