করোনাভাইরাস: ছড়িয়ে পড়া ৬ ভুল তথ্য নিয়ে যা বললেন চমক হাসান

১৮ মার্চ ২০২০, ০৮:২৫ PM

© ফাইল ফটো

করোনাভাইরাসে দেশে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এরইমধ্যে ১৪ জনের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। ফলে জনমনে আতঙ্ক বেড়েছে। আর সেই আতঙ্ককে পুঁজি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে করোনাভাইরাস থেকে মুক্তির ভুয়া সব তথ্য।

করোনাভাইরাসের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও সেসব ভুয়া তথ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পর্যালোচনামূলক তথ্য তুলে ধরেছেন বোস্টন সায়েন্টিফিকের প্রকৌশলী চমক হাসান। সেখানে তিনি ৬টি ভুল তথ্য/চিন্তা খণ্ডন করেছে। নিচে সেসব তথ্য পাঠকের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো -

১) ইউনিসেফ নাকি বলেছে ভাইরাসটা বড়, মাটিতে পড়ে যায়... - উঁহু, বলে নাই

ইউনিসেফের বরাত দিয়ে খুবই অদ্ভুত কিছু কথা বেশ কিছুদিন ফেসবুকে ঘুরেছে যার অধিকাংশই ভুল। সেগুলোর ভেতরে আছে এমন কিছু কথা- ভাইরাসটা আকারে বড়- মাটিতে পড়ে যায়, আইসক্রিম না খেয়ে গরম পানি খেলে ভাইরাস পেটে চলে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রথম কথা হচ্ছে ইউনিসেফ কোথাও এই জাতীয় কথা বলেনি। এমন কিছু দেখলেই সতর্ক হোন। আপনার কোনো বন্ধু শেয়ার করলে তাকে জানিয়ে দিন ওটা ভুল, তাকে স্পষ্টভাবে মানা করুন- এটা যেন আর না ছড়ায়। এরকম ভুলভাল কথা যে ইউনিসেফের নাম দিয়ে ছড়ানো হচ্ছে এই খবর তাদের কাছেও পৌঁছে গেছে, সেই ব্যাপারে তাদের বক্তব্য পাবেন এখানে। ইউনিসেফ কাজ করে সারা পৃথিবীর শিশুদের নিয়ে। করোনাভাইরাস নিয়ে অবশ্যই তারাও সতর্ক।

২) গরমের দেশে নাকি ছড়ায় না... -ভুল, সব জায়গায় ছড়াতে পারে

ফেসবুকে একটা পোস্ট চোখে পড়েছে যেখানে তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করে কেউ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে গরমের দেশে এই ভাইরাস বেশি ছড়ায় না- এটা খুবই বিপজ্জনক ভুল তথ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটা ওয়েবপাতা আছে ‘Myth Busters’ বলে। সেখানে প্রথমেই বলা আছে ‘COVID-19 virus can be transmitted in areas with hot and humid climates’। এখন পর্যন্ত পাওয়া সমস্ত তথ্য বলছে গরম এবং আর্দ্র এলাকাতেও COVID-19 রোগ ছড়াতে পারে। বাংলাদেশ গরম দেশ, তাতে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কিছু নাই। ১৪ মার্চ, ২০২০ পর্যন্ত সৌদি আরব, মিশরে, ভারত, ইরাক - সব জায়গায় ১০০ এর উপরে আক্রান্ত। এগুলো কোনোটাই ঠাণ্ডার দেশ না।

৩) শিশুরা নাকি আক্রান্ত হয় না ... -ভুল, সব বয়সের মানুষ আক্রান্ত হতে পারে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সব বয়সের মানুষই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সবাইকেই সচেতন থাকতে হবে। যতদূর জানা গেছে বৃদ্ধ কিংবা বয়স্করা যদি আক্রান্ত হয় তাদের ক্ষেত্রে রোগের জটিলতা বেশি হবার সম্ভাবনা আছে, শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটা মারাত্মক আকার ধারণ করে না (ইউনিসেফের তথ্য)। তাই বলে শিশুদের কিছু হবে না ভেবে অবহেলা করার মানে নেই। তাদের জন্য রোগের ভয়াবহতা হয়তো বেশি হবে না, কিন্তু তারা বাহক হিসেবে এই রোগ ছড়িয়ে দিতে পারে অসুস্থ কিংবা ঝুকিপূর্ণ মানুষের কাছে। বয়স্ক যারা এবং যাদের দেহে আগে থেকেই কোনো একটা অসুস্থতা আছে (যেমন অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ) তাদের ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

