চব্বিশের ৪ অগাস্ট এক থানায় ১৫ জন পুলিশ হত্যার পর কী হয়েছে?

০১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৪ AM , আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৪ AM
২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট এনায়েতপুর থানায় হামলার পর ১৫ জন পুলিশ নিহত হন

২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট এনায়েতপুর থানায় হামলার পর ১৫ জন পুলিশ নিহত হন © সংগৃহীত

‘ছোটভাইকে ফোন করে বলেছিলাম আমাদের থানা অ্যাটাক করেছে। আমি মনে হয় আর বাঁচব না। সুযোগ নাই আমাদের বাঁচার। এটাই আমার শেষ কথা জীবনের। আমার সন্তানগুলো দেখে রাখিস। আমার সঙ্গে কথা হবে না আর। এই বলে আমি মোবাইলটা কেটে দিয়েছিলাম।’

সিরাজগঞ্জে এনায়েতপুর থানায় ২০২৪ সালের ৪ অগাস্টের হামলার দিনের ভয়াবহতা এভাবেই বর্ণনা করছিলেন বেঁচে যাওয়া পুলিশ আব্দুল মালেক। সেদিনের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে আব্দুল মালেক বলেন, তিনি পরিবারের কাছ থেকে ‘শেষ বিদায়’ নিয়েছিলেন।

আব্দুল মালেক প্রাণে রক্ষা পেলেও এনায়েতপুরে চার অগাস্টের হামলায় থানার অফিসার ইনচার্জসহ ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এর মধ্যে ঘটনার দিন থানার আশাপাশে ১৩ জন পুলিশের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহত একজনকে থানার পাশে বাজারে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।

এনায়েতপুর থানায় হামলা অগ্নিসংযোগের পর পুলিশ সদস্যদের অনেকে প্রাণ রক্ষায় থানার পেছনের দিক থেকে পালিয়ে বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুঁজে বের করে পুলিশ সদস্যের পিটিয়ে মারা হয়েছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।

থানার পেছনের বাড়ির একজন সদস্য জানান, তারা ভয়ে দরজা বন্ধ করে লুকিয়ে ছিলেন। ওই বাড়ির ভেতর বাথরুমে লুকিয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের বের করে পিটিয়ে মারার পর এক পর্যায়ে ওই বাড়ির সামনে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের মৃতদেহ জড়ো করা হয়েছিল।

সেদিন এনায়েতপুর থানার বহু অস্ত্র-গুলি লুট হয়ে যায়। থানার তথ্য অনুযায়ী ১৮টি রাইফেল, পিস্তল ও শটগানের মধ্যে এখনও ছয়টি অস্ত্র এবং অধিকাংশ গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। 

পুলিশ ও স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী এনায়েতপুরে সেদিন সকালের দিকে ৫-৬ হাজার আন্দোলনকারী মিছিল নিয়ে থানায় এসেছিল। প্রথম দফায় পুলিশের অনুরোধে আন্দোলনকারীরা ফিরে যায়। পরে সাড়ে ১২টা বা ১টার দিকে আবারো হাজারো মানুষ জড়ো হয়ে থানায় হামলা করে।

এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়েছিল। সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়া ৩ জন নিহত হয়েছিলেন।

এনায়েতপুর থানার সামনে গত সাত-আট বছর ধরে মৌসুমে আখ বিক্রি করা একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘৪ অগাস্ট তিনি আখ নিয়ে থানার সামনেই ছিলেন। তিনি দেখেছেন হাজার হাজার মানুষ মিছিল করে থানার দিকে আসে। তারা হাসিনার পতনের স্লোগান দিয়েছিল।’

থানায় হামলা ও সংঘর্ষের শুরুর পরই তিনি আখ ফেলে সেখান থেকে নিরাপদে চলে গিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন। আন্দোলনকারীদের তিনজন মৃত্যুর সম্পর্কে তিনি বলেন দুপুরের পর তাদের মৃত্যু খবর তারা জানতে পেরেছিলেন।

