ডেনিম উৎপাদনে পানির চাপ, সমাধানের খোঁজ

০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৯ AM
ডেনিম উৎপাদন

ডেনিম উৎপাদন © টিডিসি ফটো

‘ডেনিম’ শব্দটি শুনলেই প্রথমেই মাথায় আসে জিন্স প্যান্ট। তবে দৈনন্দিন জীবনে এই ডেনিম কাপড় পোশাক ও ফ্যাশন ছাড়াও ব্যাগ, জুতা, কুশন কভার, টেবিল ম্যাট, ফার্নিচারসহ নানা জায়গায় ব্যবহৃত হয়। এই ডেনিম কাপড় তৈরিতে পানির ব্যবহার নিয়ে কখনো কি ভাবা হয়েছে? জানা যায় একটি ডেনিম প্যান্ট তৈরিতে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয় যেখানে কিনা একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষ দৈনিক মাত্র ২-৩ লিটার পানি পান করেন। 

ডেনিম উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ পানির ব্যবহার শিল্পাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। পানি ব্যবহারের এই বিশাল পরিসরের পেছনে রয়েছে ডেনিমের সুতা প্রস্তুত থেকে শুরু করে রং করা, বয়ন ও ওয়াশিংসহ নানা ধাপ। এবার জানা যাক, জনপ্রিয় এই ডেনিম কাপড় তৈরির অন্তরালের সেই পানির গল্প।

ফাইবার থেকে ইয়ার্ণ তৈরি
ডেনিমের যাত্রা মূলত শুরু হয় তুলা উৎপাদনের মাধ্যমে। যেসব গাছের আবাদে সবচেয়ে বেশি পানির প্রয়োজন তাদের মধ্যে তুলা গাছ অন্যতম। তুলা গাছ জন্মায় শুষ্ক আবহাওয়াপ্রবণ এলাকায়। তাই এই গাছে অধিক পরিমাণে কৃত্তিম সেচের প্রয়োজন হয়। এক কিলোগ্রাম তুলা উৎপাদনে প্রয়োজন প্রায় ১০ হাজার লিটার পানি। আর ডেনিম কাপড় তৈরির ৫০-৭০ শতাংশ পানি ব্যবহৃত হয় তুলা উৎপাদনে। বিশ্বের মোট কৃষিজমির মাত্র আড়াই শতাংশে তুলার চাষ হলেও এটি বৈশ্বিক কৃষি সেচের প্রায় ১৭ শতাংশ পানি টেনে নেয়। 

এই তুলা থেকে পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন স্পিনিং মিলে সুতা তৈরি করা হয়। সাধারণত সুতা তৈরির সময় ডেনিম ডায়িং বা ওয়াশিংয়ের মতো পানির ব্যবহার হয় না। তবে ইয়ার্ণ ডায়িং করা হলে অধিক পানির প্রয়োজন হয়। এ ধাপে সকলের চিরচেনা ইন্ডিগো ডাইয়িং করা হয়। প্রক্রিয়াটিতে গাঢ় নীল রঙ পেতে সুতাকে বারবার ইন্ডিগো ডাইয়িং দ্রবণে চুবিয়ে বাতাসে শুকানো হয়। একই চক্র প্রায় ১৫ থেকে ২০ বার ঘটে থাকে। এবার প্রস্তুতকৃত সুতা হতে কাপড় উৎপাদনের পদ্ধতি নিয়ে জানা যাক। 

সুতা থেকে কাপড় উৎপাদন
বিমে থাকা সুতা উইভিং সেকশনে এসে সাইজিং করা হয়। এতে অনেক সাইজ কেমিক্যাল (স্টার্চ, PVA, CMC ইত্যাদি) ব্যবহৃত হয়। এ পদ্ধতিতে উচ্চতাপে সাইজড রেসিপি প্রস্তুত করা হয় যাতে অনেক পানি দরকার। তবে এতে করে সুতার উপর আলাদা প্রলেপ দেয়া হয় যার কারণে মেশিন লুমে সুতা চলাচলের সময় বারবার ছিড়ে যাবার সম্ভাবনা কমে যায়। এভাবেই আমরা পেয়ে যায় সুতা থেকে ডেনিমের কাপড়। পরবর্তীতে ডেনিম কাপড় দৃষ্টিনন্দন ও পরিধান উপযোগী করতে ডাইয়িং ও ফিনিশিং অংশে আনা হয়। 

ডেনিম ডাইয়িং ও ফিনিশিং
ডেনিম প্রসেসিংয়ে প্রারম্ভিক ডাইংয়ের চেয়ে কাপড় তৈরির পর শেষ ধাপের ওয়াশিং ও ফিনিশিংয়ে পানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ বিষয়ে ডেনিমের লুক ও শেডের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ৫ থেকে ১০টি 'ওয়েট' ও 'ড্রাই' প্রসেস সম্পন্ন করতে হয়। এই ধাপে কাপড়ে রঙ সঠিকভাবে ফিক্স করতে এবং অতিরিক্ত কাঁচা রঙ দূর করতে হট রিন্স ও কোল্ড ওয়াশসহ প্রায় ১৪ থেকে ১৫টি ভিন্ন ধাপে বারবার পানি ব্যবহার করা হয়।