৪) সবাইকে কি মাস্ক পরতে হবে? -না, যারা নিজেরা অসুস্থ, যারা স্বাস্থ্যকর্মী এবং যারা রোগীর দেখাশোনা করছে তাদেরকে মাস্ক পরতে হবে

বাংলাদেশে মাস্কের আকাল পড়ে গেছে, অসাধু ব্যবসায়ীরা চড়া দামে মাস্ক বিক্রি করছেন এমন খবর চোখে পড়ছে হরহামেশাই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে আপনি যদি সুস্থ হন, বিনা কারণে মাস্ক পরার দরকার নেই। একই কথা বলেছে Center for Disease Control - CDC. আপনি যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কিংবা সন্দেহভাজন কোনো রোগীর দেখাশোনা করেন, তাহলে নিজেকে সুরক্ষার জন্য মাস্ক পরুন। যদি আপনি নিজে হাঁচি বা কাশিতে আক্রান্ত হন, তাহলে মাস্ক পরুন, যেন আপনার থেকে জীবাণু আর না ছড়াতে পারে। তারা এটাও বলছে যে শুধু মাস্ক পরে নিজেকে করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষিত রাখা যাবে না। সাথে সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোঁয়া, হাঁচি-কাশি এলে কনুই বা টিস্যু দিয়ে ঢাকা- এগুলোর চর্চাও লাগবে।

যদি মাস্ক ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে সেটা ব্যবহারের সঠিক নিয়মটাও জেনে রাখতে হবে। কী করে পরতে হয়, কী করে খুলতে হয়, কোথায় কীভাবে ফেলতে হয়- এগুলোও জানাটা জরুরি।

নিচের ভিডিওতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন কর্মী জানাচ্ছেন মাস্ক ব্যবহারের নিয়মাবলি।www.youtube.com/watch?v=lrvFrH_npQI

৫) রসুন খেলে, গরম পানি খেলে, ‘অমুক বলেছে তমুক খেলে’, অ্যান্টিবায়োটিক খেলে এই রোগ কি সেরে যাবে? -উঁহু, না, এই রোগের কোনো ভ্যাকসিন বা ঔষধ এখনও নাই (তথ্যসূত্র)

অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়ার জন্য, ভাইরাসের জন্য নয়। Covid-19 রোগ ভাইরাসঘটিত। প্রতিরোধক কিংবা প্রতিষেধক কোনো হিসেবেই অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। যদি কোভিডে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি হয়, এবং তার ব্যাকটেরিয়াঘটিত অন্য কোনো রোগ থাকে, তাহলে সেই অন্য রোগের চিকিৎসার জন্য ডাক্তারেরা অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে Covid-19 রোগের কোনো ঔষধ এখনও নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে ২০টির বেশি ভ্যাকসিনের কাজ চলছে, কিন্তু নানা ট্রায়াল পার হয়ে মানুষের গণহারে মানুষের ব্যবহার উপযোগী হতে বছরখানেক লেগে যেতে পারে বলে অনুমান করেছে সিএনএন। এই রোগের ঔষধ নিয়েও গবেষণা চলছে। কিন্তু সেখানেও একই ব্যাপার। নানান পরীক্ষাতে প্রমাণ করতে হবে যে ঔষধটা আসলেই কার্যকর এবং মানুষের ব্যবহারের উপযোগী।

শতকরা আশি ভাগ ক্ষেত্রে এই রোগের লক্ষণ সাধারণ ঠাণ্ডা-জ্বর, কাশির মতো। এমনিতে আপনার শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাই এই জীবাণুগুলোকে একসময় হটিয়ে দেবে।

এটার আরেকটা মানে আছে। আপনি আক্রান্ত কাউকে একটা ঘাসের মধ্যে বিড়বিড় করে গালিগালাজ করে একটা ফু দিয়ে ধরিয়ে দিন, হোমিওপ্যাথির নামে চিনির দলা দিয়ে দিন, বড় সম্ভাবনা আছে (৯৬.৬ ভাগ) সে কিছুদিন ভুগে সুস্থ হয়ে যাবে। সে ভাববে আপনি মনে হয় বিরাট কামেল, আসলে সে বুঝতেও পারবে না যে Placebo Effect ছাড়া ওইসবের আর কোনো মূল্য নাই, সুস্থ আপনি এমনিতেও হতেন।

