চিত্রটি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল ক্যাফেটেরিয়ার। © টিডিসি ছবি
অনেকদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি দৃশ্য দেখলাম, যা সত্যিই মনকে একটু প্রশান্তি দিল। একই টেবিলে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং একজন শ্রমজীবী মানুষ বসে খাবার খাচ্ছেন। একজনের পরনে লুঙ্গি, গায়ে শার্ট, কাঁধে গামছা; অন্যজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। দৃশ্যটি খুব সাধারণ—কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অসাধারণ একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক শিক্ষা।
এ যেন অল্প সময়ের প্রশান্তি নয়, বরং প্রতিটি বাবা-মায়ের সারাজীবনের সংগ্রামের একটি প্রতিচ্ছবি।
কারও হাতে কলম, কারও হাতে রিকশার হ্যান্ডেল; কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে কাস্তে। কেউ কৃষকের মাঠে শ্রম দেন, কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কেউ নিরাপত্তাকর্মী, কেউ দিন-রাত অন্যের সম্পদ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। পেশা ভিন্ন, পোশাক ভিন্ন, সামাজিক অবস্থান ভিন্ন—কিন্তু অধিকাংশ বাবা-মায়ের স্বপ্ন একটাই:
আমার সন্তান যেন আমার মতো কষ্ট না করে; সে যেন একজন ভালো মানুষ হয়, নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে।
একজন বাবা হয়তো সারাদিন রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে কাজ করেন; একজন মা হয়তো নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগান। তাঁরা হয়তো অর্থনীতির বড় বড় তত্ত্ব জানেন না, কিন্তু তাঁরা বাস্তব জীবনে ত্যাগ, সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মানবসম্পদ গঠনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক দর্শনটি প্রতিদিন পালন করে চলেছেন।
অর্থনীতির ভাষায় শিক্ষা হলো Human Capital Investment—মানবসম্পদে বিনিয়োগ। একজন বাবা-মা যখন নিজের প্রয়োজন কমিয়ে সন্তানের পড়াশোনার পেছনে অর্থ ব্যয় করেন, তখন সেটি কেবল খরচ নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ। সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফল শুধু সন্তানের ভালো চাকরি নয়—বরং একজন দক্ষ, নৈতিক, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক তৈরি হওয়া।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমরা যখন রঙিন চশমা পরে শুধু আনন্দ, আড্ডা, ভোগ-বিলাস কিংবা অর্থহীন প্রতিযোগিতায় নিজেদের সময় নষ্ট করি, তখন একবার থেমে ভাবা উচিত—আমাদের বাবা-মা আমাদের জন্য কী করছেন?
যে বাবা হয়তো নিজের জন্য একটি ভালো জামা কিনতে পারেন না, তিনি সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি জোগাড় করছেন। যে মা নিজের প্রয়োজনের কথা না ভেবে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করছেন, আমরা কি তাঁর সেই ত্যাগের যথাযথ মূল্য দিচ্ছি?
