বিদ্যুৎ-আইনশৃঙ্খলাসহ কয়েক বিষয়ে চ্যালেঞ্জে বিএনপি সরকার

০৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:০২ PM
বিএনপি ও সরকার

বিএনপি ও সরকার © লোগো

‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে অধিকাংশ সময়ই আমরা বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত। দিন রাতে টানা এক ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাই না। চলে গেলে দুই আড়াই ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে। প্রচণ্ড গরমে মানুষ অস্বস্তির মধ্যে আছে। বিশেষ করে অসুস্থ বৃদ্ধ নারী পুরুষ ও শিশুদের অবস্থা দুর্বিষহ’। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে গরমে ঘেমে ছটফট করে।’ কথাগুলো বলছিলেন টাঙ্গাইল সদরের ঐতিহ্যবাহী আনুহলা গ্রামের বাসিন্দা ও এলাকার সবুজ সেনা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক আবদুল আলিম মোল্লা। 

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এই গ্রামে রয়েছে সরকারি হাসপাতাল, ডিগ্রি কলেজ, উচ্চ বিদ্যালয়, একাধিক প্রাইমারি ও কিন্ডারগার্টেন স্কুল, ডাকঘর, মসজিদ-মাদ্রাসা। বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে চিকিৎসা, কৃষিকাজ, ছোট ব্যবসা, উৎপাদন এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একইসঙ্গে জনজীবনে চরম নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে।  

জানা গেছে, শুধু আনুহলা গ্রামই নয়, এই চিত্র রাজধানী ঢাকাসহ পুরো দেশের। এর পাশাপাশি বর্তমানে জনস্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডেঙ্গু ও হাম পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণে আনা বিএনপি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বিষয়ের প্রভাব জনমত, রাজনৈতিক সমর্থন এবং সরকারের ভাবমূর্তির ওপর পড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

যদিও গ্রামে লোডশেডিং থাকলেও তা আগের চেয়ে ‘কম’ বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। দাবির পাশাপাশি তিনি লোডশেডিংয়ের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গ্রামে-গঞ্জে যে লোডশেডিং হচ্ছে, এটা বেশির ভাগই ‘টেকনিক্যাল’ (কারিগরি) কারণে, বিদ্যুতের শর্টেজের (ঘাটতি) জন্য নয়। এটা আমরা ঠিক করার চেষ্টা করছি।

লোডশেডিংয়ের টেকনিক্যাল ব্যাখ্যা দিয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, শতভাগ বিদ্যুতায়ন করতে গিয়ে অপরিকল্পিতভাবে যে লাইনগুলো করা হয়েছে, সেখানে যখনই লোড বেশি দেওয়া হয়, তখন লাইনগুলোতে সমস্যা হয় এবং ওই এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ চলে যায়।

সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন। সংলাপের আয়োজক কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিদ্যুৎমন্ত্রী টুকু।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, এ সমস্যার সমাধানে পল্লী বিদ্যুৎকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে বলে জানান বিদ্যুৎমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ সমস্যা দূর হতে সময় লাগবে।

সংলাপে আর্থিক সংকট থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উত্তরণের প্রধান উপায় হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। তিনি বলেন, জ্বালানি আমদানি কমাতে পারলেই সরকার বিপুল অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় করতে সক্ষম হবে। এ অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া দায় মেটানো সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যে আগামী ৫ বছরে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য কৃষিজমি ব্যবহারের ব্যাপারে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, এ কারণে প্রকল্পের জন্য পতিত বা অনাবাদি জমিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, দেশের বিভিন্ন এলাকার একাধিক সাধারণ মানুষের সঙ্গে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের এই প্রতিবেদকের কথা হয়। অধিকাংশ ভুক্তভোগী জানান, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট, হাম ও ডেঙ্গুর বিস্তার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর লাগামহীন দাম বৃদ্ধিতে তারা উদ্বিগ্ন। গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন রীতিমতো দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ, ডাকাতি, মাদক ও কিশোরগ্যাংয়ের রাহাজানির মতো অপরাধ বৃদ্ধিও মানুষের নিরাপত্তাবোধকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, এসব সমস্যার রাজনৈতিক প্রভাবও পড়তে পারে। তাদের মতে, জনস্বার্থে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, জনস্বাস্থ্য এবং আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রয়োজন। 

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা জানান, দেশের বিভিন্নস্থানে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, দখল, প্রতারণাসহ নানা অপকর্ম করা হচ্ছে। এই সব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা এসব ঘটনা আর বাড়ছে। এছাড়া প্রতিপক্ষকে মারধর, জোর-জবরদস্তি এবং অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন পোস্ট, ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিএনপি ও সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে এক বা দুই বছর আগের ঘটনাকে নতুন ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। নেতাকর্মীদের মতে, এ ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে দ্রুত তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান, আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। 

অন্যদিকে দেশে ডেঙ্গু ও হাম পরিস্থিতিও জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাদের মতে, জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত এসব বিষয় এখন শুধু স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, এগুলো রাজনৈতিক আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। প্রতিপক্ষ বিশেষ করে পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের অপপ্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। 

এদিকে, রাজধানীসহ দেশের বিভাগীয় শহর ও গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। দিনে ও রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চরম ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন। চিকিৎসা, কৃষিকাজ, ছোট ব্যবসা, শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। রাজনৈতিকভাবে এর দায় সরকারের ওপর বর্তায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে জনভোগান্তি চলতে থাকলে তা জনআস্থা ও রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তারা বলছেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকায় জনদুর্ভোগের বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব স্থানীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরেই অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। 

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তার পদক্ষেপ জরুরি। 

এছাড়া, দেশে নিত্যপণ্যের দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ওষ্ঠাগত হয়ে পড়েছে। চাল, আটা, ময়দা, তেল, চিনি, ডাল, সবজি ও মুরগির দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। পণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে চরম বিপাকে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। সবকিছুর দামই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে ক্রেতার নাজেহাল অবস্থা। গত কয়েক মাসে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। তদারকি সংস্থাগুলোও এক প্রকার নিশ্চুপ, নিষ্ক্রিয়। মনে হচ্ছে ‘অসাধু ব্যবসায়ী’দের সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কেউ কিছু বলছে না। 

সার্বিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বর্তমান সরকার অনেকগুলো সমস্যা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এগুলো জনরোষে পতিত ও পলাতক সরকার রেখে গেছে। ব্যাপকভাবে লুটপাট, দুর্নীতি ও অপশাসনের কারণে দেশের সব ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে। বিএনপি সরকার সবকিছুতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজ করছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে বলে মনে করছেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।

শহীদ জিয়াউর রহমানের নামেই ফিরছে বিদ্যালয়টি
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
বগুড়ায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পূর্ণাঙ্গ পাবল…
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
নতুন শাস্তির বিধান রেখে পাবলিক পরীক্ষা আইন বিল সংসদে পাস
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
মাস্তুল ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ফেস দ্য পিপল সম…
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
সংসদ অধিবেশন ও প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেল ১০ শিক্ষক, চার বি…
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
সিনিয়র সহ-সভাপতির পদ ফাঁকা রেখেই বেরোবি ছাত্রদলের ৯৪ সদস্যে…
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence