আর্জেন্টিনা ফুটবল দল © সংগৃহীত
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের পর দেশজুড়ে একের পর এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব দাবি এতটাই ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে যে, অনেকের মতে এটি এখন গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিউ ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে কনটেন্ট নির্মাতারা নানা ধরনের দাবি প্রচার করছেন। যদিও আর্জেন্টিনার মূলধারার সংবাদমাধ্যম এসব তত্ত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, তবু একাংশ সমর্থক বিশ্বাস করছেন—ফাইনালের পরাজয়ের পেছনে শুধু ফুটবলীয় কারণ নয়, আরও বড় কোনো ষড়যন্ত্র কাজ করেছে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের পর সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়া একটি বাক্য ছিল—‘কিছু একটা ঘটেছিল।’ লিওনেল মেসির একটি অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যের পর এই বাক্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কোচ লিওনেল স্কালোনি, কিংবদন্তি মারিও কেম্পেস এবং আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হয়।
সবশেষে নতুন যে দাবি সামনে এসেছে, তা হলো—ম্যাচের শেষ মুহূর্তে স্পেনের ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সি যে বলটি ক্লিয়ার করেছিলেন, সেটি নাকি আসলে গোললাইন অতিক্রম করেছিল।
বলটি নাকি জালে ঢুকেছিল
একটি তত্ত্বে বলা হচ্ছে, আগে গোলরক্ষকেরা ম্যাচ শুরুর আগে গোলপোস্ট ও জাল ভালোভাবে পরীক্ষা করতেন। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে সেটি দেখা যায়নি।
এই তত্ত্বের সমর্থকদের দাবি, কুবার্সি বল ক্লিয়ার করার আগে সেটি জালের ভেতর দিয়েই চলে গিয়েছিল। তাদের মতে, গোললাইনে বলের ছায়াই নাকি এর প্রমাণ।
কেউ কেউ আরও দাবি করছেন, বলের ভেতরে থাকা ইলেকট্রনিক চিপে কারসাজি করে সেটির অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।
খেলোয়াড়দের পরিবারের সদস্যদের নাকি হুমকি দেওয়া হয়েছিল
আরেকটি আলোচিত তত্ত্বে বলা হচ্ছে, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল, যাতে দলটি ফাইনাল জিততে না পারে।
সাংবাদিক সার্জিও ওভিয়েদো এই দাবি করেছেন। অন্য কয়েকটি সূত্রের দাবি, প্রায় সব খেলোয়াড়ের পরিবারকেই হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সে কারণেই অনেকেই ফাইনাল দেখতে স্টেডিয়ামে যাননি।
ম্যাচের আগে আকস্মিক ডোপ পরীক্ষা
আরেকটি তত্ত্বে দাবি করা হচ্ছে, ম্যাচ শুরুর কয়েক মিনিট আগে ফিফা হঠাৎ করে আর্জেন্টিনা দলের ডোপ পরীক্ষা নেয়। এতে খেলোয়াড়রা শারীরিক ও মানসিকভাবে চাপে পড়ে যান।
তবে ফিফা জানিয়েছে, পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে প্রচলিত নিয়ম মেনেই সব চিকিৎসা ও ডোপিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এ বিষয়ে আর্জেন্টিনা দলও কোনো আপত্তি বা অভিযোগ জানায়নি।
অনেকেই এ প্রসঙ্গে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার ডোপিং কেলেঙ্কারির ঘটনাও স্মরণ করছেন, যখন তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা আমার পা কেটে ফেলেছে।’
ট্রাম্প, স্পেনের রাজা ও ইউরোপের যোগসাজশ!
আরেকটি তত্ত্বে দাবি করা হচ্ছে, আর্জেন্টিনা ইচ্ছাকৃতভাবে ফাইনাল হেরেছে। এর পেছনে ছিল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শক্তির পরিকল্পনা।
তাদের দাবি, ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালের পর ‘মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার’ লেখা ব্যানার প্রদর্শনের কারণে বিভিন্ন প্রভাবশালী পক্ষ আর্জেন্টিনার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল।
ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকার দাবি
একই ব্যানারকে ঘিরে আরেকটি তত্ত্বে বলা হয়, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নাকি মেসিকে জানিয়েছিলেন, আর্জেন্টিনাকে আর টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। তাই পরে অন্যভাবে শাস্তি দেওয়া হবে।
একজন টিকটক ব্যবহারকারী দাবি করেন, ‘ব্রিটিশ সরকারই ফিফাকে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চাপ দিয়েছে। কাকতালীয়ভাবে মালভিনাস ব্যানার বহনকারী লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরো দুজনই পরে চোটে পড়েছেন।’
‘ফিফার অলিখিত আইন’
একটি তত্ত্বে বলা হচ্ছে, কোনো দলকে নাকি টানা দুইবার বিশ্বকাপ জিততে দেওয়া হয় না। তাই আর্জেন্টিনাকে শিরোপা ধরে রাখতে দেওয়া হয়নি।
যদিও ইতিহাসে ইতালি ও ব্রাজিল টানা দুইবার বিশ্বকাপ জিতেছে। তবুও এই তত্ত্বের সমর্থকদের দাবি, বাণিজ্যিক, টেলিভিশন বা রাজনৈতিক কারণে ইউরোপের একটি দলকে চ্যাম্পিয়ন করতেই হতো।
ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনের পরিকল্পনা
