শরৎ এলে যেন এই চেনা ক্যাম্পাসটিই ধারণ করে অন্য এক মায়াবী রূপ। © টিডিসি ফটো
টাঙ্গাইলের সন্তোষে প্রায় ৮০ একর বিস্তীর্ণ সবুজ প্রাঙ্গণজুড়ে গড়ে উঠেছে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি)। শিক্ষা, গবেষণা ও তারুণ্যের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃতির সান্নিধ্যেও অনন্য। সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসের পথ, প্রশস্ত মাঠ আর ঋতুবদলের সঙ্গে বদলে যাওয়া প্রকৃতির রূপ প্রতিনিয়তই মুগ্ধ করে শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের। তবে শরৎ এলে যেন এই চেনা ক্যাম্পাসটিই ধারণ করে অন্য এক মায়াবী রূপ।
নীল আকাশের বুকে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে হালকা শীতলতার পরশ আর মাঠের কিনারে সারি সারি কাশফুল- সব মিলিয়ে মাভাবিপ্রবি এখন যেন শরতের রূপকথার পাতায় আঁকা এক স্বপ্নময় ছবি। সকাল থেকে বিকেল, রোদের আলো থেকে নরম বিকেলের ছায়া- ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে এই ঋতুর নিজস্ব কোমলতা।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় প্রকৃতির ভাষাও। বর্ষার সজলতা পেরিয়ে শরৎ আসে তার শুভ্রতার ডালি নিয়ে। আকাশ হয়ে ওঠে স্বচ্ছ, মেঘ হয়ে ওঠে তুলোর মতো নরম, আর মাঠের ধারে কাশফুলের দোলা জানিয়ে দেয়- শরৎ তার সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে হাজির। সেই সৌন্দর্যেরই যেন এক জীবন্ত মঞ্চ এখন মাভাবিপ্রবির বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠের চারপাশে ফুটে থাকা কাশফুলের শুভ্রতা দূর থেকেই টেনে নেয় চোখ। বাতাসের মৃদু দোলায় কাশফুলগুলো যখন একসঙ্গে মাথা নাড়ায়, তখন মনে হয়, প্রকৃতি বুঝি নিজের অজান্তেই কোনো নীরব কবিতা লিখে চলেছে। নীল আকাশের নিচে সেই শুভ্রতার বিস্তার ক্যাম্পাসকে দিয়েছে এক অন্যরকম কোমলতা।
শরৎ শুধু প্রকৃতির রং বদলায়নি, বদলে দিয়েছে ক্যাম্পাসের মানুষের মনও। শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততার ফাঁকে এখন জায়গা করে নিয়েছে প্রকৃতিকে একটু ছুঁয়ে দেখার, একটু অনুভব করার অবসর। কেউ মুঠোফোনের ক্যামেরায় ধরে রাখছেন কাশফুলের দোলা, কেউ বন্ধুদের নিয়ে ছুটছেন মাঠের ধারে, আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন ঋতুর এই স্বল্পস্থায়ী সৌন্দর্য। প্রকৃতির এই রূপ অনেকের মনেই ফিরিয়ে আনছে ফেলে আসা শৈশবের দিন, বাড়ির উঠান কিংবা মায়ের হাতের রান্নার উষ্ণ স্মৃতি।
ক্যাম্পাসের এই নয়নাভিরাম দৃশ্য শুধু শিক্ষার্থীদেরই টানে না। টাঙ্গাইলের স্থানীয় মানুষজনের পাশাপাশি ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে অনেকেই ছুটে আসছেন মাভাবিপ্রবিতে। কারও হাতে মুঠোফোন, কারও চোখে বিস্ময়- শরতের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি তারা নিজেদের মতো করে বন্দি করে রাখছেন এই সময়টুকু।
এ বিষয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘একজন আলোকচিত্র শিল্পী হিসেবে আমার কাছে শরৎ শুধু সামান্য একটি ঋতু নয়, বরং জীবনের গল্পের মতো। প্রকৃতির আলো-ছায়ার খেলা, বাতাসের বিশুদ্ধতা, মেঘের শুভ্রতার সঙ্গে কাশফুলের দোল- সবই আমি ক্যামেরায় মুহূর্তবন্দী করতে চাই। প্রতিটি মুহূর্তই যেন আলাদা একটি গল্প বলে।’
শরতের সঙ্গে কাশফুলের সম্পর্ক যেন অবিচ্ছেদ্য। মাভাবিপ্রবির কেন্দ্রীয় মাঠের চারপাশজুড়ে ফুটে থাকা সেই কাশফুলই এখন ক্যাম্পাসের শরৎ-সৌন্দর্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। সাদা ফুলের সারির ফাঁক দিয়ে বাতাস বয়ে গেলে তৈরি হয় মৃদু ঢেউ- দূর থেকে মনে হয়, মাঠের কিনারে যেন শুভ্র কোনো নদী বয়ে চলেছে।
গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান বলেন, ‘মাঠে নামার আগে দূরে তাকালে দেখি, সাদা কাশফুল বাতাসে দুলছে। এটি শুধু দেখতেই সুন্দর নয়, মনে কেমন প্রশান্তি আনে, খেলার প্রেরণাও জোগায়।’
শৈশবের স্মৃতির জানালাও খুলে যায় এই কাশফুলের কাছে দাঁড়ালে। আতিক বলেন, ‘ছোটবেলায় খেলা শেষে আমরা বন্ধুরা মিলে কাশফুলের বাগানে দৌড়ে যেতাম। সেই সময়ের স্মৃতিগুলো এখন অনেক মনে পড়ে।’
শরতের সৌন্দর্য শুধু চোখে ধরা দেয় না, ছুঁয়ে যায় বাঙালির রসনাবোধকেও। তাল পাকার এই সময় ঘরে ঘরে তৈরি হয় তালের বড়া, পিঠা আর পায়েস। ক্যাম্পাসের আবাসিক জীবনে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে এসব খাবারের স্বাদ যেন বাড়ির প্রতি টানটাকে আরও গভীর করে তোলে। ব্যস্ত ক্যাম্পাসজীবনের মাঝেও মনে পড়ে যায় মায়ের রান্নাঘর, চুলার পাশে অপেক্ষা করে থাকা গরম গরম পিঠা কিংবা বাটিভর্তি তালের বড়া।
ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এই সময় বাড়িতে থাকলেই মা বাটি ভর্তি করে গরম গরম তালের বড়া এনে দিতেন। এবার আগে থেকেই বলে রেখেছি যেন তালের রস ফ্রিজে রেখে দেয়। পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরেই মায়ের হাতের গরম গরম তালের বড়া খাব।’
শরৎ আবার উৎসবেরও বার্তাবাহক। এই ঋতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বর্ষার মেঘ সরে গিয়ে যখন আকাশে রোদের হাসি ফুটে ওঠে, বাতাসে যখন আসে হালকা শীতলতার পরশ, তখনই যেন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আগমনী সুর।
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রাতুল দাস বলেন, ‘শরৎ মানেই মা দুর্গার আগমন। বর্ষা শেষে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়, বাতাস হয়ে ওঠে হালকা ঠান্ডা। সব মিলিয়ে পূজার আমেজ তৈরি হয়। এই সময়টায় মনে হয় সবকিছু নতুন করে শুরু হচ্ছে।’
শরতের এই আবহে মাভাবিপ্রবির ক্যাম্পাসও যেন নিজের চেনা ব্যস্ততাকে একটু সরিয়ে রেখে উৎসবের রঙে মেতে উঠেছে। কোথাও বন্ধুদের আড্ডা, কোথাও মাঠজুড়ে খেলাধুলা, কোথাও আবার কাশফুলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার ব্যস্ততা। নীল আকাশের নিচে শুভ্র কাশফুল আর স্নিগ্ধ বাতাস মিলে ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি করেছে এমন এক আবহ, যেখানে ব্যস্ততার মাঝেও মন একটু থমকে দাঁড়াতে চায়।
ঋতু বদলাবে, কাশফুল ঝরে যাবে, নীল আকাশের বুক থেকে সাদা মেঘও একদিন সরে যাবে। কিন্তু শরতের এই দিনগুলো থেকে যাবে শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে- কোনো ছবির ফ্রেমে, কোনো বিকেলের আড্ডায়, কিংবা হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া কোনো শৈশবের গল্পে।
মাভাবিপ্রবিতে তাই শরৎ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি ঋতু নয়; এটি যেন প্রকৃতির হাতে লেখা এক নরম চিঠি- যার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে মিশে আছে কাশফুলের শুভ্রতা, আকাশের নীল, মায়ের হাতের তালের বড়ার গন্ধ, উৎসবের আগমনী সুর আর ফেলে আসা দিনের মায়া। আর সেই চিঠি পড়তে পড়তেই এই শরতে মাভাবিপ্রবির ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছে আরও আপন, আরও মায়াময়, আরও স্মৃতিমেদুর।