আলোচিত সেই বিড়াল © টিডিসি ফটো
কাতার বিশ্বকাপের বহুল আলোচিত একটি বিড়ালকে টেবিল থেকে ছুড়ে ফেলার পর থেকেই যেন পথ হারিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। সুন্দর ফুটবলের ধারক ‘জোগো বোনিতো’ খ্যাত সেলেসাওরা একের পর এক টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়ে এখন এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দি।
সর্বশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পর ফুটবল বিশ্বে আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে সেই রহস্যময় বিড়ালের ‘অভিশাপ’ তত্ত্ব। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে ইসলামী সংস্কৃতিতে পবিত্র হিসেবে গণ্য করা বিড়ালের প্রতি রূঢ় আচরণের পর থেকেই মূলত শুরু হয়েছে ব্রাজিলের এই মহাবিপর্যয়, যার মাশুল তারা আজও দিয়ে যাচ্ছে।
আর্লিং হালান্ডের দুর্দান্ত ফুটবলের ওপর ভর করে নরওয়ে এবার বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে ব্রাজিলকে বিদায় করে দিয়েছে। নকআউট পর্বের প্রথম ধাপেই এই ২-১ ব্যবধানের পরাজয়টি ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের পর বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের সবচেয়ে দ্রুততম বিদায়ের লজ্জাজনক রেকর্ড। আর এই ঐতিহাসিক পতনের পর ফুটবলপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের অনেকেই অতীতের পাতা হাতড়ে মেলাচ্ছেন কাতারের সেই বিতর্কিত ঘটনাকে, যেখানে ফুটবলীয় দক্ষতার চেয়ে একটি অতিপ্রাকৃতিক বা মনস্তাত্ত্বিক ‘অভিশাপ’কে দায়ী করা হচ্ছে বেশি।
সবকিছুর সূত্রপাত হয়েছিল কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ঠিক কয়েক দিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে। ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়র যখন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হচ্ছিলেন, তখন একটি বিড়াল আচমকা এসে তার সামনের টেবিলের ওপর শুয়ে পড়ে। সেই সময় ব্রাজিলের মিডিয়া ম্যানেজার ভিনিসিয়ুস রদ্রিগেস বিড়ালটির পিঠ শক্ত করে চেপে ধরে টেবিল থেকে বেশ রুঢ়ভাবে নিচে ফেলে দেন। উপস্থিত সাংবাদিকরা এই কাণ্ড দেখে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যান এবং ভিনিসিয়ুস নিজেও তখন কিছুটা অস্বস্তিকরভাবে হাসছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় তোলে।
ইসলাম ধর্মে বিড়ালকে একটি অত্যন্ত পবিত্র প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিশ্বাস অনুযায়ী, বিড়াল ছিল মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় প্রাণী, যার কারণে মুসলিম সংস্কৃতিতে বিড়ালরা বিশেষ মর্যাদা পায়। কাতারের রাজধানী দোহার রাস্তাগুলোতে এই প্রাণীদের অবাধ বিচরণ এবং তাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা তারই প্রমাণ। ফলে ইসলামী সংস্কৃতিতে বিড়ালের সাথে যেকোনো ধরনের খারাপ আচরণ বা নির্যাতনকে একটি বড় পাপ এবং ঐশ্বরিক শাস্তির যোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে এবং এই সম্ভাব্য ‘অভিশাপ’ এড়াতে ব্রাজিল দল পরবর্তীতে সেই বিড়ালটিকে দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নেতিবাচক প্রচারণা সামাল দিতে এবং দলের ভাগ্য ফেরাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলেও খেলোয়াড়রা আরেকটি বিতর্কিত কাণ্ড ঘটান। তারা বিড়ালটির নাম রাখেন ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। তবে ভাগ্যকে এভাবে উপহাস করার ফল মোটেও ভালো হয়নি ব্রাজিলের জন্য।
