নাগেলসম্যান © টিডিসি ফটো
অতিরিক্ত সময়ে জোনাথান তাহর হেডে জার্মানি যখন ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল, তখন শেষ ষোলোয় জয়ের স্বপ্ন দেখছিল জার্মান সমর্থকেরা। কিন্তু ভিএআরের হস্তক্ষেপে সেই গোল বাতিল হওয়ার পর মুহূর্তেই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে প্যারাগুয়ের কাছে বিদায় নিতে হয় জার্মানিকে। ম্যাচ শেষে ভিএআরের সিদ্ধান্তকে ঘিরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধান কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান। একই সঙ্গে সাবেক রেফারি ও ফুটবল বিশ্লেষকরাও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের ১০৩তম মিনিটে নাথানিয়েল ব্রাউনের কর্নার থেকে দূরের পোস্টে শক্তিশালী হেডে বল জালে জড়ান জোনাথান তাহ। তখন মনে হচ্ছিল, জার্মানির জয় নিশ্চিত করতে চলেছেন তিনি। কিন্তু গোল হওয়ার আগে ভালদেমার আন্তন ও প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের মধ্যে হওয়া দ্বৈরথ ভিএআরের মাধ্যমে পর্যালোচনা করেন রেফারি জালাল জায়েদ। পরে তিনি সেটিকে ফাউল হিসেবে চিহ্নিত করে গোল বাতিল করেন।
ম্যাচ শেষে জেডডিএফকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় নাগেলসম্যান বলেন, ‘আমরা একটি গোল করেছি। কিন্তু তিনি সেটি বাতিল করেছেন, যা একেবারেই কেলেঙ্কারি। তিনি কী দেখেছেন, আমার কোনো ধারণা নেই। এটা সত্যিই হাস্যকর।’
এরপর আরও ক্ষোভ ঝাড়েন জার্মান কোচ। তিনি বলেন, ‘এটি অনেকটা ইউরো ২০২৪-এ স্পেনের বিপক্ষে আমাদের না পাওয়া পেনাল্টির মতো ঘটনা। কিছু ম্যাচে আপনি অনেক গোল করার সুযোগ পান, আবার কিছু ম্যাচ আপনাকে কঠিন লড়াই করে জিততে হয়। আমার মনে হয়, আমরা ম্যাচটি সেভাবেই জিততাম। আমি ঘটনাটি আবার দেখলাম। এটি শুধু কেলেঙ্কারি নয়, এটি বড় ধরনের কেলেঙ্কারি। এখানে ফাউলের সামান্যতম কিছুই ছিল না।’
ম্যাজেন্টা টিভিতে বিশ্লেষকের দায়িত্ব পালন করা ইয়ুর্গেন ক্লপও রেফারির সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘যদি এই গোলটি বৈধ না হয়, তাহলে আর্সেনালও ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়ন নয়। তারা তাদের প্রায় ৬০ শতাংশ গোল এভাবেই করেছে। সিদ্ধান্তটি অবিশ্বাস্য।’
সাবেক জার্মান রেফারি ম্যানুয়েল গ্র্যাফেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘২-১ গোলটি বাতিল করা একেবারেই হাস্যকর। তবে এই বিশ্বকাপে যেসব বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হয়েছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা। এখানে সংস্পর্শ ছিল, কিন্তু কোনোভাবেই ফাউল ছিল না। পুরো ঘটনাটি উদ্ভট।’
তবে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন, এমন নয়। সাবেক ফ্রাইবুর্গ কোচ ক্রিশ্চিয়ান স্ট্রাইখ ভিন্ন মত দিয়েছেন। জেডডিএফকে তিনি বলেন, ‘আমি ঘটনাটি ভিন্নভাবে দেখেছি। আমি রেফারি নই। আমার কাছে মনে হয়েছে, গোলরক্ষক বল ধরতে বের হতে চেয়েছিলেন, আর আন্তন তাকে আটকে দিয়েছিল। আমার কাছে প্রশ্ন হলো, গোলরক্ষক বল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতেন কি না। আন্তন তার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, ফলে গোলরক্ষক বের হতে পারেননি। আমার মতে, খেলার মধ্যে এভাবে পথ আটকে দেওয়া সাধারণত ফাউল।’
সাবেক রেফারি ও টেলিভিশন বিশ্লেষক প্যাট্রিক ইট্রিশও গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। ম্যাজেন্টা টিভিতে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে সিদ্ধান্তটি অতিরিক্ত কঠোর মনে হয়েছে। গোলরক্ষকের সঙ্গে কিছুটা সংস্পর্শ হয়েছিল, কিন্তু আমি কোনো ধাক্কা দেওয়া, সরিয়ে দেওয়া বা ধরে রাখার ঘটনা দেখিনি।’
ঘটনার সময় আন্তনের হালকা সংস্পর্শে অরল্যান্ডো গিল মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। তবে তাহ হেডে গোল করার সময় তিনি আবার উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। রেফারি জালাল জায়েদ সাইডলাইনের ভিএআর মনিটরে ঘটনাটি দেখতে যাওয়ার সময় দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে জার্মান কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান এবং প্যারাগুয়ের কোচ গুস্তাভো আলফারো—দুজনকেই হলুদ কার্ড দেখান মরক্কোর এই রেফারি।
ইট্রিশ আরও বলেন, ‘এখন আর পাঁচ গজ বক্সে গোলরক্ষকের জন্য আলাদা কোনো সুরক্ষা নেই। আন্তন তার হাত ধরেনি, ধাক্কা দেয়নি কিংবা চেপে রাখেনি। আমার মতে, এই ঘটনায় ভিএআরের হস্তক্ষেপ করার কোনো প্রয়োজনই ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘হ্যাঁ, সামান্য ধাক্কাধাক্কি হয়েছিল। কিন্তু সেটি খেলার স্বাভাবিক অংশ। এমন কিছু হয়নি, যাতে ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারত বা করা উচিত ছিল।’
এরপর তিনি যোগ করেন, ‘এ ছাড়া ভিডিও দেখে রেফারির নিজের সিদ্ধান্ত নতুন করে মূল্যায়ন করার সুযোগও ছিল।’
দীর্ঘদিনের বুন্দেসলিগা রেফারি ইট্রিশ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমার মতে, এটি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। শেষ পর্যন্ত রেফারি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সেটি সঠিক ছিল না।’
ম্যানুয়েল গ্র্যাফে একই ম্যাচে লিওন গোরেৎসকার ওপর হওয়া একটি বিতর্কিত ঘটনার সঙ্গেও এই সিদ্ধান্তের তুলনা করেন। তিনি বলেন, ‘যদি আন্তনের ঘটনাকে ফাউল ধরা হয়, তাহলে তার আগে গোরেৎসকাকে ধরে রাখার ঘটনাতেও অবশ্যই পেনাল্টি দিতে হতো। এটি একেবারেই হাস্যকর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বিশ্বকাপে এমন সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়।’