লুকা জিদান © সংগৃহীত
বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসে সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তিতে রূপ নিয়েছে কিছু নাম। জিনেদিন জিদান তেমনই এক নাম। ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতানো সেই মহাতারকার নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীল জার্সিতে ছন্দময় এক ফুটবল শিল্প।
কিন্তু ফুটবলের এই গল্প-শিল্প কখনও কখনও শুধু মাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কিছু গল্প শেকড়, পরিচয় আর অনুভূতির গভীরতম জায়গা থেকেও জন্ম নেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপ এমনই এক আবেগঘন গল্পের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। এই গল্প জুড়েও আছেন জিদানের পরিবারের একজন সদস্য। বিশ্বমঞ্চে তিনি নামবেন ঠিকই, তবে ফ্রান্সের নয়, বরং আলজেরিয়ার জার্সিতে তাকে দেখা যাবে।
তিনি জিনেদিন জিদানের দ্বিতীয় পুত্র লুকা জিদান। এবার আলজেরিয়ার বিশ্বকাপ দলে আছেন তিনি। কিন্তু ২৭ বছর বয়সী এই গোলকিপারের এই সিদ্ধান্ত ফুটবলবিশ্বে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। তার জন্ম ফ্রান্সে, বেড়ে ওঠাও সেখানেই, এমনকি ফরাসি বয়সভিত্তিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্বও করেছেন। তাহলে, কেন আলজেরিয়ার হয়ে বিশ্বমঞ্চ মাতাবেন?
অবশ্য, এই প্রশ্নের উত্তর মেলাতে কয়েক দশক পেছনে ফিরে যেতে হবে। জিদানের জন্ম ফ্রান্সে। তবে তার পরিবারের শেকড় উত্তর আফ্রিকার মাটিতে। আলজেরিয়ার কাবাইল অঞ্চলের সন্তান জিদানের বাবা-মা। জীবিকার সন্ধানে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। তবে নতুন দেশে জীবন গড়লেও নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক কখনও ছিন্ন করেননি। সেই উত্তরাধিকারই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে বেড়াচ্ছে। লুকার কাছেও পরিবারের গল্প, শৈশবের স্মৃতি আর পূর্বপুরুষদের পরিচয়ের এক জীবন্ত প্রতীক।
নিজের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে একাধিকবার তার দাদার প্রসঙ্গ টেনেছেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই দাদার মুখে আলজেরিয়ার গল্প শুনেছেন। সংস্কৃতি, ইতিহাস আর সেই মাটির প্রতি ভালোবাসার কথাও তার রন্ধে রন্ধে গেঁথে গিয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই গল্পগুলোও যেন তার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। উপলব্ধি করেন, আলজেরিয়ার জার্সি গায়ে তোলার সিদ্ধান্ত।
লুকার ভাষায়, আলজেরিয়ার নাম শুনলেই তার মনে পড়ে পরিবারের কথা। মনে পড়ে দাদা-দাদির মুখ, তাদের গল্প, তাদের স্বপ্ন। পূর্বপুরুষদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করা তার কাছে দায়বদ্ধতাও।
অবশ্য বাস্তবতার আরেকটি দিকও উঠে এসেছে। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে নিয়মিত খেললেও ফ্রান্সের সিনিয়র দলে সুযোগ পাননি লুকা। অন্যদিকে তাকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেছে আলজেরিয়া। দেশটির ফুটবল ফেডারেশন ও কোচিং স্টাফের আস্থা তার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।
সুযোগ মেলার পর হতাশ করেননি লুকাও। আলজেরিয়ার জার্সিতে অভিষেকের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে প্রথম বড় মঞ্চে ক্লিনশিট রেখে নজর কাড়েন। ধীরে ধীরে জাতীয় দলের গোলপোস্টে নির্ভরতার প্রতীকও হয়ে উঠেন তিনি।
তবে লুকার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হয়তো অন্য জায়গাতেই। ক্লাব ফুটবলে সাধারণত জার্সির পেছনে ‘লুকা’ নামটি ব্যবহার করেন। কিন্তু আলজেরিয়ার জার্সিতে ‘জিদান’ নামটি বেছে নিয়েছেন। এর নেপথ্য হলো- লুকার কাছে, পরিবারের ইতিহাস, পূর্বপুরুষদের সংগ্রাম এবং একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতীক ‘জিদান’ নামটি। এই সিদ্ধান্তে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন তার বাবা জিনেদিন জিদানও।