গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় © টিডিসি সম্পাদিত
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বছরে দুই সেমিস্টারে মেডিকেল ফি বাবদ প্রায় ৩৬ লাখ টাকা আদায় করা হয়। তবে প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ অর্থের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাধ্যতামূলক মেডিকেল ফি বাতিল বা ঐচ্ছিক করাসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতি সেমিস্টারে ২০০ টাকা করে মেডিকেল ফি নেওয়া হয় বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রতি সেমিস্টারে প্রায় ১৮ লাখ এবং বছরে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা এ খাতে আদায় হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে প্রয়োজনীয় ওষুধ সব সময় পাওয়া যায় না। অনেক সময় প্যারাসিটামলসহ সীমিতসংখ্যক ওষুধ দেওয়া হয়। জ্বর, ব্যথা, সংক্রমণ কিংবা পেটের সমস্যার মতো বিভিন্ন রোগে একই ধরনের ওষুধ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা। ফলে অনেকে মেডিকেল সেন্টারের পরিবর্তে নিজ খরচে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল বা গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সীমিত সময়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। ফলে বিকেল বা রাতে কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ বা আহত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে চিকিৎসা নিতে যেতে হয়।
শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলেছেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না পেলে সেই সেবার জন্য বাধ্যতামূলক মেডিকেল ফি কেন দিতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং ওষুধ কেনার অর্থ সরকারি বরাদ্দ থেকে দেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আলাদাভাবে মেডিকেল ফি আদায়ের প্রয়োজনীয়তা কী, তা নিয়েও জবাবদিহি দাবি করেছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, গত কয়েক বছরের মেডিকেল ফি বাবদ আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ড ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ, প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা প্রকাশ ও নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত, সরকারি হাসপাতালের আদলে ৫ বা ১০ টাকার টিকিটের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা চালু অথবা বাধ্যতামূলক মেডিকেল ফি বাতিল কিংবা ঐচ্ছিক করা, চিকিৎসাসেবা না পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রদত্ত অর্থ ফেরত বা পরবর্তী সেমিস্টারের ফি থেকে সমন্বয়, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, জরুরি চিকিৎসাসেবা ও উন্নত রেফারেল ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে মেডিকেল সেন্টারের সেবার মান ও আয়-ব্যয় তদারকিতে স্বাধীন নজরদারি কমিটি গঠন।
এ বিষয়ে ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সিরাজউদ্দৌলা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের বর্তমান অবস্থা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রতি অবহেলার উদাহরণ। প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটের পাশাপাশি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সীমিত সময়ে চিকিৎসাসেবা চালু থাকে। ফলে বিকেল বা রাতে কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ কিংবা আহত হলে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও জেলা সদর হাসপাতালে যেতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রায় ১৮ লাখ টাকা মেডিকেল ফি হিসেবে জমা হয়। পাশাপাশি সরকারি বরাদ্দও রয়েছে। এত অর্থ বরাদ্দের পরও প্রয়োজনের সময় চিকিৎসাসেবা না পাওয়া হতাশাজনক। এসব অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার স্বচ্ছ হিসাব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।’
তবে শিক্ষার্থীদের ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগের সঙ্গে একমত নন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী মেডিকেল অফিসার ডা. লিখন চন্দ্র বালা। তিনি বলেন, ‘মেডিকেলের বিষয়ে শিক্ষার্থীরা ওষুধ সরবরাহের যে অভিযোগ করেছে, তা বাস্তব নয়। মেডিকেলে প্রায় ১৫ ধরনের ওষুধ সরবরাহ রয়েছে এবং চার্টে সেগুলোর তালিকাও দেওয়া আছে। শিক্ষার্থীদের জন্য ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত ওষুধের ব্যবস্থা রয়েছে। আরও প্রয়োজন হলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী মেডিকেল টিমের কর্মকর্তা ড. মো. আসলাম স্যারের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় ওষুধের পরিমাণ বাড়ানো হবে।’
আরও দেখুন: ডেঙ্গু কেড়ে নিল ফজলে রাব্বির প্রাণ, পবিপ্রবিতে শোকের ছায়া
মেডিকেল ফি বাবদ আদায় করা অর্থ শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেডিকেল টিমের কর্মকর্তা সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আসলাম বলেন, ‘আমরা মেডিকেলে শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ রেখেছি। আরও প্রয়োজন হলে এবং শিক্ষার্থীরা লিখিত অভিযোগ দিলে তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে ওষুধ সরবরাহ করা যাবে। শিক্ষার্থীদের দেওয়া নির্ধারিত ফি আমরা কাউকে ফেরত দিতে পারি না। ফি যা আসে, তা প্রশাসনের মাধ্যমে আসে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি মেডিকেলে বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য কিছু সরঞ্জাম চালু রয়েছে। বর্তমানে স্বল্পমূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার জন্যও ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা আছে। অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় এখানে খুবই স্বল্প মূল্যে এসব পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সোহেল হাসান বলেন, ‘আমি আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল টিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তাদের কিছু সমস্যার কথা আমাকে জানালে আমি অবশ্যই এ বিষয়ে সমাধানের জন্য চেষ্টা করব।’