মেসির ও তার বাবা হোর্হে মেসি © সংগৃহীত
লিওনেল মেসির বিশ্বসেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্পে আলো থাকে মাঠের জাদু, রেকর্ড আর অসংখ্য ট্রফির। কিন্তু সেই গল্পের আড়ালে ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবন, সময় আর স্বপ্নের অনেকটাই ছেলের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি মেসির বাবা হোর্হে মেসি। পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে একসময় কারখানায় দীর্ঘ সময় কাজ করা এই মানুষটিই পরে হয়ে ওঠেন ছেলের ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ভরসা ও পথপ্রদর্শক।
হোর্হে মেসির জন্ম ১৯৫৮ সালে আর্জেন্টিনার রোজারিওতে। তিনি ছিলেন নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের সমর্থক। এই ক্লাবেই ছোটবেলায় খেলেছেন লিওনেল মেসি। ফুটবলের সঙ্গে হোর্হের নিজেরও সম্পর্ক ছিল। নিউয়েলসের যুব দলে প্রায় চার বছর খেলেছিলেন তিনি। তবে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্বের কারণে তাঁর ফুটবলজীবন থেমে যায়।
এরপর জীবনের বাস্তবতা তাঁকে অন্য পথে নিয়ে যায়। রসায়নে টেকনিশিয়ান হিসেবে পড়াশোনা করা হোর্হে একসময় স্ক্রু তৈরির কারখানায় কাজ করেন। পরে একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে টাকা সংগ্রহের কাজও করেন। এরপর ধাতব শিল্প প্রতিষ্ঠান অ্যাসিনদারে চাকরি নেন। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো তাঁকে। সহকর্মীদের চোখে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল একজন কর্মী।
পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন নিজের বাবার কাছ থেকেই। হোর্হে তাঁর বাবা ইউসেবিওর কাছ থেকে রাজমিস্ত্রির কাজ শিখেছিলেন। বাবা-ছেলে মিলে যে বাড়ি তৈরি করেছিলেন, সেখানেই বড় হয়েছে হোর্হের চার সন্তান।
ছোটবেলা থেকেই লিও বাবার এই পরিশ্রম দেখেছেন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যাওয়ার সময় তিনি জানতেন, তাঁর বাবা এরই মধ্যে কাজে চলে গেছেন। ভোরের আগেই হোর্হেকে রোজারিও থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ভিলা কনস্টিটুসিওনে যেতে হতো। কখনো বাসেও যাতায়াত করেছেন তিনি।
বাবার এই জীবন লিওর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পরিশ্রম, ধৈর্য আর ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করার মানসিকতা তিনি যেন বাবার কাছ থেকেই শিখেছিলেন। তাই মেসির সাফল্যের গল্পে তাঁর প্রতিভার পাশাপাশি হোর্হের ত্যাগের কথাও বারবার সামনে আসে।
লিওর ফুটবল প্রতিভা যখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করল, তখন পরিবারকে নিতে হলো সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত। ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে পুরো পরিবারকে রোজারিও ছেড়ে বার্সেলোনায় যেতে হলো। পরিচিত শহর, বাড়ি, বন্ধু ও স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে নতুন দেশে যাওয়া সহজ ছিল না কারও জন্যই।
প্রথমে মেসি পরিবার বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যুর সামনে একটি হোটেলে থাকত। পরে ক্লাবের ভাড়া করা একটি অ্যাপার্টমেন্টে চলে যায়। রোজারিওতে যেখানে চার ভাইবোন একই ঘরে বড় হয়েছিল, বার্সেলোনায় এসে তারা প্রত্যেকে আলাদা ঘর পেল। বাইরে থেকে নতুন জীবনটা সুন্দর মনে হলেও বাস্তবে পরিবারটির জন্য সময়টা ছিল কঠিন।
মেসির ছোট বোন মারিয়া সল নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। রদ্রিগো ও মাতিয়াসও নিজেদের পুরোনো জীবন ও বন্ধুদের খুব মিস করতেন। একপর্যায়ে পরিবারকে কঠিন একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়। হোর্হে বার্সেলোনায় লিওর সঙ্গে থেকে যান, আর স্ত্রী সেলিয়া অন্য তিন সন্তানকে নিয়ে রোজারিওতে ফিরে যান।
লিওর স্বপ্ন পূরণের জন্য এভাবেই পরিবারটি কিছু সময়ের জন্য দুই ভাগ হয়ে যায়। হোর্হের জন্যও সময়টা সহজ ছিল না। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে ছেড়ে তাঁকে শুধু লিওকে নিয়ে স্পেনে থাকতে হয়েছে। তবু ছেলের স্বপ্নের পথে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও পিছিয়ে যাননি।
