প্রতীকি ছবি © এআই জেনারেটেড
দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন বাড়ছে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। তবে বেতন বাড়ার সুখবর মিললেও পুরো সুবিধা একসঙ্গে হাতে পাবেন না চাকরিজীবীরা। নতুন পে স্কেল দুই অর্থবছরে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। বেতন বৃদ্ধির ঘোষণায় স্বস্তি এলেও কাঙ্ক্ষিত পূর্ণ সুবিধার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুটা সময়। এতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে।
সরকারি চাকরিজীবীদের একটি অংশ মনে করছেন, দীর্ঘ ১১ বছর পর বেতন কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ ইতিবাচক। এ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে নতুন পে স্কেলে বেতন-ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলে তারা মনে করছেন তারা।
অন্যদিকে, নতুন বেতন কাঠামোয় সবার বেতন দ্বিগুণ হবে—এমন ধারণাও সঠিক নয় বলে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ফলে বিভিন্ন গ্রেডে প্রকৃতপক্ষে কতটা বেতন বাড়বে, তা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আগ্রহের পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও রয়েছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবেক উপ-উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ খান বলেন, পে স্কেল বিভিন্ন ধাপে ধাপে বাড়ছে ও কিছু অস্পষ্টতা বা ধোঁয়াশা আছে। আগে যেমন মহার্ঘ ভাতাসহ কিছু ভাতা ছিল সেগুলোর ব্যাপারে এখনও স্পষ্ট না আসলে। সেক্ষেত্রে অনেকে আশঙ্কা করছে যে হিসেবে হয়তো ১০০% দেখাবে কিন্তু বাস্তবে এতটা বাড়বে না।
তিনি আরও বলেন, যখন পে স্কেল দেয় তখন মূল্যস্ফীতির উপর একটা চাপ পড়ে। দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ে। অলরেডি আমরা দেখলাম তেলের বাজারে দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই এটা এত বেশি মিডিয়া কাভারেজ পায় যে, সব ধরনের মানুষের মধ্যে একটা প্রভাব পড়ে।মূল্যস্ফীতি অনেক সময় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে এবার আমি বলব বিভিন্ন ধাপে ধাপে বৃদ্ধির ফলে সেটি অনেকটা সহনীয় হবে সেদিক থেকে।
অধ্যাপক ফরিদ বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সেই ১৫ সালে লাস্ট স্কেল ছিল। এর মধ্যে দ্রব্যমূল্য অনেক বেড়ে গেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বা কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান স্বাভাবিক ধরে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়ছিল। সেদিক থেকে আমি বলব কিছুটা স্বস্তি হবে। কিন্তু এর ফলে অর্থনীতিতে ব্যাপক কোন ভূমিকা রাখবে এটি আমার কাছে খুব বেশি মনে হয় না। অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার জন্য যেটি প্রয়োজন সেটি হচ্ছে বিনিয়োগ। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। সেটি বাদে আসলে শুধুমাত্র বেতন ভাতা বাড়ালে বরং উল্টো কিছুটা আবার চাপ পড়বে। কারণ সরকারের যখন এই পরিচালন খাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে তখন অন্য খাত থেকে সেই অর্থ সরিয়ে বরাদ্দ করতে হচ্ছে বা টাকা ছাপাতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় অর্থনীতিতে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা আছে। সামগ্রিকভাবে আমার মতামত যে, এক্ষেত্রে নেগেটিভ প্রভাবের একটা সম্ভাবনা আছে, ইতিবাচক প্রভাব পড়ার খুব বেশি সম্ভাবনা আমি দেখছি না।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সরকারকে আহ্বান জানিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আসিফ আহমেদ দিগন্ত বলেন, সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে যুগোপযোগী। বিদ্যমান পুরনো বেতন কাঠামো অনুযায়ী চাকরিজীবীরা যে বেতন পেতেন, তা দিয়ে বর্তমান সময়ে সংসার পরিচালনা করা বেশ কঠিন। নিম্ন গ্রেডের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও প্রকট। তবে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টিকেও সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বেতন বৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে তেমন সুফল বয়ে আনবে না।
এ বিষয়ে ৪৫ তম বিসিএসের (নন-ক্যাডার) সুপারিশপ্রাপ্ত ইন্সট্রাকটর আরফাত উদ্দিন বলেন, ২০১৫ সালের পে-স্কেলের পর গত ১১ বছরে যেভাবে মূল্যস্ফীতি হয়েছে তাতে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য ছিল। তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যস্ফীতির বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। অন্যথায় এই পে-স্কেল সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে গলার কাঁটা হয়ে যাবে।
সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, নতুন পে স্কেল আমাদের দীর্ঘ দিনের কাঙ্ক্ষিত একটা বিষয়। যদিও এটা ৩ ধাপে বাস্তবায়ন করার কারণে একটু অসুবিধাই হচ্ছে। তবুও আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।
গত সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬’ অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে আগের মতোই ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ১ থেকে ১১তম গ্রেডে মূল বেতন ১০০ শতাংশ এবং ১২ থেকে ২০তম গ্রেডে ১১৫ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নতুন স্কেলে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। তবে বর্ধিত বেতনের আর্থিক সুবিধা একবারে দেওয়া হবে না। তিন ধাপে মূল বেতন সমন্বয় করা হবে। প্রথম ধাপে মূল বেতনের একটি অংশ কার্যকর হবে। পরবর্তী দুই ধাপে অবশিষ্ট অংশ সমন্বয় করা হবে। পাশাপাশি বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলেও পুরো বর্ধিত বেতন একসঙ্গে হাতে পাবেন না সরকারি চাকরিজীবীরা। ধাপে ধাপে বেতন ও অন্যান্য সুবিধা কার্যকর হওয়ায় পূর্ণ আর্থিক সুবিধা পেতে সময় লাগবে।