প্রচলিত সাধারণ প্রসেসিংয়ে একটি জিন্স প্যান্ট তৈরিতে গড়ে ৫০ থেকে ১৫০ লিটার পানি ব্যবহৃত হলেও ডাইং, স্কাউরিং ও ব্লিচিংয়ের সার্বিক ধাপ বিবেচনায় নিলে প্রতি কেজি ডেনিম ফ্যাব্রিকে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ লিটার পানি লাগে। ফলে একটি ৫০০-৬০০ গ্রাম ওজনের ডেনিম প্যান্টের নেপথ্যে সার্বিকভাবে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার পানি প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং, ব্যাপক পরিমাণ পানির অপচয় রোধ করা একান্ত জরুরি। 

পানি সংরক্ষণের উপায়
এবার ডেনিম কাপড় তৈরিতে পানি ব্যবহার কমানোর প্রসংগে আলোচনা করা যাক। যদিও অতিরিক্ত পানির ব্যবহার কমানোর এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সুযোগ নেই এবং বাংলাদেশে ডেনিম কাপড় ওয়েট প্রসেসিং ও ইয়ার্ন ডাইয়িং, স্কাউরিং-ব্লিচিংয়ে যাওয়ার পর থেকেই বিপুল পানির প্রয়োজন হয়। কারণ ডেনিমে প্রসেসিং ও ওয়াশিং বেশি থাকে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ার্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগমের সাথে কথা বলে জানা যায়, স্কাউরিং-ব্লিচিং ও ডাইং না করে ন্যাচারালি কালারড ফাইবার' ব্যবহার করা হলে পানির ব্যবহার কমানো সম্ভব হলেও, অন্যান্য বিকল্প ওয়াশিং পদ্ধতিতে পানি কম লাগার কথা বলা হলেও পানি শেষ পর্যন্ত লাগেই।

পাশাপাশি ডেনিম খাতে পানির অপচয় কমাতে ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমানা শাহরিন তানিয়া জানান, প্রসেসিংয়ে অনবরত নতুন পানি ব্যবহার করার বদলে নির্দিষ্ট পানি আটকে রেখে ব্লক ওয়াশ করলে পানির পরিমাণ কম লাগে। আধুনিক কম লিকার রেশিও সমৃদ্ধ ওয়াশিং মেশিন, ওজোন ওয়াশিং, লেজার ফিনিশিং এবং ই-ফ্লো টেকনোলজি ব্যবহার করে প্রচলিত প্রসেসিংয়ের একাধিক ধাপ বাদ দেওয়া যায় যা পানি ও কেমিক্যাল দুটোই সাশ্রয় করে।

সম্প্রতি নানা গবেষণায় উঠে আসা ডেনিমে উৎপাদনে পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিয়ে ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইমদাদ সরকার জানান, পাল্টা-প্রবাহে ধোয়া, বর্জ্যপানি পুনঃব্যবহার, কস্টিক পুনরুদ্ধার ও পানি পরিশোধন প্রযুক্তি প্রয়োগ করে ডেনিম কারখানায় নির্দিষ্ট পানি ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের একটি ডেনিম কারখানার গবেষণায় পরিশোধিত বর্জ্যপানি পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৬ লাখ ১৯ হাজার ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি সাশ্রয়ের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। এছাড়া ২০২৬ সালের আরেক গবেষণায় ধোয়ার পানি ধাপে ধাপে পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কারখানা-পরিস্থিতিতে পানির ব্যবহার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে।

তবে এসব প্রযুক্তির সুবিধা থাকলেও বর্তমান পোশাক কারখানায় এসব বাস্তবায়নের প্রাথমিক খরচ ও যন্ত্রের দাম অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এসবের প্রয়োগ কিছুটা ধীরগতির। উৎপাদন খরচ প্রসঙ্গে এ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান চৌধুরী জানান, পানি সাশ্রয়ের ফলে উৎপাদন খরচ ঠিক কত শতাংশ কমবে, তা নির্ভর করবে কারখানার প্রযুক্তি, উৎপাদন পরিমাণ, জ্বালানি ও রাসায়নিকের দাম এবং বর্তমান পানি ব্যবস্থাপনার ওপর। পানি পুনঃব্যবহার বা পরিশোধন ব্যবস্থা স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি পানি ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।

অতএব, ডেনিম উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কেবল পানির ব্যবহার কমালে উৎপাদন খরচ কমে না। তাই সঠিক পদ্ধতিতে পানি রিসাইকল করা জরুরি। এতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, ইটিপি ও জ্বালানি ব্যয় কমে এবং সার্বিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয়ে প্রায় ১০ শতাংশ সাশ্রয় হতে পারে।

অন্যের ঝগড়া থামাতে গিয়ে প্রাণটাই হারালেন এইচএসসি ফলপ্রত্যাশ…
  • ০৩ অক্টোবর ২০২৬
আওয়ামী নৈরাজ্যের প্রতিবাদে টঙ্গীতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল
  • ০৩ অক্টোবর ২০২৬
সোনার জয়ের স্বপ্নে বিভোর বাংলাদেশের কপালে ব্রোঞ্জও জুটল না
  • ০৩ অক্টোবর ২০২৬
‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন প্রধানম…
  • ০৩ অক্টোবর ২০২৬
বিমানবন্দর থেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষ দুই নেতা গ্রেপ্তার
  • ০৩ অক্টোবর ২০২৬
ডেনিম উৎপাদনে পানির চাপ, সমাধানের খোঁজ
  • ০৩ অক্টোবর ২০২৬