এর মধ্যেই লিওর পায়ের হাড় ভেঙে যায়। পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠলেও লিও বার্সেলোনায় থাকার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। হোর্হে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমরা কী করব? আর্জেন্টিনায় ফিরে যাব?’ লিওর উত্তর ছিল, ‘না, আমি বার্সেলোনায় খেলতে চাই।’
ছেলের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছিলেন হোর্হে। শুধু তাই নয়, বার্সেলোনায় লিওর খেলার অনুমতি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে তিনি ক্লাবের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কঠোরভাবে কথা বলেন। তাঁর সেই দৃঢ় অবস্থানের একটি কথা পরে বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে, ‘আমার ছেলে আর আমাকে কেউ বোকা বানাতে পারবে না।’
এরপর হোর্হের ভূমিকা শুধু একজন বাবার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে তিনি লিওর ফুটবল ক্যারিয়ার পরিচালনার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন। কোনো অভিজ্ঞ ম্যানেজার হিসেবে নয়, বরং প্রয়োজনের তাগিদে কাজ করতে করতেই তিনি শিখেছেন। লিও যত বড় হয়েছেন, হোর্হেও তত বেশি অভিজ্ঞ হয়েছেন। ব্যবসায়ী, ক্লাব কর্মকর্তা, সভাপতি থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গেও তাঁকে আলোচনা ও চুক্তি করতে হয়েছে।
লিওর ক্যারিয়ার যখন একের পর এক সাফল্যের দিকে এগোচ্ছিল, হোর্হে তখনও ছিলেন আড়ালে। ছেলের পুরস্কার, শিরোপা কিংবা বিভিন্ন বড় অনুষ্ঠানে তাঁকে খুব বেশি দেখা যেত না। জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংযত। বরং আড়াল থেকেই তিনি ছেলের ক্যারিয়ার ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে পাশে থেকেছেন।
২০২১ সালে আবারও কঠিন সময় আসে। আর্জেন্টিনা কোপা আমেরিকা জেতার পর হোর্হে বার্সেলোনায় গিয়েছিলেন লিওর নতুন চুক্তির বিষয়ে আগের আলোচনা চূড়ান্ত করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনা মেসিকে ধরে রাখতে পারেনি। আবারও ছেলের সামনে বদলে গেল জীবনের পথ। এবার লিওকে পাড়ি দিতে হলো ফ্রান্সে, যোগ দিতে হলো প্যারিস সাঁ-জার্মেইনে।
এরপর মেসির ইন্টার মায়ামিতে যাওয়ার সময়ও হোর্হে পাশে ছিলেন। বিভিন্ন প্রস্তাবের মধ্য থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ছেলের সঙ্গে ছিলেন। বিশ্বকাপ জয়ের পর লিও যে জীবনে কিছুটা ভিন্নতা চাইছেন, সেটিও হোর্হে বুঝতে পেরেছিলেন। ফুটবলের সাফল্যের পাশাপাশি ছেলে যেন নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করতে পারে, সেটিও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
লিও যখন ছোট, তখন মাঠে বাবার উপস্থিতি ছিল আরও সরাসরি। নিউয়েলসের হয়ে খেলার সময় লিওকে নিষ্ক্রিয় দেখলে হোর্হে মাঠের বাইরে থেকে শিস দিয়ে তাঁকে সতর্ক করতেন। সময়ের সঙ্গে লিও বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন হয়ে উঠলেও বাবার কয়েকটি কথাই তাঁর জন্য যথেষ্ট ছিল।
হোর্হে মেসি তাই শুধু লিওর বাবা ছিলেন না। তিনি ছিলেন তাঁর প্রথম দিকের শিক্ষক, সবচেয়ে বড় ভরসা এবং জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ। ছেলের স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজের স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়া, পরিবারের বিচ্ছেদ মেনে নেওয়া, বছরের পর বছর পরিশ্রম করা এবং পরে ছেলের ক্যারিয়ার সামলানো—সবকিছুতেই হোর্হের উপস্থিতি ছিল।
মেসির পায়ের জাদু বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে, কিন্তু সেই জাদুর পেছনে যে দীর্ঘ পরিশ্রম ও ত্যাগ ছিল, তার অন্যতম কারিগর ছিলেন হোর্হে মেসি। মাঠে আলোটা ছিল লিওর ওপর, আর সেই আলোর পেছনে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ছিলেন তাঁর বাবা।