আরেকটি দাবি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন নিশ্চিত করতে স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল।
তাদের দাবি, উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিন নাকি ইনফান্তিনোকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলে তিনি সমর্থন প্রত্যাহার করবেন। তাই আর্জেন্টিনাকে হারতে বাধ্য করা হয়।
কোনো প্রমাণ ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দাবি করা মাত্র তিনটি পোস্টই ২০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে।
এফবিআই নাকি ‘চিকি’ তাপিয়াকে গ্রেপ্তার করতে চেয়েছিল
আরেকটি তত্ত্বে বলা হয়, ম্যাচের আগে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লদিও ‘চিকি’ তাপিয়াকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা হয়েছিল। এতে ড্রেসিংরুমে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং খেলোয়াড়রা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
এমনকি দেশে ফেরার সময় তার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয় এবং দলের ফ্লাইট দুই ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।
তবে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কিছু বাণিজ্যিক লেনদেন নিয়ে তদন্ত করছে এবং তাপিয়াসহ কয়েকজন কর্মকর্তার যোগাযোগসংক্রান্ত তথ্য চেয়েছে।
ফ্রিম্যাসন, রহস্যময় আচার ও মেসি-ইয়ামালের ছবি
সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্বগুলোর একটি ঘিরে রয়েছে লিওনেল মেসি ও ছোটবেলার লামিন ইয়ামালের একটি পুরোনো ছবি।
ছবিতে দেখা যায়, শিশু ইয়ামালকে গোসল করাচ্ছেন মেসি। ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সমর্থকদের দাবি, এটি ছিল ফ্রিম্যাসনদের ‘দীক্ষা অনুষ্ঠান’ বা ‘আধ্যাত্মিক শক্তি স্থানান্তরের’ একটি আচার।
তাদের মতে, বার্সেলোনা একটি ‘ফ্রিম্যাসন ক্লাব’ এবং পানির মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপে ফুটবলের আধিপত্য প্রতীকীভাবে হস্তান্তর করা হয়েছিল।
তারা ফাইনালের তারিখ, অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে গোল হওয়া এবং মেটলাইফ স্টেডিয়ামের নকশার সঙ্গেও ফ্রিম্যাসনদের বিভিন্ন প্রতীক জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
এমনকি কিছু টেলিভিশন সম্প্রচারে আর্জেন্টিনার লোগোর ভেতরে ফ্রিম্যাসনের প্রতীকের মতো একটি চিহ্ন দেখা গেছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
বাজি ধরার প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে খেলেছে আর্জেন্টিনা!
আরেকটি তত্ত্বে বলা হয়, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর চোট, পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার একটি শটও লক্ষ্যে না রাখা এবং অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশল—এসবই নাকি বাজি ধরার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা গোপন সমঝোতার ফল।
তবে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
বিশ্বকাপের বদলে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি!
আরেকটি তত্ত্বে দাবি করা হয়, বিশ্বকাপ জয়ের বিনিময়ে স্পেন নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে রোতা ও মোরোন সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলার অনুমতি দিয়েছে।
কিন্তু এই দাবির পক্ষে কোনো নথি, সাক্ষ্য বা নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।
বরং স্পেন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে না।
কালো জাদু ও শক্তি শুষে নেওয়ার অভিযোগ
অনেক সমর্থকের দাবি, ফাইনালে খেলোয়াড় ও দর্শকদের শক্তি রহস্যজনকভাবে শুষে নেওয়া হয়েছিল।
তাদের ভাষায়, ‘অদ্ভুত কিছু’ ঘটেছিল এবং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক শক্তিগুলো নাকি স্পেনকে চ্যাম্পিয়ন করতে বিশেষভাবে হস্তক্ষেপ করেছিল।
স্পেনের তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘মালদিতা’ জানিয়েছে, শুধু এই তত্ত্ব প্রচার করা দুটি টিকটক ভিডিওই ৮০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে।
আরও কিছু ব্যবহারকারী দাবি করেছেন, আর্জেন্টিনা নাকি কালো জাদু বা তন্ত্র-মন্ত্রের শিকার হয়েছিল। কেউ কেউ আবার বলেছেন, তারা এই তথ্য ‘অন্য জগত’ থেকে পেয়েছেন।
রেফারি স্লাভকো ভিনচিচও বিতর্কে
ফাইনালের রেফারি স্লোভেনিয়ার স্লাভকো ভিনচিচও সমালোচনা থেকে রেহাই পাননি।
অনেক আর্জেন্টাইন সমর্থক তার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি ‘চেঞ্জ ডট ওআরজি’-তে বিশ্বকাপ ফাইনাল পুনরায় আয়োজনের দাবিতে প্রায় এক লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে।
পিটিশনে অভিযোগ করা হয়েছে, রেফারি ‘বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং ম্যাচের ফল প্রভাবিত করার জন্য তাকে ‘কেনা হয়েছিল।’
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।