সেদিনের পরিস্থিতি সম্পর্কে পুলিশ উপ পরিদর্শক আব্দুল মালেক বলেন ‘অনেক লোকজন। হাজার হাজার মানুষ। সবাই মারমুখী আচরণ। এসে সরাসরি থানায় আক্রমণ করেছে’।

জুলাই আন্দোলনের সময় ওই থানা এলাকায় কোনো প্রাণঘাতী গুলি হয়নি বলেও দাবি করেন আব্দুল মালেক। ঘটনার দিন এক পর্যায়ে টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়।

‘যখন ভেতর ঢুকে থানায় আক্রমণ করে তখন। কিন্তু পরে আমরা আর কন্ট্রোল করতে পারি নাই। আমাদের ইচ্ছা ছিল না কাউকে গুলি করে মারব। লাস্টেতো আমরা নিজেরাই শেষ হয়ে গেলাম। আমাদের যদি ইচ্ছা থাকতো তাহলে আমরাতো থানার বাউন্ডারিতে ঢোকার আগেই দশ পনেরটা ফেলায় দিতে পারতাম।’

আব্দুল মালেক বলেন, ‘সেদিন থানার পানির ট্যংকির নিচে ওসি তদন্তসহ চারজন লুকিয়ে ছিলেন। পরে সন্ধ্যার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে সেখান থেকে আহত অবস্থায় তাদেরকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। ৪ তারিখের ঘটনার পরে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে এনায়েতপুর থেকে সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ৬ অগাস্ট তাদেরকে লাশবাহী গাড়িতে কাফনের কাপড়ে মুড়ে নিতে হয়েছিল।’

‘চিকিৎসকদের বলেছিলাম আমি এখানে থাকব না আমাকে ছেড়ে দেন। বলছিল এ পরিস্থিতিতে যেতে পারবেন না। আমি বলছিলাম স্যার আমারতো মৃত্যু হয়ে গেছে স্যার শুধু বডিটা শুধু বেঁচে আছে। পরবর্তীতে আমাদের কয়েকজনকে লাশবাহী গাড়িতে সাদা কাফনের কাপড় পরায়ে পাঠিয়ে দেয় পুলিশ সুপার অফিসে।’

অন্তঃসত্ত্বা কনস্টেবল মৃত্যুর গুজব

এনায়েতপুর থানায় হামলার দিন মোট ৫৭ জন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত ছিলেন বলে জানা যায়। এর যার মধ্যে ৩ জন ছিলেন নারী কনস্টেবল। বেঁচে যাওয়া একজন নারী কনস্টেবল বলেন, থানায় আগুন দেয়ার সময় ২ জন নারী পুলিশ থানার ভেতর ছিল।

এক পর্যায়ে তারা লুকিয়ে থাকতে না পেরে পেছন দিক থেকে স্থানীয় একটি বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি এবং তার সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যদের বেধড়ক পেটানো হয়। মারধরের এক পর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। সন্ধ্যার দিকে জ্ঞান ফিরে দেখেন তিনি হাসপাতালে।

সিরাজগঞ্জে নিহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে একজন অন্তঃস্বত্ত্বা কনস্টেবল ছিল এমন আলোচনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। এনায়েতপুরে অন্তস্বত্বা পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যুর যে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল সেটি তার ঘটনা বলেও পরে বুঝতে পারেন বলে উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, ওই সময় তিনি অন্তস্বত্ত্বা ছিলেন না। থানার ছয়জন নারী পুলিশের মধ্যে তিনজন নারী সেসময় মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন। হামলাকারীদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচাতে এক সহকর্মী কনস্টেবল তাকে অন্তঃস্বত্ত্বা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

‘আমার অনেক পেট ব্যাথা হয়েছিল। পেটের ব্যাথায় থাকতে পারছিলাম না। আমাদের পুলিশের একটা ভাইয়া বলেছিল ওর পেটে বাচ্চা আছে। যখন বলছিল পেটে বাচ্চা তারা আমাকে বাঁচানোর জন্য কয়েকটার বাইরের ছেলে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। তারা শুধু বলতেছিল তাকে মেরনা তার পেটে বাচ্চা আছে।’

