সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী © সংগৃহীত
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছেন, জুলাই গণহত্যার পরও আওয়ামী লীগকে বিভিন্নভাবে ‘স্পেস’ দেওয়া হচ্ছে। এর দায় সরকারের পাশাপাশি জুলাইয়ের পক্ষের শক্তি, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি অংশের ওপরও বর্তায় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
ফারুকী প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কি ‘কালচারাল লীগ’ ও ‘মিডিয়া লীগ’ নামে পরিচিত বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কী আলোচনা ও পরিকল্পনা হয়, তা জানেন কি না। এসব পরিকল্পনা কীভাবে গণমাধ্যমে ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে আসে, তা খতিয়ে দেখার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
এক ফেসবুক পোস্টে আওয়ামী লীগের বর্তমান কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্ন পক্ষকে দায়ী করে ফারুকী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যে এখনও পর্যন্ত কোনো ধরনের অনুশোচনায় না ভুগে দেশে-বিদেশে জঙ্গী আচরন করে যাচ্ছে এই দায় ঐসব সুশীলদের যারা জুলাই গণহত্যার রক্ত হাতে থাকা এই অপরাধীদের পূনর্বাসন নিয়ে মিডিয়ায় লেখা লিখছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই দায় ঐসব মানুষের যারা জুলাই গণহত্যার সম্মতি উৎপাদনকারীদের এবং সিমপ্যাথাইজারদের টেলিভিশন মিডিয়ায় স্পেস দিছিলেন গণহত্যাকারী দল আর অন্যদের এক পাল্লায় তুলে কথা বলার জন্য। যাদের সুযোগ দেয়া হইছিলো এই কথা বলার জন্য যে, আচ্ছা তারেক রহমান লন্ডন থেকে রাজনীতি করতে পারলে খুনী হাসিনা কেনো ভারত থেকে সেটা করতে পারবে না। যেনো তারেক রহমান জুলাই গণহত্যা করে, হাজার হাজার মানুষ গুম-খুন করে জনতার দৌড়ানি খেয়ে পালিয়ে লন্ডন গেছিলেন।’
জুলাইয়ের পক্ষের শক্তির একটি অংশকেও দায়ী করে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, ‘এই দায় আমাদের জুলাইয়ের পক্ষ শক্তির সবার যারা নিজেদের পাওয়ার স্ট্রাগলে আপার হ্যান্ড নেয়ার জন্য দেশের ভিতর এইসব নুইসেন্সকে প্রশ্রয় দিছি।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বিএনপি সরকারের প্রতিও দায় চাপিয়ে তিনি বলেন, ‘এই দায় আমাদের অন্তর্বর্তী এবং বিএনপি সরকারের। কারণ আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধীদের বিচার বা তিরস্কারের আওতায় আনতে পারিনি। ফ্যাসিবাদের মূল শক্তি এর কনসেন্ট উৎপাদনকারীরা। এদেরকে একটা কমিশনের সামনে নিয়ে বিচারের মুখোমুখি না করার ফলে এরাই দেশে বসে বসে কুঁই কুঁই করার মধ্য দিয়ে বিদেশে থাকা আওয়ামী জঙ্গীদের ফুয়েল জোগাচ্ছে।’
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি অংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ফারুকী। তিনি বলেন, ‘এই দায় আমাদের কালচারাল অঙ্গনের তাদের যারা পুরা জুলাই মাসে চুপ থাকে, ফ্যাসিবাদী অপকর্ম নিয়ে একটা কথাও বলে না, আর আগস্টের ১৫ তারিখ আসলে বলে ‘বিনম্র শ্রদ্ধা’। এর মধ্য দিয়ে তারা বিদেশে থাকা এই জঙ্গীদের এই বার্তাই দেয় যে তোমরা কোনো অপরাধবোধে না ভুগেই তোমাদের কাজ চালাতে পারো। শুধু একটা কথা লিখে রাখেন, একাত্তরের রাজাকারকে মানুষ যেমন ঘৃণা করে, চব্বিশের এই রাজাকারদেরও মানুষ একই চোখে দেখবে।’
মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগ এবং সিআরআইয়ের প্রভাব রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘ফাইনালি এই দায় আমাদের বিএনপি সরকারের একটা অংশেরও যারা মিডিয়া এবং কালচারকে আওয়ামী এবং সিআরআইয়ের হেফাজতে তুলে দিছে এবং দিচ্ছে। আপনি বিপ্লব পরবর্তী সরকার চালাবেন স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির উপর ভিত্তি করে আর আপনার মিডিয়া এবং কালচার ক্যানন হবে বাকশাল আর সিআরআই- এটা একটা অবিশ্বাস্য কম্বিনেশন।’
সরকারের ভেতরে কারা আওয়ামী লীগের ‘সফট পাওয়ারকে’ সুযোগ দিচ্ছে, তা খুঁজে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন ফারুকী। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাইলে একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন আপনার সরকারের ভিতরে বসে কারা ফ্যাসিবাদের সফট পাওয়ারকে স্পেস দিচ্ছে, কারা কারা তাদের এমপাওয়ার করছে। আপনার সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কি জানে কালচারাল লীগ এবং মিডিয়া লীগের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলাতে কী আলোচনা হয়? কী পরিকল্পনা হয়? এবং কিভাবে সেই পরিকল্পনা মিডিয়ায় প্রোপাগান্ডা আকারে আসে? এবং কোন প্রোপাগান্ডা কোন সুদুরপ্রসারী চিন্তা থেকে করা হচ্ছে? তারা কী জেনেশুনে এদের এমপাওয়ার করছে?’
জুলাইয়ের ঘটনাকে সাধারণ সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা এটা করছে তারা ভুলে যাচ্ছে, জুলাই একটা ওয়ান ইলেভেন মার্কা সরকার পরিবর্তন ছিলো না যে বলবে ‘যা হয়েছে হয়েছে, এসো মিলেমিশে খেলি’। তারা এটা ভুলে যাচ্ছে জুলাইতে গণহত্যা হয়েছে, জুলাইয়ের আগে ষোলো বছর গুম-খুন ছাড়াও দেশটা লিটারালি অন্য দেশের হাতে তুলে দেয়া হইছিলো। তারা ভুলে যাচ্ছে বাকশালীরা এখনো প্রতি মুহূর্তে অপেক্ষা করছে একটা ছোবল মারার। মনে রাখবেন, ‘হৃদয়ে বাকশাল’র কাছে বিএনপিই হইলো আসল শত্রু।’
তবে কাউকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করার পক্ষে নন জানিয়ে ফারুকী বলেন, ‘আপনাকে প্রতিহিংসার আশ্রয় নিতে বলছি না। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং ইন্টেলেকচুয়াল অপরাধের জন্য তিরস্কার বরাদ্দ রাখার কথা বলছি। এদের এমপাওয়ার বা সেলিব্রেট না করার কথা বলছি।’