রোনালদো ও ইয়ামাল © টিডিসি ফটো
দুই জনের বয়সের ব্যবধান ২৩। এক প্রান্তে ৪১ বছর বয়সেও গোলের ক্ষুধা না হারানো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, অন্য প্রান্তে ১৮ বছরের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল। সোমবার (আজ) ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে পর্তুগাল ও স্পেন। তবে ম্যাচটি শুধু দুই দলের লড়াই নয়, এটি যেন দুই প্রজন্মের, দুই যুগের এবং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও লড়াই। একদিকে অভিজ্ঞতার পাহাড়, অন্যদিকে তরুণ প্রতিভার ঝলক। ফলে ডালাসের মাঠে সবার চোখ থাকবে রোনালদো ও ইয়ামালের দিকেই।
রোনালদো যখন ২০০৬ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিলেন, তখন লামিন ইয়ামালের জন্মই হয়নি। এরপর ফুটবল ইতিহাসে একের পর এক অধ্যায় লিখেছেন পর্তুগিজ মহাতারকা। প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রথম ব্যালন ডি'অর, পাঁচটি ব্যালন ডি'অর, অসংখ্য শিরোপা—সবই এসেছে ইয়ামালের শৈশবের অনেক আগে। আর এখন সেই ইয়ামালই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দাঁড়িয়ে রোনালদোর প্রতিপক্ষ।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করার পর রোনালদোর বিপক্ষে খেলার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ইয়ামাল বলেন, ‘শেষ ১৬-তে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মুখোমুখি হওয়া? প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া নাকি পর্তুগাল, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। তবে প্রতিপক্ষ যদি তিনি হন, তবে সেটি হবে এক বিরাট সম্মান। আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ম্যাচটা জেতা।’
দুজনের একমাত্র দেখা হয়েছিল ২০২৫ সালের ৮ জুন উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে। নির্ধারিত সময়ে স্পেন দুবার এগিয়ে গেলেও রোনালদোর নেতৃত্বে ২-২ সমতায় ফেরে পর্তুগাল। অতিরিক্ত সময়ে ইয়ামাল মাঠ ছাড়ার পর টাইব্রেকারে ৫-৩ ব্যবধানে শিরোপা জেতে পর্তুগাল। সেই হারের স্মৃতি এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে বদলে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন স্পেনের এই তরুণ উইঙ্গার।
চলতি বিশ্বকাপেও দুই তারকা নিজেদের ছাপ রেখেছেন ভিন্ন ভিন্নভাবে। ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েছেন রোনালদো। ২০০৬ সালে শুরু হওয়া যাত্রায় বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা এখন ১১।
অন্যদিকে ইয়ামাল সৌদি আরবের বিপক্ষে স্পেনের হয়ে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেছেন। তবে গোলের চেয়ে বেশি আলোচনায় তার ড্রিবলিং। পরিসংখ্যান সংস্থা অপটার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ১২টি সফল ড্রিবল সম্পন্ন করছেন তিনি। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার জে-জে ওকোচার পর আর কোনো ফুটবলার বিশ্বকাপে এমন গড় ধরে রাখতে পারেননি।
শুধু ড্রিবলিং নয়, বয়সভিত্তিক আরেকটি রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন ইয়ামাল। মাত্র ১৮ বছর ৩৫৪ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে বড় টুর্নামেন্টে ১০টি জয় পাওয়া সবচেয়ে কম বয়সী ফুটবলার এখন তিনি। এতে ভেঙেছেন কিলিয়ান এমবাপের রেকর্ড।
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে ইয়ামালের তুলনা করা হচ্ছে। তবে সেই তুলনায় নিজেকে জড়াতে চান না স্প্যানিশ এই ফুটবলার। ২০২৪ ইউরোর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘দিনের শেষে, আমার মনে হয় কারও সাথে নিজের তুলনা না করাই শ্রেয়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো খেলোয়াড়রা যা অর্জন করেছেন, তা সম্ভব হয়েছে কারণ তারা অন্য কারও মতো হতে চাননি, নিজেদের মতো হতে চেয়েছেন। আমি কেবল আমার নিজের পথটা তৈরি করতে চাই।’
ইয়ামালের প্রতিভার প্রশংসা করেছেন রোনালদোও। পর্তুগিজ অধিনায়ক বলেন, ‘লামিনে ইয়ামালের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। ও খুবই ভালো করছে।’ স্পেন সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘আমি সব সময় স্পেনের দুর্দান্ত দলগত খেলার প্রতি আকৃষ্ট থেকেছি। ওরা দারুণ ফুটবল খেলে।’
এর আগেও তরুণ এই তারকাকে নিয়ে রোনালদো বলেছিলেন, ‘ইয়ামালের প্রতিভা প্রচুর। ওকে ওর মতো খেলতে দিন। চাপ বাড়াবেন না।’
অন্যদিকে নেশনস লিগ জয়ের পর পর্তুগাল কোচও সবাইকে ইয়ামালের প্রতি ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘সে মাত্র ১৭ বছরের একটা ছেলে, ওর এখনো অনেক উন্নতি করার বাকি আছে। ও একটা বিস্ময় বালক, কিন্তু ওকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া উচিত।’
এই ম্যাচকে ঘিরে আলোচনার আরেকটি কারণ রোনালদোর ভবিষ্যৎ। স্পেন ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিশ্চিত করেছেন, এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ। তাই বিদায়ের আগে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় লিখতে মরিয়া পাঁচবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই কিংবদন্তি।
তবে মাঠের লড়াই শুধু রোনালদো বনাম ইয়ামালে সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্পেনের হয়ে চলতি বিশ্বকাপে চার গোল করে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন মিকেল ওয়ারসাবাল। অন্যদিকে পর্তুগালের আক্রমণে গনসালো রামোসও নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে প্রমাণ করছেন। দুই দলের মাঝমাঠও সমান শক্তিশালী হওয়ায় অনেকেই ম্যাচটিকে দুই সেরা মিডফিল্ডের লড়াই হিসেবেও দেখছেন।
স্পেন ও পর্তুগালের এই দ্বৈরথকে বলা হয় ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দুই প্রতিবেশী দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবার গড়াচ্ছে বিশ্বকাপের মঞ্চে। তবে সব আলো কেড়ে নিয়েছে দুই প্রজন্মের দুই মহাতারকা। একদিকে বিদায়ের প্রহর গোনা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন হয়ে ওঠা লামিন ইয়ামাল। ডালাসে তাই শুধু একটি নকআউট ম্যাচ নয়, ফুটবল বিশ্ব হয়তো দেখবে এক যুগ থেকে আরেক যুগে আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক স্মরণীয় মুহূর্ত।