ভাতের মাড় © সংগৃহীত
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভাতের মাড়কে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যচর্চার একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। আধুনিক স্কিন কেয়ারের জনপ্রিয়তার অনেক আগেই এটি ত্বকের যত্নে ব্যবহৃত হতো। চাল ভিজিয়ে রাখা বা রান্না করার পর যে সাদা রঙের তরল অংশ থাকে, সেটিই ভাতের মাড়। এতে রয়েছে ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান।
নিয়মিত ভাতের মাড় পান করলে এটি শরীরের ভেতর থেকে ত্বককে পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করতে পারে। শুধু ত্বকের ওপরিভাগের সমস্যা ঢেকে রাখার বদলে ভেতর থেকে ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও ঐতিহ্যগত এই ধারণার কিছু সমর্থন পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, ভাতের মাড় পান করলে ত্বকের স্বাস্থ্য, উজ্জ্বলতা ও স্থিতিস্থাপকতা উন্নত হতে পারে।
১. ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করে এবং আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে
ভাতের মাড়ে প্রাকৃতিক স্টার্চ এবং চাল থেকে পাওয়া সিরামাইড থাকে। এগুলো ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা (স্কিন ব্যারিয়ার) শক্তিশালী করতে সাহায্য করে, যা ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথে (এনআইএইচ) প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চাল থেকে পাওয়া সিরামাইড ত্বক থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমায় এবং ত্বকের আর্দ্রতা ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে সহায়তা করে। ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী হলে দূষণ ও শুষ্ক আবহাওয়ার মতো পরিবেশগত ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও ত্বক ভালোভাবে সুরক্ষিত থাকতে পারে।
২. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের বয়সের ছাপ ধীর করতে সাহায্য করে
ভাতের মাড়ে প্রাকৃতিকভাবে ফেরুলিক অ্যাসিড ও গামা-ওরাইজানলের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এগুলো শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল নিষ্ক্রিয় করতে সাহায্য করে।
এনআইএইচ-সূচিভুক্ত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ফেরুলিক অ্যাসিড অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সহায়তা করে। এই অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের কারণেই ত্বকে বলিরেখা পড়ে এবং ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা কমে যায়। নিয়মিত ভাতের মাড় পান করলে এসব অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোষের ক্ষতি কমিয়ে ত্বকের ভেতর থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
৩. ত্বকের রঙ সমান রাখতে এবং প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে
ত্বকের রঙ অসমান হওয়ার অন্যতম কারণ প্রদাহ এবং অতিরিক্ত মেলানিন উৎপাদন। ভাতের মাড়ে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা মেলানিন তৈরির প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং ত্বকের রঙ আরও সমান দেখাতে সাহায্য করতে পারে।
এনআইএইচে প্রকাশিত একটি ওপেন-লেবেল ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, চালভিত্তিক সিরামাইড ত্বকের মেলানিনের মাত্রা কমাতে এবং ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। তাই নিয়মিত ভাতের মাড় পান করলে ধীরে ধীরে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়তে পারে।
৪. প্রদাহ কমাতে এবং সংবেদনশীল ত্বক শান্ত রাখতে সহায়তা করে
ব্রণ, লালচে ভাব ও সংবেদনশীল ত্বকের অন্যতম কারণ হলো প্রদাহ। ভাতের মাড়ে অ্যালানটইনসহ কিছু প্রদাহনাশক উপাদান থাকে, যা ত্বকের জ্বালা ও প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এসব উপাদান ত্বকের লালচে ভাব ও প্রদাহের বিভিন্ন সূচক কমাতে সাহায্য করে। ভাতের মাড় পান করলে শরীরের ভেতরের প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়াও কিছুটা কমতে পারে, যার ইতিবাচক প্রভাব ত্বকে দেখা যেতে পারে।
৫. কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করে এবং ত্বক পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে
ত্বকের দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে কোলাজেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাঁজন করা চালের নির্যাস নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এটি কোলাজেন উৎপাদন বাড়াতে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের কারণে কোলাজেন ভেঙে যাওয়া কমাতে সহায়তা করতে পারে।
এনআইএইচ-সংযুক্ত একটি বায়োমেডিক্যাল গবেষণায় বলা হয়েছে, চাল থেকে পাওয়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফাইব্রোব্লাস্ট কোষের কার্যক্রমে সহায়তা করে। এই কোষগুলো ত্বক পুনর্গঠন ও ক্ষত সারাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে সবার জন্য ভাতের মাড় উপযুক্ত নয়
ভাতের মাড়ের বিভিন্ন উপকারিতা থাকলেও এটি সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নাও হতে পারে।
যাদের ভাতের মাড় পান না করাই ভালো
১.গর্ভবতী নারী, কারণ এতে অল্পমাত্রায় আর্সেনিক থাকতে পারে, যা গর্ভাবস্থায় এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
২.শিশু ও কম বয়সী বাচ্চারা, কারণ তাদের শরীর আর্সেনিক ও অতিরিক্ত স্টার্চের প্রতি বেশি সংবেদনশীল।
৩.ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার সমস্যায় ভোগা ব্যক্তি, কারণ ভাতের মাড়ে স্টার্চের পরিমাণ বেশি থাকায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে পারে।
৪.যাদের সহজেই পেট ফাঁপা, গ্যাস বা হজমের সমস্যা হয়, কারণ স্টার্চযুক্ত পানীয় এসব সমস্যা বাড়াতে পারে।
৫.যারা নিয়মিত বেশি পরিমাণে ভাত খান, কারণ ভাতের মাড় পান করলে শরীরে আর্সেনিকের মোট গ্রহণের পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারে।
৬.যারা গাঁজন করা ভাতের মাড় পান করতে চান, তাদের সতর্ক থাকা উচিত। সঠিকভাবে প্রস্তুত ও সংরক্ষণ না করলে এতে ব্যাকটেরিয়া দূষণের ঝুঁকি থাকতে পারে।