নবম জাতীয় পে-স্কেল © টিডিসি সম্পাদিত
সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় পে-স্কেলের খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। নতুন বেতন কাঠামোয় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল বেতনের অনুপাত ১:৮-এর পরিবর্তে ১:৭.৫ করার প্রস্তাব দিয়েছে সচিব কমিটি। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণ, কিছু ভাতায় সংযোজন-বিয়োজন এবং দুই ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।
গত ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা থাকলেও এখনো এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গেজেট জারির কার্যক্রম আরও কিছুটা পিছিয়ে যেতে পারে। ঠিক কতদিন বিলম্ব হবে, তা নিশ্চিত না হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, গেজেট প্রকাশে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন পে-স্কেলের প্রাথমিক খসড়ায় বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বর্তমানের মতো সব গ্রেডে সমান হারে ইনক্রিমেন্ট না দিয়ে গ্রেডভেদে ভিন্ন হারে বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভাতা, বেতন কাঠামো ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’-এর তথ্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় এ ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। আর ছয় সদস্যের একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় ৬৬ হাজার ২৫৩ টাকা।
জাতীয় বেতন কমিশন প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। তবে সুপারিশ পর্যালোচনাকারী সচিব কমিটি প্রথম গ্রেডের মূল বেতন দেড় লাখ টাকা নির্ধারণের কথা ভাবছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন গ্রেডের প্রস্তাবিত মূল বেতনও কিছুটা কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বেতন কমিশন যেখানে ১:৮ অনুপাতের সুপারিশ করেছে, সেখানে সচিব কমিটি তা কমিয়ে ১:৭ দশমিক ৫ করার প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে এই অনুপাত ১:৯ দশমিক ৪।
বর্তমানে ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারী মূল বেতন ও বিভিন্ন ভাতা মিলিয়ে মাসে ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা পান। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে তার মোট বেতন-ভাতা বেড়ে প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
আরও পড়ুন: পে স্কেলের সুপারিশে বড় ভূমিকা দুই জরিপের, কী আছে এতে?
১৯তম গ্রেড থেকে প্রথম গ্রেড পর্যন্ত বিভিন্ন ভাতাও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা এবং ঝুঁকিভাতার মতো সুবিধার ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ভাতা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তবে সব সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর করা হবে না। বেতন কমিশন চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা করার সুপারিশ করলেও তা ৩ হাজার টাকা নির্ধারণের চিন্তা করছে সরকার। একইভাবে সন্তানদের মাসিক শিক্ষা ভাতা কমিশনের প্রস্তাবিত ২ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, কমিশনের সুপারিশের তুলনায় কিছু ভাতার হার কমানো হলেও বর্তমানের তুলনায় তা বেশি থাকবে। প্রথম ধাপে চলতি অর্থবছরেই মূল বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করা হবে। আর বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে।
এদিকে সোমবার (৬ জুলাই) বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক এক ভিডিও বার্তায় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নবম পে-স্কেলে প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এককালীন পরিশোধ করা হোক।
তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারি কর্মচারীরা হতাশাগ্রস্ত। দীর্ঘদিন ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে বিশেষ করে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীরা চরম সংকটে রয়েছেন। অধিকাংশ কর্মচারীই ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। ১১ বছর পর দুটি পে-স্কেল পাওয়ার সময় অতিক্রম হওয়ার পর সেই দুটি পে-স্কেলের সমন্বয়ে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। জাতীয় বেতন কমিশনের কাছে তারা সর্বনিম্ন মূল বেতন ৩৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছিলেন।
আব্দুল মালেক বলেন, জাতীয় বেতন কমিশন দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের পর সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা প্রস্তাব করে সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতিসহ সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন সেই প্রস্তাবকে সম্মান জানিয়েছে। তিনি বলেন, এ সংগঠনটি ২২ লাখ সরকারি কর্মচারী পরিবারের স্বার্থ বিবেচনায় সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরছে।
সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ১১ বছর পর যে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে, সেখানে প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা মূল বেতন একবারেই পরিশোধ করা হোক। কারণ মূল বেতন কিস্তিতে বা ভাগ করে দেওয়া হলে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হবে এবং এতে সরকারি কর্মচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার ২২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অভিযোগ এবং ন্যায্য মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।