আর্জেন্টিনা ফুটবল দল © টিডিসি ছবি
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারও টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা। তবে ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের ফাইনালের তিক্ত স্মৃতি আবারও আলোচনায় এসেছে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত সেই ফাইনালে রেফারির সিদ্ধান্তের কারণে টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল আলবিসেলেস্তেদের। এবারও সেই ধারা ভাঙতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর ১৯৯০ সালে শিরোপা ধরে রাখার দারুণ সুযোগ ছিল দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার সামনে। কিন্তু রোমের স্তাদিও অলিম্পিকোয় অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালে মেক্সিকান-উরুগুয়েন রেফারি এদগার্দো কোদেসালের একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পর পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা।
এবারও কাতার বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে রয়েছে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ। সফল হলে ব্রাজিল ও ইতালির পর তৃতীয় দেশ হিসেবে এই অনন্য কীর্তি গড়বে লিওনেল স্কালোনির দল।
১৯৯০ সালের সেই ফাইনালের সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম হয় ম্যাচের ৮৫তম মিনিটে। জার্মান স্ট্রাইকার রুডি ফোলার বক্সে পড়ে গেলে রেফারি কোদেসাল পেনাল্টির নির্দেশ দেন। অনেকের মতে, রবার্তো সেনসিনির স্পর্শে ফোলারের পড়ে যাওয়া ছিল অতিরঞ্জিত। সেই পেনাল্টি থেকেই আন্দ্রেয়াস ব্রেহমে জয়সূচক গোল করেন।
এর আগে প্রথমার্ধের পর বদলি হিসেবে নামা আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার পেদ্রো মনজোনকে ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানকে ট্যাকেলের অভিযোগে সরাসরি লাল কার্ড দেখান কোদেসাল। এটি ছিল বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম সরাসরি লাল কার্ড। এরপর ম্যাচের শেষ দিকে গুস্তাভো দেজোতিকেও লাল কার্ড দেখিয়ে ৯ জনের দলে পরিণত করা হয় আর্জেন্টিনাকে।
গোড়ালির গুরুতর চোট নিয়েও পুরো ম্যাচ খেলেছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। ম্যাচ শেষে মাঠের মাঝখানে তাঁর কান্নার দৃশ্য আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক মুহূর্ত হিসেবে স্মরণ করা হয়।
সেই সময় ম্যাচের ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে বিবিসির কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকার জন মটসন বলেছিলেন, 'পাঁচজন খেলোয়াড় রেফারিকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেছে এবং আর্জেন্টিনা যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে ফিফাকে অবশ্যই আগামী বিশ্বকাপ থেকে তাদের নিষিদ্ধ করতে হবে! ফাইনালে নিশ্চিতভাবেই আপনি এমন দৃশ্য দেখতে চাইবেন না!'
এই ম্যাচটিই ছিল এদগার্দো কোদেসালের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। তবে ম্যাচ শেষে তিনি নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষেই অবস্থান নেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, 'আমি সবসময় যেমন থাকি, তেমনই সাহসী ও সৎ ছিলাম। ফাউলটি আর্জেন্টিনার ভুলের কারণে হয়েছিল, আমার কারণে নয়। আমি শান্ত এবং খুশি।'
পরে আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ওলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে দাবি করেন। কোদেসালের ভাষায়, 'আমার কোনো সন্দেহ নেই। রেফারিদের খেলোয়াড়ের উদ্দেশ্য দেখার দরকার নেই, তাদের দেখতে হবে স্পর্শ বা আঘাত লেগেছে কিনা। আমি এটাই দেখেছি: আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়টি প্রথমে বলের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করেছিল কিন্তু সে তার পা বাড়িয়ে জার্মান খেলোয়াড়কে ট্যাকেল করে। এটি পেনাল্টিই ছিল। আমি সেই সময় নিশ্চিত ছিলাম এবং এরপর থেকে আমি আমার মন পরিবর্তন করিনি। আমার জন্য এই অধ্যায় এখানেই শেষ।'
তবে বিতর্ক থেমে থাকেনি। মেক্সিকান রেফারি কমিশনের সাবেক সভাপতি হুমবার্তো রোহানো পরে দাবি করেন, ১৯৯০ সালে ফিফার রেফারি কমিশনের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কোদেসালের শ্বশুর হাভিয়ের আরিয়াগাকে 'কর্তৃপক্ষ' স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, 'আর্জেন্টিনাকে জেতা যাবে না।'
বহু বছর পর রিফর্মা পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোদেসালের কণ্ঠে অনুশোচনার সুরও শোনা যায়। তিনি বলেন, 'আমি জানি আর্জেন্টাইনরা এখনও আমাকে ঘৃণা করে এবং এটি আমাকে কষ্ট দেয়। আমি তাদের ভালোবাসি এবং তাদের যে কষ্টের কারণ হয়েছি সেজন্য আমার খারাপ লাগে। আমি চাইতাম ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনা তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ জিতুক। আমি ঈশ্বর হলে জিনিসগুলো বদলে দিতাম, কিন্তু আমি ঈশ্বর নই। আমি জানি ৫০ বছর পরেও তারা আমাকে ক্ষমা করবে না।'
তবে পরবর্তী সময়ে নিজের অবস্থান আবারও কঠোর করেন কোদেসাল। ২০১১ সালের দিকে তিনি বলেন, 'আর্জেন্টাইনদের জেতার ইচ্ছার জন্য আমি তাদের প্রশংসা করি, কিন্তু তারা হারতে শেখেনি, তারা এটি সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। কেউ তাদের বলেছে যে আমি রেফারি ছিলাম বলেই তারা হেরেছে, এবং তারা সেটা বিশ্বাস করেছে। ম্যারাডোনা যখন হাত দিয়ে গোল করেন, তখন সেটা তাদের কাছে বুদ্ধিমত্তা; কিন্তু তারা যখন জিততে পারে না, তখন তাদের মনে হয় কেউ তাদের থেকে কিছু চুরি করেছে।'
১৯৯০ সালের সেই ফাইনালের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে ফুটবলের নিয়মে। পুরো টুর্নামেন্টে রক্ষণাত্মক কৌশল এবং অতিরিক্ত ব্যাকপাসের মাধ্যমে সময় নষ্টের প্রবণতা দেখে ফিফা ১৯৯২ সালে ঐতিহাসিক 'ব্যাকপাস নিয়ম' চালু করে। নতুন নিয়মে গোলরক্ষক নিজের সতীর্থের পায়ে বাড়িয়ে দেওয়া বল হাতে ধরতে পারবেন না। ফলে বিতর্কিত সেই ফাইনাল শুধু আর্জেন্টিনার টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নই ভেঙে দেয়নি, আধুনিক ও আরও গতিময় ফুটবলের পথও তৈরি করে দিয়েছিল।