বাবা-মায়ের সঙ্গে মেসি © সংগৃহীত
লিওনেল মেসির জন্মের আগেই পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁর বাবা হোর্হে মেসি। তবে আর্জেন্টিনার কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। হোর্হে ও তাঁর স্ত্রী সেলিয়া রোজারিওতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্তই হয়তো বদলে দেয় বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস।
আর্জেন্টিনার রোজারিওর একটি হাসপাতালে ৬৮ বছর বয়সে মারা গেছেন লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসি। ছেলের শৈশব থেকে শুরু করে বিশ্ব ফুটবলের সেরা খেলোয়াড় হয়ে ওঠার পুরো পথেই নীরবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী মেসির ক্যারিয়ারের পেছনে হোর্হে ছিলেন অন্যতম প্রধান ভরসা। রোজারিওর ছোট মাঠ থেকে ছেলেকে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে তিনি বছরের পর বছর পরিশ্রম করেছেন। পরিবারের কঠিন সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া, ছেলের ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা ও চুক্তি—সব ক্ষেত্রেই হোর্হে ছিলেন সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া একজন মানুষ।
তবে মেসির জীবনের গল্পে এমন একটি ঘটনা রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে হয়তো তাঁর পুরো জীবনই অন্যরকম হতে পারত। ঘটনাটি ‘প্ল্যান অস্ট্রেলিয়া’ নামে পরিচিত।
১৯৮৫ সালের জুনে আর্জেন্টিনা ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তখন দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। সরকার কর্মীদের বেতন স্থগিত করেছিল এবং মুদ্রাব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছিল। এমন পরিস্থিতিতে হোর্হে মেসি ও তাঁর স্ত্রী সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করেন।
তখন তাঁদের বড় ছেলে রদ্রিগোর বয়স পাঁচ বছর। আর মাতিয়াসের বয়স মাত্র তিন। একই সময়ে তাঁদের তৃতীয় সন্তানও পৃথিবীতে আসার অপেক্ষায় ছিল।
পরিবারের আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছিল। এর মধ্যে হোর্হে কিছু সময়ের জন্য চাকরিও হারিয়েছিলেন। ফলে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার পরিকল্পনাটি আরও বাস্তব হয়ে ওঠে।
জীবনীকার গিয়েম বালাগের মতে, কোনো পরিবার যখন কঠিন পরিস্থিতির একেবারে শেষ সীমায় পৌঁছে যায়, তখন কোথায় যাবে সেটি বড় বিষয় নয়; বরং সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসাটাই হয়ে ওঠে মূল লক্ষ্য। হোর্হে ও সেলিয়ার অবস্থাও অনেকটা এমন ছিল।
অস্ট্রেলিয়ায় আগে বসবাস করেছেন, এমন কয়েকজন পরিচিত মানুষও তাঁদের ছিল। ফলে সেখানে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করার সম্ভাবনাটি তাঁদের কাছে পুরোপুরি অপরিচিত ছিল না।
অনেক চিন্তাভাবনার পর অবশ্য হোর্হে ও সেলিয়া অস্ট্রেলিয়ায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা রোজারিওতেই থেকে যান।
এর দুই বছর পর, ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন, সেই রোজারিও শহরেই জন্ম নেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। যে শহর পরবর্তী সময়ে তাঁকে নিজের সন্তান হিসেবে গর্বের সঙ্গে পরিচয় করাবে।
রোজারিও থেকেই শুরু হয় মেসির ফুটবলযাত্রা। পরে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে খেলে তিনি পাড়ি জমান বার্সেলোনায়। এরপর প্যারিস ও মায়ামি হয়ে পৌঁছে যান বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ উচ্চতায়।
অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাওয়ার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। তবে মেসির পরিবার যদি তখন দেশ ছাড়ত, তাহলে লিওনেল মেসির জীবন কোন পথে যেত, তা আজও কেবল অনুমান করা যায়। হয়তো তিনি নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে খেলতেন না, হয়তো বার্সেলোনার একাডেমিতেও যেতেন না। এমনকি বিশ্ব ফুটবলও হয়তো পেত না ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারকে।
তবে মেসির পরিবারের কঠিন সময় সেখানেই শেষ হয়নি। পরবর্তী সময়ে লিওর ফুটবল ক্যারিয়ারের জন্য পরিবারকে আর্জেন্টিনা থেকে ইউরোপে পাড়ি দিতে হয়। সেই যাত্রাতেও অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন হোর্হে ও সেলিয়া। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলেও ছেলের স্বপ্ন পূরণে তাঁরা পিছিয়ে যাননি।
লিওর প্রতিভার ওপর বিশ্বাস রেখে হোর্হে সবসময় তাঁর পাশে থেকেছেন। অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু করে ছেলের ক্যারিয়ারের কঠিন সিদ্ধান্ত—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন ভরসার জায়গা।
অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা হয়তো কখনো বাস্তব হয়নি। কিন্তু রোজারিওতে থেকে যাওয়ার সেই সিদ্ধান্তের পরই জন্ম নেয় সেই সন্তান, যিনি একদিন বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস বদলে দেবেন।
হোর্হে মেসি আজ নেই। তবে ছেলের প্রতি তাঁর ত্যাগ, বিশ্বাস ও সিদ্ধান্তগুলো লিওনেল মেসির জীবনের সঙ্গে চিরকাল জড়িয়ে থাকবে। তাঁর নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের কারণেই হয়তো বিশ্ব ফুটবল পেয়েছে লিওনেল মেসির মতো একজন কিংবদন্তিকে।