পানিতে মিশছে ক্ষতিকর রাসায়নিক © সংগৃহীত
পানির অপর নাম জীবন। তবে আমরা প্রতিদিন যে পানি পান করি, তাতে এমন কিছু রাসায়নিক মিশে থাকতে পারে, যা সহজে নষ্ট হয় না। বছরের পর বছর পরিবেশে থেকে যেতে পারে এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক। শুধু পানি নয়, খাবারের প্যাকেট, প্রতিদিনের ব্যবহার্য বিভিন্ন জিনিসেও এগুলো পাওয়া যায়। গবেষণায় এসব রাসায়নিকের সঙ্গে কিডনি ও অণ্ডকোষের ক্যান্সারসহ কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে সব ধরনের ক্ষতির বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন গবেষকরা।
কী এসব রাসায়নিক
এসব রাসায়নিকের নাম পিএফএএস। এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি রাসায়নিক পদার্থের একটি বড় গোষ্ঠী। খাবারের প্যাকেট, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য পণ্যসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরিতে এসব রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার (ইপিএ) তথ্য অনুযায়ী, পিএফএএসের হাজারো ধরন রয়েছে। এর মধ্যে পিএফওএ ও পিএফওএস বহুল পরিচিত।
পিএফএএসের অনেক ধরন পরিবেশে খুব ধীরে ভাঙে। ফলে এগুলো দীর্ঘদিন পানি, মাটি ও বাতাসে থেকে যেতে পারে। কিছু ধরনের পিএফএএস মানুষের শরীরেও জমা হতে পারে। দীর্ঘদিন এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকলে স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
কীভাবে পানিতে মেশে এসব রাসায়নিক?
শিল্পকারখানা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপ থেকে পিএফএএস পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেখান থেকে এসব রাসায়নিক মাটি ও পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পানির উৎস দূষিত করতে পারে।
পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য শোধনাগার, আবর্জনা ফেলার স্থান, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি, গাড়ি ধোয়ার কেন্দ্র, তেল শোধনাগার এবং কাপড়, কার্পেট, প্লাস্টিক ও রং তৈরির কারখানা থেকে এসব রাসায়নিক ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। কখনো শিল্পকারখানার বর্জ্যপানির সঙ্গে সরাসরি জলাশয়ে মেশে পিএফএএস। আবার দূষিত মাটি, আবর্জনার স্তূপ কিংবা কৃষিজমি থেকেও এসব রাসায়নিক পানির উৎসে পৌঁছাতে পারে।
শরীরের যেসব ক্ষতি হতে পারে
পিএফএএসের সংস্পর্শে এলে মানুষের কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা করছেন। কিছু গবেষণায় এসব রাসায়নিকের সঙ্গে কয়েকটি রোগের সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেলেও সব ক্ষেত্রে সরাসরি যোগসূত্র নিশ্চিত হয়নি। ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় পিএফএএসের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের সম্পর্ক নিয়ে ১৮টি গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। এতে অধিকাংশ ক্যান্সারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট সম্পর্কের প্রমাণ সীমিত বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শের সঙ্গে কিডনি ও অণ্ডকোষের ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া যায়।
২০২১ সালে প্রকাশিত আরেকটি পর্যালোচনায় নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর পিএফএএসের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে প্রজনন অঙ্গ, স্তন ও থাইরয়েডের টিস্যুর ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথা উঠে আসে। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের (পিসিওএস) মতো কিছু প্রজননস্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গেও সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।
তবে এসব গবেষণার অনেকগুলোই ছোট পরিসরে করা হয়েছে। কোনো কোনো গবেষণার ফলাফলও একে অন্যের সঙ্গে মেলে না। তাই পিএফএএসের সংস্পর্শে এলেই ক্যান্সার বা অন্য কোনো রোগ হবে, এমনটা জোর দিয়ে বলা যায় না। এসব রাসায়নিকের প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
পানিতে এসব রাসায়নিকের অবস্থা যেভাবে বোঝা যায়
পানির রং, গন্ধ বা স্বাদ দেখে পিএফএএসের উপস্থিতি বোঝার উপায় নেই। এটি শনাক্ত করতে বিশেষ পরীক্ষার প্রয়োজন হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা পিএফএএস শনাক্ত করার জন্য কয়েকটি পরীক্ষাপদ্ধতির কথা বলেছেন। তবে এসব পরীক্ষা সাধারণত বিশেষায়িত পরীক্ষাগারে করা হয়।
পানির দূষণ কমাবেন যেভাবে
বিশেষ কিছু ফিল্টার ব্যবহার করে পানীয় জল থেকে পিএফএএসের মাত্রা কমানো যায়। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে তিন ধরনের প্রযুক্তি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
অ্যাকটিভেটেড কার্বন ফিল্টার: বিশেষ ধরনের কার্বন ব্যবহার করে পানি থেকে কিছু দূষক আটকে রাখা হয়। এন মাধ্যমে এটি কিছুটা রোধ করা সম্ভব।
আয়ন বিনিময় পদ্ধতি: এতে বিশেষ ধরনের রেজিনের সাহায্যে পানি থেকে পিএফএএসের মতো দূষক সরানো হয়।
রিভার্স অসমোসিস: এই পদ্ধতিতে বিশেষ ঝিল্লির মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত করে বিভিন্ন দূষক আলাদা করা হয়। সঠিকভাবে কাজ করা রিভার্স অসমোসিস ফিল্টার পানিতে থাকা বিভিন্ন ধরনের পিএফএএসের মাত্রা কমাতে পারে।
এসব প্রযুক্তির কিছু ঘরোয়া পানির ফিল্টারেও ব্যবহার করা হয়। তবে সব ফিল্টার পিএফএএস দূর করতে পারে না। তাই ফিল্টার কেনার আগে এটি পিএফএএস কমাতে কার্যকর কি না, তা যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
ঝুঁকি কমাতে যা করবেন
পিএফএএসের সংস্পর্শ পুরোপুরি এড়ানো কঠিন। তবে কিছু বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। পানির গুণমান নিয়ে সন্দেহ থাকলে তা পরীক্ষা করতে পারেন। প্রয়োজন হলে পিএফএএস কমাতে সক্ষম, পরীক্ষিত ফিল্টার ব্যবহার করুন। পাশাপাশি খাবারের প্যাকেট ও প্রতিদিনের ব্যবহার্য পণ্য সম্পর্কে সচেতন থাকুন। শিল্পকারখানার বর্জ্য যেন পানির উৎসে মিশে দূষণ না ছড়ায়, সে জন্য কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও জরুরি।