নারী পুলিশ সদস্যের ধারণা ওই ছেলেরাই তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অন্তঃস্বত্ত্বা শোনার পরেও তাকে আঘাত করা এবং মারধর করা থামানো হয়নি। মারধরের এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন এবং সন্ধ্যার দিকে জ্ঞান ফিরলে তিনি নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পান।

‘থানার বাইরে একটা বাড়িতে ছিলাম ওইখানে আমাদের উপর আক্রমণ হয়। আমার পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। মাথায় সেলাই দিতে হয়েছিল।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নারী কনস্টেবল জানান তাকে যিনি বাঁচাতে চেয়েছিলেন সেই পুলিশ কনস্টেবল রবিউল ইসলামকেও সেদিন পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

পুলিশ হত্যায় মামলা ও গ্রেফতার

এনায়েতপুরে পুলিশ হত্যার ঘটনায় ওই বছর ২৬ আগস্ট একটি হত্যা মামলা হয় যেখানে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় চারজন নেতা এবং অজ্ঞাত ৫/৬ হাজার জনকে আসামি করা হয়। ওই মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছিল এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহম্মদ মোস্তফা খান বাচ্চুকে। তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন।

এনায়েতপুরে পুলিশ হত্যার এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে সিরাজগঞ্জের আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন কারাগারে ছিলেন। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের সাবেক এমপি ও মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস পুলিশ হত্যা মামলায় আসামী হিসেবে গ্রেফতার হয়ে এক বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন।

সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী হত্যা মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে বলেও জানান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমান। তিনি জানান এনায়েতপুর হত্যাকাণ্ডের চারটি মামলা হয়েছিল একটি পুলিশ হত্যা মামলা বাকি তিনটি আন্দোলনকারী তিনজন। পুলিশ হত্যা মামলায় ৯জনকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা সবাই ক্ষমতাচ্যুত এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী কিনা এ প্রশ্নে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দাবি করেন মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় দেখা হয় না।

এদিকে এনায়েতপুরে পুলিশ হত্যার যে মামলাটি হয়েছে সেই মামলার বাদি হিসেবে স্বাক্ষর আছে এসআই আব্দুল মালেকের।

মামলার বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র যেভাবে দেখে সেটাই। আমার আর কী বলার আছে। আমি বলছিলাম আমার শারীরিক অবস্থা ভালো না। কোথায় স্বাক্ষর করতে হবে বলেন। মানসিকভাবে মর্মাহত ছিলাম। এজাহার ওনারা লিখেছিল। আমি বলছিলাম স্যার আমার কী করা লাগবে বলেন। আমি স্বাক্ষরটা করেছিলাম।’

ওই সময়ে বিভাগীয় পুলিশের দায়িত্বশীল পদে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন পুলিশের নাজুক পরিস্থিতি এবং চাপের মুখে মামলাটি রুজু করতে হয়েছিল।

‘ওই সিচ্যুয়েশনে চাপ সৃষ্টি করে মামলা রেকর্ড করা হয়। পুলিশ বাদি হয়ে মামলা হয়। স্থানীয় পুলিশ আমাকে বলেছিল মামলা রেকর্ড করতে বাধ্য হইছি স্যার। ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েন—বলেন তিনি।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

বিএসএফের গুলিতে মৃত্যু, ৪০ ঘণ্টা পর আশাদুলের মরদেহ হস্তান্তর
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৯ মাসের শিশুকে নিথর দেখে স্বজনের ছোটাছুটি-আর্তনাদ, পিআইসিইউ…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 ১২০০ শত ইয়াবাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মালিকবিহীন পরিত্যক্ত ব্যাগে মিলল ৯২ রাউন্ড গুলি
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি করলে ছয় মাসের দণ্ড
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিখোঁজ শিশুর পা কেটে করানো হয় ভিক্ষাবৃত্তি, ৭ মাস পর মাহফিল…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9