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো মানুষ হওয়ার জায়গা। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল চাকরি পাওয়া নয়; বরং বিবেক, নৈতিকতা, যুক্তিবোধ, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা অর্জন করা।
দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ভাবনায় মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণ নিহিত একটি উৎকৃষ্ট ও নৈতিক জীবনযাপনে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য শুধু তার সার্টিফিকেটে নয়; তার চরিত্র, আচরণ এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধেও প্রকাশ পায়।
আবার অর্থনীতির দৃষ্টিতে অ্যাডাম স্মিথ শ্রমের গুরুত্বকে অত্যন্ত গভীরভাবে দেখেছেন। সমাজের প্রতিটি মানুষের শ্রম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখে। তাই শ্রমিকের পোশাক হয়তো একজন শিক্ষার্থীর পোশাকের মতো নয়, কিন্তু সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোয় তাঁর অবদান কোনোভাবেই ছোট নয়।
একই টেবিলে শিক্ষার্থী ও শ্রমিকের বসে খাওয়ার দৃশ্য তাই কেবল একটি খাবারের দৃশ্য নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, শ্রমের সম্মান এবং মানবিক সমতার একটি জীবন্ত প্রতীক।
আমরা প্রায়ই সমাজকে ধনী-দরিদ্র, এলিট-বুর্জোয়া, শ্রমিক-মধ্যবিত্ত কিংবা বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে দেখি। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় শ্রেণিগত পার্থক্য বাস্তব; অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাস্তব। কিন্তু মানুষের মৌলিক মর্যাদা ও মানবিক মূল্য কোনো শ্রেণির একচেটিয়া সম্পদ হতে পারে না।
হয়তো কোনো একদিন আমাদের সমাজের বহু কৃত্রিম বিভাজন কমে আসবে। শিক্ষা, মানবিকতা ও নৈতিকতা যদি সত্যিকার অর্থে মানুষের মধ্যে বিকশিত হয়, তাহলে শ্রেণির দেয়ালও অনেকটাই দুর্বল হয়ে যাবে।
আপনারা যারা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন, একটু চারপাশের দিকে তাকান। আনন্দ করুন, বন্ধুত্ব করুন, স্বপ্ন দেখুন—কিন্তু আপনার বাবা-মায়ের মুখটাও মনে রাখুন। কোনো অনৈতিক কাজে জড়ানোর আগে একবার বাবার ঘামে ভেজা মুখটি মনে করুন। নেশায় আসক্ত হওয়ার আগে মায়ের ত্যাগের কথা মনে করুন। সময় নষ্ট করার আগে মনে করুন—আপনার পড়াশোনার পেছনে কারও জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
আপনার হাতে হয়তো আজ কলম; কিন্তু সেই কলমের পেছনে কারও হাতে থাকতে পারে কোদাল, রিকশার হ্যান্ডেল কিংবা শ্রমের কঠিন যন্ত্র। আপনার শিক্ষা শুধু আপনার নিজের ভবিষ্যৎ নয়—এটি আপনার পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার সম্ভাবনা। আপনি ভালোভাবে পড়াশোনা করলে একটি পরিবার বদলাতে পারে। আপনি নৈতিক মানুষ হলে একটি প্রজন্ম বদলাতে পারে। আপনি দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হলে একটি সমাজও বদলাতে পারে।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনকে শুধু উপভোগের সময় হিসেবে নয়, নিজেকে গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখুন। কারণ প্রতিটি বাবা-মা চান না তাঁর সন্তান কষ্টে দিন কাটাক। তাঁরা চান সন্তান তাঁদের কষ্টের অবসান ঘটাক, পরিবারের হাল ধরুক এবং সমাজে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকুক।
এই একটি খাবারের দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শ্রমের কোনো লজ্জা নেই, দরিদ্রতার কোনো অপরাধ নেই; বরং অন্যের ত্যাগকে অস্বীকার করে নিজের সুযোগ নষ্ট করাই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। সত্যি বলতে, দৃশ্যটি খুব সাধারণ। কিন্তু যারা অন্তরচক্ষু দিয়ে দেখতে পারে, তাদের জন্য এর শিক্ষা অসাধারণ।
বাবা কী—এই দৃশ্য তা শেখায়। শ্রমের মর্যাদা কী—এই দৃশ্য তা শেখায়। শিক্ষার প্রকৃত মূল্য কী—এই দৃশ্য তা শেখায়। দেশের প্রতি দায়িত্ব কী—এই দৃশ্য তা শেখায়। আর সবচেয়ে বড় কথা—মানুষ হওয়া কী, এই দৃশ্য সেটিই শেখায়।
একটি ভালো দৃশ্য, একটি ভালো কথা, একটি ভালো শিক্ষা—কখনো কখনো হাজারো মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও জীবনকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে পারে। সুস্থ, সুন্দর, নৈতিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে এমন ইতিবাচক দৃশ্যের কোনো বিকল্প নেই।
মো: নুরুল আমিন
অর্থনীতি বিভাগ, ১১তম ব্যাচ
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়