৬) মানুষ কি শুধু শুধুই করোনাভাইরাস নিয়ে লাফালাফি করছে?... না, সতর্কতার দরকার আছে (প্যানিকের নয়)

একেবারে পাত্তা না দেওয়া এবং ভয়ে উল্টোপালটা কাজ করা- কোনোটাই কাজের কিছু না। অতি-আতঙ্কিত হয়ে নিজের কথা ভেবে অতিরিক্ত কেনাকাটা করে গুদামজাত করে ফেললে সেটা ভালো কিছু নয়, যাদের প্রয়োজন তারা পাবে না।

পাশাপাশি আপনাকে জানতে হবে- এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মোটেই অবহেলার নয়। কিছু কিছু সময় থাকে যখন ভয় না পাওয়ার থেকে কিছুটা পাওয়া ভালো। এটা তেমন একটা সময়। একেবারে যারা গা করছেন না, তারাই বরং নিজের ও সমাজের জন্য বিপজ্জনক। সারা চীন, ইতালি, স্পেন লকডাউন অবস্থায়। আমেরিকায় বড় বড় শহরে জনসমাগম নিষেধ। বড় বড় পুঁজিবাদী কোম্পানিগুলো লোকসান গুনে হলেও অফিসে যেতে মানা করছে কর্মীদের। আপনার কি মনে হয় এটা শুধু-শুধুই? যদি তা মনে হয়ে থাকে তাহলে আপনাকে দোষ দেবো না। গুণোত্তর ধারা কিংবা সূচকীয় ফাংশন অনেকেই অনুভব করতে পারে না।

দাবার আবিষ্কার নিয়ে একটা গল্প প্রচলিত আছে। দাবার আবিষ্কারে খুশি হয়ে রাজা পণ্ডিতকে উপহার দিতে চাইলেন। পণ্ডিত বললেন- বেশি কিছু চাই না- প্রথম ঘরে একটা গমের দানা। দ্বিতীয় ঘরে দুইটা, তিননম্বরে চারটা, এরপর ষোলোটা। এভাবে দ্বিগুণ করে করে সব ঘরে দেবেন। রাজা বললেন, এ আর এমন কী! কিন্তু ব্যাপারটা আসলে মোটেই সামান্য না। একটু হিসেব করলেই দেখবেন এমন করে গম দিতে গেলে মোট দানার সংখ্যা হবে 2⁶⁴-1=18446744073709551615। প্রতি দানা ৬৫ মিলিগ্রাম হলে মোট ওজন হবে 1.2×10¹⁵ কেজি। সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর উৎপন্ন হয় প্রায় 7*10^11 কেজি। অর্থাৎ পণ্ডিত যা চেয়েছেন ঐ পরিমাণ গম উৎপাদন করতে পৃথিবীর 1700 বছর লাগবে! এটা এতটাই বড়ো একটা সংখ্যা। আপনিও ঐ রাজার জায়গায় আছেন। আপনি একটা, দুইটা গম দেখে ভাবছেন এ তো কিছুই না।

না, মহামারী ঠিক এমনও আবার না। একটা সময়ে গিয়ে যারা সুস্থ হয়ে উঠবে, তারা আর নতুন করে আক্রান্ত হবে না, নতুন করে ছড়াবে না। ফলে সংখ্যাটা কমতে থাকবে। কিন্তু যদি অবহেলা করা হয়, তার আগে আক্রান্ত হবে বহু বহু মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব মতে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার ৩.৪% (সূত্র)। সংখ্যাটা কম না। ১০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হলে ৩৪ হাজার মানুষ মারা যাবে।

কিন্তু মানুষ কি শুধু ভয়ের কারণে মাতামাতি করছে? না! এই মাতামাতির ভেতরে একটা আশার কথা আছে। আমরা এটার বিস্তৃতিকে প্রতিহত করতে পারি। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটা কার্যকর করতে পারলে এর বিস্তৃতি রোধ করা যাবে অনেকাংশে।

শেখ হাসিনার ৫, টিউলিপের ২ বছরের কারাদণ্ড 
  • ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পাকিস্তান বয়কট করলেও শ্রীলঙ্কায় যেতে হবে ভারতকে!
  • ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জাবির সেই ছাত্রদল নেতার মৃত্যু
  • ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
চাচাকে বাবা পরিচয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়া সেই ই…
  • ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১৯তম নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি নিয়ে টেলিটকের সঙ্গে সভায় বসছে এনটি…
  • ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রমজান শুরুর সংশোধিত তারিখ জানাল আরব আমিরাত
  • ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