প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
নতুন বছর শুরু হয়ে ইতোমধ্যে এক সপ্তাহ পার হয়েছে। হয়ত আপনি তেমন কোনো শারীরিক কার্যকলাপে অংশ নেননি তাতে সমস্যা নেই। বছরের শুরু মানেই নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার সময়। এ সময়েই অনেকেই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। চরম ডায়েট কিংবা জটিল রুটিনের পেছনে না ছুটে, দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে কয়েকটি সহজ অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে আপনাকে সুস্থ রাখতে পারে।
এ নতুন বছর শুরু করতে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজাংক্ট অ্যাসোসিয়েট অধ্যাপক ডা. লিয়ানা ওয়েন এমন পাঁচটি বাস্তবসম্মত ও প্রমাণভিত্তিক অভ্যাসের কথা বলেছেন, যা ২০২৬ সালসহ ভবিষ্যতের বহু বছর ধরে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
১. নিয়মিত শরীরচর্চাকে অগ্রাধিকার দেওয়া
ডা. লিয়ানা ওয়েন বলেন, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ ও জীবনমান উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি। এটি শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য উপকারী। দ্রুত হাঁটার মতো মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামও রক্তচাপ কমাতে, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে, হৃদযন্ত্রকে শক্তিশালী করতে এবং মন ভালো রাখতে সাহায্য করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম এবং সপ্তাহে দুই দিন পেশিশক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম করা উচিত। তবে এই লক্ষ্য পূরণ না হলেও সমস্যা নেই—কিছুটা ব্যায়াম একেবারেই না করার চেয়ে অনেক ভালো। যারা একেবারেই ব্যায়াম করেন না, তাঁরা প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ মিনিট হাঁটা দিয়ে শুরু করতে পারেন। আর যাঁরা নিয়মিত হাঁটেন, তাঁরা ধীরে ধীরে সময় ও গতি বাড়াতে পারেন।
২. বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উচ্চ রক্তচাপ বা টাইপ–২ ডায়াবেটিসের মতো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ রোগ শুরুতে কোনো উপসর্গ দেখায় না। অথচ এগুলো ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্র, কিডনি ও রক্তনালিতে বড় ক্ষতি করতে পারে। বার্ষিক চেকআপে কোলেস্টেরল, রক্তে গ্লুকোজ, ওজন ও জীবনযাপনের ঝুঁকিগুলো যাচাই করা যায়।
এতে রোগ মারাত্মক হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা জীবনধারার পরিবর্তন করা সম্ভব হয়। এছাড়া এসব ভিজিটে টিকাদান বিষয়েও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যায়। বয়স ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে কোন টিকা প্রয়োজন, সে বিষয়ে চিকিৎসক সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। ফ্লু, কোভিডসহ নিয়মিত টিকা নেওয়া ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম কার্যকর উপায়।
৩. পর্যাপ্ত ঘুম
ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একজন মানুষকে সুস্থ রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ঠিকমতো নিজেকে মেরামত করতে পারে না, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দুর্বলতার সমস্যা দেখা দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন কম ঘুমালে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কারণ ঘুমের অভাবে ক্ষুধা বাড়ায় এমন হরমোন বৃদ্ধি পায় এবং তৃপ্তি দেওয়ার হরমোন কমে যায়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিরাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম সবচেয়ে উপকারী। নিয়মিত সময় মেনে ঘুমাতে পারলে ঘুমের মানও উন্নত হয়।
৪. খাবারের মান উন্নত করা, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমান
আপনি কী খান, তা আপনার স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বর্তমানে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন ফাস্ট ফুড, সফট ড্রিংক, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস অনেকের দৈনিক ক্যালরির বড় অংশ দখল করে আছে। এ খাবারগুলোতে চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি বেশি থাকে, অথচ ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজ কম থাকে। গবেষণায় এসব খাবার স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এমনকি বিষণ্নতার সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে দেখা গেছে। এর পরিবর্তে শাকসবজি, ফলমূল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম ও চর্বিহীন প্রোটিন গ্রহণ শরীর ও মনের জন্য অনেক বেশি উপকারী।
৫. সামাজিক সম্পর্ককেও স্বাস্থ্যের অংশ ভাবুন
মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী ও সমাজের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক থাকলে মানসিক চাপ কমে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়। অন্যদিকে, একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হৃদরোগ, স্মৃতিভ্রংশ ও অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে যাওয়া, নিয়মিত ফোনে কথা বলা, একসঙ্গে খাওয়া কিংবা দলগত কাজে অংশ নেওয়া এসবই স্বাস্থ্যের জন্য বিনিয়োগ।
বাস্তবে এ অভ্যাসগুলো ধরে রাখার উপায়
ডা. ওয়েন বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধারাবাহিকতা। সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে হবে এমন নয়। ছোট ছোট অভ্যাস নিয়মিত পালন করলেই বড় ফল আসে। প্রতিদিন কিছুটা হাঁটা, বছরে একবার ডাক্তার দেখানো, রাতে আধা ঘণ্টা বেশি ঘুমানো এসবই সময়ের সঙ্গে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা নিজের অবস্থান থেকেই শুরু করুন। একটি খারাপ সপ্তাহ মানেই সব শেষ নয়। ধীরে, বাস্তবসম্মত ও টেকসই অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।
সিএনএন