এর ঠিক কয়েক দিন পরই ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ব্রুনো পেতকোভিচের শেষ মুহূর্তের গোলে ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন টাইব্রেকারে গিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। পেনাল্টি শুটআউটে রদ্রিগো ও মার্কুইনহোসের ব্যর্থতায় বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর ব্রাজিলের সেই দুঃসময় আর কাটেনি। কাতার থেকে শুরু হওয়া সেই কালো অধ্যায় গত কয়েক বছরে আরও দীর্ঘ ও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কাতার বিশ্বকাপের সেই বিড়াল কাণ্ডের পর থেকে ব্রাজিল এ পর্যন্ত মোট ৪৩টি ম্যাচ খেলেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বকাপ, মহাদেশীয় বাছাইপর্ব, কোপা আমেরিকা ও বিভিন্ন প্রীতি ম্যাচ। সামগ্রিক বিচারে ২০টি জয়, ১২টি ড্র এবং ১১টি পরাজয়ের খতিয়ান ব্রাজিলের মতো পরাশক্তির চেনা ঐতিহ্যের সাথে একেবারেই বেমানান। বিশেষ করে ড্র হওয়া ম্যাচগুলোর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচে তারা পেনাল্টিতে হেরে বিদায় নিয়েছে।
বিশ্বকাপের পর প্রীতি ম্যাচে মরক্কো ও সেনেগালের কাছে হার দিয়ে ব্রাজিলের নতুন যাত্রা শুরু হয়। এরপর বাছাইপর্বে নিজেদের মাঠে ভেনেজুয়েলার সাথে ড্র করার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে, যা ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বার। এরপরই আসে সবচেয়ে বড় ধাক্কা; উরুগুয়ে, কলম্বিয়া এবং চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে টানা তিনটি ম্যাচে হেরে যায় ব্রাজিল। আর্জেন্টিনার কাছে এই হারের মাধ্যমে বাছাইপর্বের ইতিহাসে নিজেদের মাঠে ব্রাজিলের কখনো না হারার গৌরবময় রেকর্ডটি ধুলোয় মিশে যায়।
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাতেও ব্রাজিলের ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। গ্রুপ পর্বে কোস্টারিকার সাথে ড্র করে রানার্স-আপ হওয়া এবং কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে শেষ ১৫ মিনিট একজন বেশি খেলোয়াড় নিয়ে খেলেও পেনাল্টি শুটআউটে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের। এরপর মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার কাছে রীতিমতো বিধ্বস্ত হয়ে বাছাইপর্বের একই সংস্করণে হোম ও অ্যাওয়ে—উভয় ম্যাচেই চিরশত্রুদের কাছে হারার লজ্জাজনক রেকর্ড গড়ে সেলেসাওরা।
এই শতাব্দীর অন্যতম বাজে সময়ে এসে ব্রাজিলের ত্রাতা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল হাই-প্রোফাইল কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে। তিনি ১৭টি ম্যাচের মধ্যে ১০টিতে জয় পেলেও বিশ্বকাপের আগে বাছাইপর্বে বলিভিয়া এবং প্রীতি ম্যাচে জাপানের কাছে হেরে বসেন। এমনকি তিউনিসিয়া ও ফ্রান্সের সাথেও ড্র করে তার দল, যা বিশ্বকাপের আগে তাদের প্রস্তুতিকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
অবশেষে মূল ২০২৬ বিশ্বকাপে এসেও সেই একই দৈন্যদশা ফুটে ওঠে। প্রথম ম্যাচেই মরক্কোর সাথে ড্র করার পর হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিয়েছিল ব্রাজিল। শেষ বত্রিশের ম্যাচে জাপানের বিরুদ্ধে অনেক কষ্ট করে জিতলেও, শেষ ষোলোর লড়াইয়ে কৌশলী নরওয়ের সামনে আর টিকতে পারেনি তারা। নরওয়ে ম্যাচের বেশির ভাগ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্রাজিলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে ম্যাচটি জিতে নেয় ২-১ ব্যবধানে। মাঠের ব্যর্থতা আর মাঠের বাইরের এই অবিশ্বাস্য পতন দেখে ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন—কবে কাটবে ব্রাজিলের এই ‘বিড়ালের অভিশাপ’?