অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসান ও নিয়োগপ্রত্যাশীর সঙ্গে তার হোয়াটসঅ্যাপ আলাপ © টিডিসি সম্পাদিত
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) নতুন ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রো-ভিসি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানকে এই পদে নিয়োগ দিয়ে আজ মঙ্গলবার (২৫) আগস্ট প্রজ্ঞাপন জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে ২০ লাখ টাকায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বানাতে চাওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন প্রভাষক পদে আবেদন করা এক নিয়োগপ্রার্থী। তৎকালীন প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদনও করেছিলেন ওই নিয়োগপ্রার্থী। এ নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসসহ কয়েকটি গণমাধ্যমে তখন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
পরে এই অভিযোগের বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি করেছিল ইউজিসি। সেখানে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন ও সুপারিশ দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবেদনে কী সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল তা জানা যায়নি।
আরও পড়ুন: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নিয়োগে ‘খুশি করতে’ দিতে হবে ২০ লাখ টাকা!
এ ঘটনার ৬ মাস পর আজ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে অভিযুক্ত ওই প্রো-ভিসিকেই ভিসি নিয়োগ দিয়ে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের গত ২৯ অক্টোবর ২০২৪ তারিখের প্রজ্ঞাপনের (গ) নম্বর শর্ত মোতাবেক ড. মো. সোহেল হাসানকে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর (প্রো-ভিসি) পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) পদে নিয়োগ দেওয়া হলো।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তাঁর নিয়োগের মেয়াদ যোগদানের তারিখ থেকে চার বছর অথবা অবসর গ্রহণের তারিখ—এর মধ্যে যেটি আগে ঘটে, সে সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এ সময়ে তিনি বর্তমান পদের সমপরিমাণ বেতন-ভাতাদি পাবেন এবং বিধি অনুযায়ী পদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন।

অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানের সঙ্গে নিয়োগপ্রত্যাশীর হোয়াটসঅ্যাপ আলাপ
নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, ড. মো. সোহেল হাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সার্বক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। এছাড়া রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর প্রয়োজন মনে করলে যেকোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ৩০ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানকে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রো-ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ড. মো. সোহেল হাসান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নিয়োগে ‘খুশি করতে’ দিতে হবে ২০ লাখ টাকা!
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের মো. সিফাত হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী গত ৫ ফেব্রুয়ারি ইউজিসি চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো অভিযোগে বলেছিলেন, ‘গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করেছিলাম। আমার সিরিয়াল নম্বর ছিল ৯। পরিসংখ্যান বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ ছিল ২৩ নভেম্বর। নিয়োগ পরীক্ষার পূর্বে আমি গোবিপ্রবি হতে একটি এসএমএস পাই, যেখানে উল্লেখ ছিল যে আলোচ্য পরীক্ষায় মৌখিক পরীক্ষা ও প্রেজেন্টেশন অনুষ্ঠিত হবে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা এবং অর্থ দাবির বিষয়ে আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
‘‘গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (যিনি পূর্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ছিলেন)-এর সঙ্গে আমার একাডেমিক পরিচয়ের সূত্রে আমি টেলিফোনে যোগাযোগ করি। উল্লেখ্য যে, আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিএসসি (সম্মান) ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছি। প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর আমাকে একটি মোবাইল নম্বর (০১৭৪০*৭৬*১৮) প্রদান করেন এবং যোগাযোগ করতে বলেন। আমি ওই নম্বরে কল করলে তোফায়েল আহমেদ নামে একজন কল রিসিভ করেন এবং নিজেকে ভিসি স্যারের পিএস হিসেবে পরিচয় দেন।’’

