সোমালিয়ার রেফারি ওমর আব্দুলকাদির আরতান © সংগৃহীত
সোমালি রেফারিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগেই নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে। বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য মনোনীত সোমালিয়ার রেফারি ওমর আব্দুলকাদির আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে ম্যাচ পরিচালনা করা প্রথম সোমালি রেফারি হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যেতে বসেছে তার। একই সঙ্গে এ ঘটনায় ফিফার ভূমিকা এবং আয়োজক দেশগুলোর অভিবাসন নীতিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ফিফার ঘোষিত ৫২ জন বিশ্বকাপ রেফারির তালিকায় ছিলেন ৩৩ বছর বয়সী আরতান। আফ্রিকার অন্যতম সেরা রেফারি হিসেবে পরিচিত তিনি ২০১৮ সালে ফিফার ব্যাজ অর্জন করেন। এরপর আফ্রিকান ফুটবলে ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
তিনি বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব, আফ্রিকা কাপ অব নেশনস এবং আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেছেন। আফ্রিকান বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ছয়টি ম্যাচ পরিচালনার পাশাপাশি মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তার অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণেই বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ আসরে সুযোগ পেয়েছিলেন।
কিন্তু বিশ্বকাপে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পরই বাধার মুখে পড়েন আরতান। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) জানিয়েছে, শনিবার দক্ষিণ ফ্লোরিডায় পৌঁছানোর পর তাকে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ডিএইচএসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।’
তবে কী ধরনের উদ্বেগের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি মার্কিন কর্তৃপক্ষ। আরতান যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পেরেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, সফরের আগে তার বৈধ ভিসা ছিল।
ঘটনার পর ফিফাও একটি বিবৃতি দেয়। সংস্থাটি জানায়, ‘ফিফা নিশ্চিত করছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা পাওয়ায় মনোনীত রেফারি ওমর আব্দুলকাদির আরতান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে কোচিং বা ম্যাচ পরিচালনা করতে পারবেন না। ফিফা আয়োজক দেশগুলোর অভিবাসন প্রক্রিয়ায়, যার মধ্যে ভিসা প্রদানও অন্তর্ভুক্ত, অংশগ্রহণ করে না এবং কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে জনাব আরতানের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। ফিফার পূর্ববর্তী ঘটনাগুলোর মতোই, আয়োজক দেশের সরকারই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে কে ভিসা পাবে এবং কাকে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।’
ফিফার এই অবস্থান নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে নির্বাচিত একজন কর্মকর্তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সংস্থাটির আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল।
সোমালিয়া বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত দেশগুলোর একটি। ট্রাম্প অতীতে সোমালি জনগণ ও অভিবাসীদের নিয়ে একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। গত বছরের শেষ দিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সোমালি অভিবাসীদের ‘আবর্জনা’ বলে মন্তব্য করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।
আরতানের ঘটনা অবশ্য একক কোনো ঘটনা নয়। বিশ্বকাপকে ঘিরে অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা এর আগেও দেখা গেছে। ভিসা সমস্যার কারণে ইরানের জাতীয় দলকে মেক্সিকোতে অবস্থান করতে হচ্ছে। খেলোয়াড়রা শুধু ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারবেন, এরপর আবার মেক্সিকোতে ফিরে আসতে হবে। একই সঙ্গে দলের কয়েকজন কর্মকর্তা ভিসা পাননি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইরাকের প্রতিনিধিদলের ক্ষেত্রেও অনুরূপ সমস্যার কথা উঠে এসেছে।
এদিকে বিশ্বকাপ চলাকালে বিদেশি নাগরিকদের হয়রানি এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি সম্প্রতি বিশ্বকাপ চলাকালে শহরে অতিরিক্ত ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এজেন্ট মোতায়েনের পরিকল্পনার সমালোচনা করেন। বিশ্বকাপের একাধিক ম্যাচ এবং ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে নিউ জার্সিতে, যা নিউইয়র্কের খুব কাছেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মামদানি লেখেন, ‘অভিবাসীদের ছাড়া ফুটবল কল্পনাই করা যায় না। অভিবাসীরা খেলেন, কোচিং করান, স্টেডিয়ামে কাজ করেন, গ্যালারি পূর্ণ করেন এবং বিশ্বকাপের মতো আয়োজনকে সফল করে তোলেন। যুক্তরাষ্ট্র পুরুষ জাতীয় দলের ছয়জন খেলোয়াড়ও অভিবাসী।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আমরা আইসিই কিংবা অন্য কাউকে আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ছড়াতে দেব না, বিশেষ করে এমন একটি সময়ে। যখন পুরো বিশ্ব আমাদের শহরে আসছে, তখন আমরা আমাদের অভিবাসী প্রতিবেশীদের পাশে গর্বের সঙ্গে দাঁড়াব এবং এসব কর্মকাণ্ডকে বিভাজন তৈরির চেষ্টা হিসেবেই প্রত্যাখ্যান করব।’
ঘটনাটির সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর)।
সংগঠনটির উপপরিচালক এডওয়ার্ড আহমেদ মিচেল বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির জাতি বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে আমাদের দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা উচিত নয়। বিশেষ করে বিশ্বকাপে অংশ নিতে আসা কোনো কোচ, রেফারি বা অন্য কারও ক্ষেত্রে তো নয়ই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সোমালি দর্শনার্থীরাও অন্য সবার মতো একই ধরনের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান। কেউ যখন সেই কঠোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন, তখন শুধু তার জাতীয়তার কারণে তাকে নিষিদ্ধ করার কোনো যৌক্তিকতা থাকে না। এটি আমাদের মূল্যবোধ এবং আইনের পরিপন্থী।’
তবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ নিজেদের অবস্থানে অনড়। ডিএইচএস জানিয়েছে, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়, কোচ কিংবা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত ও বিমানবন্দরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত আলাদাভাবে নেওয়া হবে।
ডিএইচএসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি ব্যক্তির প্রবেশযোগ্যতা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিবিপি কর্মকর্তারা ভ্রমণকারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে, তল্লাশি চালাতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী তাদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।’
চলতি বছরের শুরুতে মোগাদিশুতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরতান বিশ্বকাপে দায়িত্ব পাওয়াকে জীবনের অন্যতম বড় অর্জন বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি জানান, সোমালিয়ায় দায়িত্ব পালনের সময় অনেকবার বিস্ফোরণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তাকে স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথ পরিবর্তন করতে হয়েছে।
তখন তিনি বলেছিলেন, ‘একজন রেফারি হিসেবে আপনি কখনো হাল ছাড়তে পারেন না। আপনার একটি লক্ষ্য থাকতে হবে। আমারও সেই লক্ষ্য ছিল, কিন্তু কাজটি মোটেও সহজ ছিল না।’
আরও বলেছিলেন, ‘আপনি যদি বিশ্বকাপের মতো জায়গায় পৌঁছাতে চান, তাহলে আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে এবং লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’
কিন্তু দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছানোর সেই স্বপ্ন এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির কারণে থমকে গেছে। ফলে বিশ্বকাপের আগে ফুটবলের বাইরের এক বিতর্কই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।