স্টেডিয়ামে দর্শকদের মাতামাতি © সংগৃহীত
হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করছেন, লাফাচ্ছেন বা নাচছেন—এমন দৃশ্য কনসার্ট কিংবা খেলার মাঠে প্রায়ই দেখা যায়। অনেক সময় এমন উন্মাদনায় সিসমোমিটারে কম্পনও ধরা পড়ে। তবে প্রশ্ন হলো, এগুলো কি সত্যিই ভূমিকম্প?
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কনসার্ট বা খেলাধুলার আসরে মানুষের উচ্ছ্বাসে সৃষ্ট কম্পন নিয়ে প্রায়ই খবর প্রকাশ হয়। তাই কোনো রক ব্যান্ডকে ‘রিক্টার স্কেল কাঁপিয়ে দেওয়া’ বলাটা এখন আর শুধু রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয় না।
সম্প্রতি গ্রিসের এথেন্সে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হেভি মেটাল ব্যান্ড ‘মেটালিকা’র কনসার্টে প্রায় ৮০ হাজার দর্শক একসঙ্গে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। গ্রিক সংবাদমাধ্যম ই-কাথিমেরিনি জানায়, ওই সময় কনসার্টস্থলের কাছাকাছি থাকা ভূমিকম্প পরিমাপক যন্ত্রে মৃদু কম্পন ধরা পড়ে।
তবে এমন ঘটনা মানেই যে ভূমিকম্প হয়েছে, তা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের এই উচ্ছ্বাসে মাটিতে কম্পন সৃষ্টি হলেও তা কখনোই প্রাকৃতিক ভূমিকম্প নয়।
ইউএসজিএস আর্থকোয়েক হ্যাজার্ড প্রোগ্রামের সহকারী সমন্বয়কারী ড. উইলিয়াম বার্নহার্ট বলেন, ‘পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা মাটিতে কম্পন তৈরি করতে পারে। আর সিসমোমিটার নামের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রটির কাজই হলো সেই কম্পনগুলোকে রেকর্ড করা। ভূমিকম্প হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা কম্পন তৈরি করে এবং সিসমোমিটার তা রেকর্ড করে।’
তিনি জানান, যখন ৫০ বা ৬০ হাজার মানুষ একসঙ্গে স্টেডিয়াম বা কনসার্টে চিৎকার করেন, লাফান কিংবা নাচেন, তখন তাদের সম্মিলিত শক্তিতে মাটিতে সামান্য কম্পন তৈরি হয়। কাছাকাছি থাকা সিসমোমিটার সেই কম্পন শনাক্ত করতে পারে।
ড. বার্নহার্ট আরও বলেন, ‘অন্যান্য অনেক জিনিসও এই কম্পন তৈরি করে। আসলে যা কিছুই মাটিকে ঝাঁকুনি দেয়, সিসমোমিটার তা-ই রেকর্ড করে। সুতরাং, আপনি যদি একটি স্টেডিয়ামে প্রচুর মানুষকে একসঙ্গে জড়ো করেন এবং তারা খুব উত্তেজিত হয়ে চিৎকার ও লাফালাফি শুরু করে, তবে তা মাটিতে কম্পন তৈরি করে এবং এই যন্ত্রগুলো তা রেকর্ড করে।’
বিশেষজ্ঞরা জানান, এই ধরনের ক্ষুদ্র কম্পন এবং প্রাকৃতিক ভূমিকম্পের মধ্যে পার্থক্য সহজেই বোঝা যায়। কারণ দুটি কম্পনের বৈশিষ্ট্য এক নয়।
ড. বার্নহার্ট বলেন, ‘যখন মেটালিকোয়েকস’ ঘটে, বিশেষ করে যখন তারা ১৯৯১ সালের হিট গান ‘এন্টার স্যান্ডম্যান’ বাজাতে শুরু করে এবং সবাই একসঙ্গে একইভাবে নাচতে থাকে, তখন সেই শব্দ বা কম্পন খুব তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ সবাই একই সময়ে এবং একই ফ্রিকোয়েন্সিতে এটি করে। এর ফলে সেই কম্পন তরঙ্গগুলো বড় হয়ে ওঠে এবং যন্ত্রগুলোতে একটি বিশাল সংকেত বা রিডিং হিসেবে খুব ভালোভাবে ধরা পড়ে।’
এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল ২০২৫ সালের ৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেকের লেন স্টেডিয়ামে। সেখানে ৬০ হাজারের বেশি দর্শক মেটালিকার ‘এন্টার স্যান্ডম্যান’ গানের সঙ্গে একসঙ্গে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলে একটি ‘মেটালিকোয়েক’ তৈরি হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে।
খেলার মাঠেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালের ৮ জানুয়ারি এনএফএলের ওয়াইল্ড কার্ড প্লে-অফে সিয়াটল সিহকসের রানিং ব্যাক মার্শাউন লিঞ্চ ৬৭ গজ দৌড়ে স্মরণীয় টাচডাউন করেন। সেই মুহূর্তে ৬৫ হাজারের বেশি দর্শকের গর্জনে প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট সিসমিক নেটওয়ার্কে ২.০ মাত্রার সমতুল্য কম্পন ধরা পড়ে। ইতিহাসে ঘটনাটি ‘বিস্টকোয়েক’ নামে পরিচিত।
শুধু খেলাধুলা নয়, সংগীত জগতেও এমন নজির রয়েছে। টেইলর সুইফটের ‘ইরাস ট্যুর’ চলাকালে বিশ্বের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে ‘সুইফটকোয়েক’ নামে পরিচিত কম্পন রেকর্ড করা হয়। বিশেষ করে তার জনপ্রিয় গান ‘শেক ইট অফ’ পরিবেশনের সময় ভক্তদের সম্মিলিত নাচ ও উল্লাসে লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে প্রায় ২.০ মাত্রার সমতুল্য কম্পন ধরা পড়ে।
অনেক স্টেডিয়ামে আগে থেকেই বিশেষ পরিমাপক যন্ত্র বসানো থাকে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে প্রকৌশলীরা ভবনটি ভূমিকম্পের সময় কতটা নিরাপদ থাকবে, তা পরীক্ষা করেন।
ড. বার্নহার্ট বলেন, ‘প্রকৌশলীরা কনসার্ট এবং খেলাধুলার এই কম্পনগুলোকে একটি পরীক্ষামূলক উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তাঁরা বোঝার চেষ্টা করেন যে, বিভিন্ন ধরণের ভূমিকম্পের শক্তি ভবনগুলো কতটা সহ্য করতে পারবে।’
তিনি আরও জানান, যেসব এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি, সেখানে বড় স্টেডিয়ামগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়, যাতে তারা শক্তিশালী ভূমিকম্পও সহ্য করতে পারে। দর্শকদের চিৎকার বা লাফালাফিতে যে কম্পন তৈরি হয়, তা আসল ভূমিকম্পের তুলনায় অনেক দুর্বল।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, মানুষের কিছু কর্মকাণ্ড বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে। তেল ও গ্যাস উত্তোলন, বর্জ্য পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করানো এবং খনির মতো কার্যক্রমের কারণে মানবসৃষ্ট ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে কনসার্টে গান গাওয়া, খেলার মাঠে গোল উদযাপন কিংবা হাজারো মানুষের একসঙ্গে উল্লাস—এসব থেকে বড় কোনো প্রাকৃতিক ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তাই কনসার্টপ্রেমী, ক্রীড়াপ্রেমী বা সংগীতভক্তদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।