সেই অভিযোগপত্র
অভিযোগপত্রে এই নিয়োগপ্রত্যাশী আরও বলেছিলেন, ‘‘তিনি প্রথমে জানতে চান আমি তার মোবাইল নম্বর কোথায় পেয়েছি। যখন বলি প্রো-ভিসি স্যার দিয়েছেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন এবং জানতে চান কীভাবে আমাকে সাহায্য করতে পারেন। আমি বলি যে ২৩ নভেম্বর আমার পরীক্ষা রয়েছে। তখন তিনি জানতে চান আমি কোন বিভাগে পরীক্ষা দেব। আমি বলি যে আমি পরিসংখ্যান বিভাগে প্রভাষক পদে আবেদন করেছি। তখন তিনি বলেন চাকরি পেতে হলে "খুশি" করতে হবে। আমি জানতে চাইলে তিনি বলেন প্রভাষক পদে নিয়োগ পেতে হলে আমাকে ২০ লাখ টাকা দিতে হবে।’’
‘‘আমি জানাই যে এত টাকা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে রাজি করানোর চেষ্টা করেন এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। অধিকাংশ যোগাযোগ হোয়াটসঅ্যাপে হওয়ায় কল রেকর্ড করতে পারিনি। পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় আমি গোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে এসে ছাত্রদের হলে অবস্থান করি। সন্ধ্যার পরে তিনি আমাকে ভিসি বাংলোর পাশের পুকুরপাড়ে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি আমাকে প্রথমে মোবাইল বন্ধ করতে বলেন এবং পুনরায় বিভিন্নভাবে অর্থ প্রদানের বিষয়ে চাপ দেন। তিনি বলেন পুরো টাকা অগ্রিম দিতে হবে না; অর্ধেক অগ্রিম এবং বাকি টাকা নিয়োগপত্র পাওয়ার পর দিতে হবে। আমি বারবার জানাই যে এত টাকা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি রাজি না হওয়ায় তিনি আমাকে সতর্ক করেন যেন বিষয়টি কাউকে না জানাই।’’
অভিযোগপত্রে জানানো হয়েছিল, ‘‘এমনকি ভাইভা দিতে যাওয়ার পূর্বে ভিসি স্যারের পিএস-এর কক্ষে বসে থাকার সময়ও তিনি আমাকে বারবার বলেন যে আমি যদি রাজি থাকি তাহলে বিষয়টি এখনো "কনফার্ম" করা সম্ভব। এর আগেও আমি একই পদের পূর্ববর্তী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করেছিলাম এবং তখন লিখিত পরীক্ষা হয়েছিল। কিন্তু এবার লিখিত পরীক্ষা বাতিল করে শুধুমাত্র ভাইভা নেওয়া হয়, যদিও আমাদেরকে পূর্বে ভাইভা ও প্রেজেন্টেশন হবে বলে জানানো হয়েছিল। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।’’
‘‘পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপ/পেজ থেকে জানতে পারি যে গোবিপ্রবির নিয়োগ ইউজিসি কর্তৃক স্থগিত করা হয়েছে। বিষয়টি জানার পর একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সত্য ঘটনা ইউজিসিকে জানানো আমার নৈতিক দায়িত্ব মনে করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যোগ্যতা ও মেধার পরিবর্তে সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ ও স্বেচ্ছাচারী পদ্ধতিতে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে, যা উচ্চশিক্ষার মান ক্ষুণ্ণ করছে এবং মেধাবী প্রার্থীদের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনে আমি ইউজিসিতে উপস্থিত হয়ে লিখিত ও স্বাক্ষর দিতে প্রস্তুত আছি।’’

অভিযোগপত্র জমা দেওয়া সিফাত
জানা গেছে, অভিযোগপত্রটি গত ৫ ফেব্রুয়ারি ইউজিসির কাছে পাঠানোর পর দুয়েকদিন আগে যেকোনো মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রো-ভিসি) প্রফেসর ড. মো. সোহল হাসানের হাতে চলে যায়। এরপর ওই নিয়োগপ্রত্যাশীকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। এমনকি তার পরিবার ও বর্তমানে চাকরিরত প্রতিষ্ঠানে চাপ দিয়েছিলেন প্রো-ভিসি ড সোহেল। এ কারণে ওই নিয়োগপ্রত্যাশী অভিযোগ তুলে নিতে ৬ ফেব্রুয়ারি তারিখের একটি চিঠি লিখেছিলেন ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে।
সেখানে তিনি লেখেছিলেন, ‘‘আমি প্রকৃত ঘটনা পুরোপুরি না বুঝে ও তাড়াহুড়ো করে নিয়োগ বিষয়ে একটি অভিযোগ দিয়েছিলাম। আমি এখন মনে করছি, কাজটি আমার ভুল হয়েছে। তাই, আমি অভিযোগী তুলে নিতে চাই। আপনার নিকট আমার আকুল আবেদন এই যে, অভিযোগটি বাতিল করলে এবং পুরো বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলে চির কৃতজ্ঞ থাকব।’’
ওই নিয়োগপ্রত্যাশী সিফাত গত ১০ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেছিলেন, ‘‘আমি অভিযোগ তুলে নিয়েছি। আমি আর কিছু বলতে চাই না। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, লিখিত অভিযোগটি তিনি লিখেননি। তবে স্বাক্ষর করেছেন। এখানে যে তারিখ দেওয়া রয়েছে সেটিও ব্যাক ডেটেট।’’
গত বছরের নভেম্বরে এই নিয়োগটির জন্য পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে নিয়োগ পরীক্ষার আগে ওই প্রার্থী দেখা করেছেন প্রফেসর ড. মো. সোহেল হাসানের সঙ্গে। বিষয়টি স্বীকার করে ড. মো. সোহেল হাসান গত ১০ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেছিলেন, ‘‘সে (নিয়োগপ্রার্থী) সালাম দিতে গেলে তো অপরাধ দেখি না। আমি বলেছি লিখিত পরীক্ষা দাও। এতটুকুই কথা হয়েছে।’’
তবে টাকা লেনদেনের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন প্রফেসর ড. মো. সোহেল হাসান। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেছিলেন, ‘‘অভিযোগটি মিথ্যা ও তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। ওই প্রার্থী ভুল করেছে মর্মে ইতিমধ্যে মাফও চেয়েছে, লিখিতভাবেও দিয়েছে।’’